মৎস্য ভোজন বেড়েছে

20

এম এ হোসাইন

‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ বাংলার চিরাচরিত প্রবাদ। এক পর্যায়ে এসে এ প্রবাদ কল্পকথায় রূপ নেয়। কারণ দূষণ-দখলে নদী-খাল-বিল থেকে মাছ হারিয়ে যাচ্ছিল। এ কারণে ভোজন রসিক বাঙালির খাবারের তালিকা থেকেও ক্রমে বাদ যাচ্ছিল মাছ। কিন্তু এক দশকের ব্যবধানে সাধারণ মানুষের পাতে আবার ফিরতে শুরু করেছে মাছ। আর সেই মাছ স্বাদু পানির। মাছ চাষ বাড়ায় উৎপাদন বেড়েছে। এতে মাছ ভোগের পরিমাণও বেড়েছে।
মানুষের প্রাণিজ আমিষের শতকরা ৫৮ শতাংশ আসে মাছ থেকে। ২০১০ সালে দেশে মাথাপিছু দৈনিক মাছ খাওয়ার পরিমাণ ছিল ৪৮ গ্রাম। দেশের মানুষ গড়ে জনপ্রতি প্রতিদিন ৬০ গ্রাম চাহিদার বিপরীতে ৬৩ গ্রাম মাছ বর্তমানে গ্রহণ করছে। রুই, পাঙ্গাশ, কৈসহ বেশ কিছু মাছের দাম দরিদ্র মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যেই রয়েছে। ফলে দেশে মাথাপিছু মাছ খাওয়ার পরিমাণ বাড়ছে।
চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফারজানা লাভলী বলেন, মাছের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য সরকার নানামুখি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। দিন দিন মৎস্য ভোগের পরিমাণ বাড়ছে। চট্টগ্রামে চাহিদার তুলনায় মাছের উৎপাদন বেশি। ইলিশের উৎপাদন বাড়ায় আমাদের মাছ উদ্বৃত্ত থাকছে। একটি মা-ইলিশ ৩০ লাখ ডিম দেয়। মা-ইলিশ না ধরা এবং এ ব্যাপারে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কারণেই প্রতি বছর ইলিশের উৎপাদন বাড়ছে। মাছ উৎপাদনে আমরা এখন স্বাবলম্বী। এখন প্রতিবছর আমাদের মাছ উদ্বৃত্ত থাকছে।
জেলা মৎস্য অফিস সূত্র মতে, চট্টগ্রাম জেলার ১৫টি উপজেলা ও নগরের ১৬টি থানা এলাকায় মাছের মোট চহিদা রয়েছে ১ লক্ষ ২০ হাজার ৪৬৫ মেট্রিক টন। মোট উৎপাদন হচ্ছে ১ লক্ষ ৬৪ হাজার ১১৮ মেট্রিক টন। ফলে চট্টগ্রামে মাছের উদ্বৃত্ত থাকছে ৪৩ হাজার ৬৫৩ মেট্রিক টন। চট্টগ্রামে মৎস্য বীজ উৎপাদন খামার রয়েছে ২টি, মৎস্য হ্যাচারি রয়েছে ১১টি, পুকুর-দীঘি রয়েছে ৮৭ হাজার ৩০৯টি, যার আয়তন ২১ হাজার ১৪৮ দশমিক ৫ হেক্টর। মোট জেলে পরিবার রয়েছে ৫৭ হাজার ২২০টি। মৎস্য আড়ত রয়েছে ২৩৫টি। মৎস্য প্রক্রিয়াজাত কারখানা রয়েছে ২৮টি। মৎস্য খাদ্য কারখানা রয়েছে ৯টি। মৎস্য আহরণে যান্ত্রিক নৌযান রয়েছে ৩ হাজার ৪১৯টি।
বিশ্বের অন্যতম স্বাস্থ্যকর খাবার মাছ। প্রোটিন, আয়োডিন, ভিটামিন ডিসহ প্রচুর পুষ্টি গুণে সমৃদ্ধ মাছে সবচেয়ে বেশি ওমেগা থ্রি ফ্যাটি এসিড থাকে। এ এসিড শরীর ও মস্তিষ্কের জন্য খুব জরুরি। সব ধরনের মাছই শরীরের জন্য উপকারী। আমেরিকান জার্নাল অফ ক্লিনিকাল নিউট্রিশন এ প্রকাশিত একটি গবেষণা রিপোর্টে বলা হয়েছে, প্রতিদিন মাছ খাওয়ার অভ্যাস গড়লে কোলন ক্যানসার, গলার ক্যানসার, মুখের ক্যানসার ও প্যানক্রিয়াটিক ক্যানসারসহ বেশ কিছু ক্যানসার রোধ করা যায়।
পুষ্টিবিদ হাসিনা আকতার লিপি বলেন, আমাদের খাবারে ব্যালেন্স খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ব্যালেন্স ডায়েটের জন্য মাছ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাবার। খাদ্যের ৬টি উপাদানের মধ্যে ৩০ শতাংশ প্রোটিন থেকে নিতে হবে। মাছ, মাংস, ডিম, দুধ এ প্রোট্রিন উপাদানগুলো দৈনিক ৭০ থেকে ৮০ গ্রাম খেতে হবে। সবগুলো প্রোটিনের মধ্যে মাছের প্রোটিন সবচেয়ে ভাল। মাছের ওমেগা থ্রি থাকে যা অন্যান্য প্রোট্রিন উপাদানে থাকে না। সমুদ্রের মাছে আয়োডিন আছে, আয়োডিন অন্যকোন খাবারে নেই। সপ্তাহে অন্তত দুইদিন সামুদ্রিক মাছ খাওয়া উচিত। মাছের মধ্যে ভালমানের প্রোট্রিন ও ফ্যাট রয়েছে। যে ফ্যাটগুলো আমাদের জন্য খুবই উপকারী।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী বিগত ১০ বছরের হিসেবে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়। ইলিশ উৎপাদনকারী ১১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে প্রথম। অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ আহরণে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে চতুর্থ এবং বদ্ধ জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে পঞ্চম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। এছাড়া তেলাপিয়া মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে চতুর্থ এবং এশিয়ার মধ্যে তৃতীয়। পাশাপাশি বিশ্বে সামুদ্রিক ও উপকূলীয় ক্রাস্টাশিয়া ও ফিনফিশ উৎপাদনে যথাক্রমে ৮ম ও ১২তম স্থান অধিকার করেছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার (এফএও) মতে, ২০২২ সাল পর্যন্ত বিশ্বে পুকুরে মাছ চাষ সবচেয়ে বেশি বাড়বে বাংলাদেশে।