ম্যানগ্রোভ নিধন করে চলছে চিংড়িঘের তৈরির মহোৎসব

7

সেলিম উদ্দীন, ঈদগাঁও

কক্সবাজারের ঈদগাঁওয়ে উপক‚লীয় বন ‘ম্যানগ্রোভ’ নিধন করে অবৈধ চিংড়ি ঘের তৈরির মহোৎসব চলছে। পোকখালী ইউনিয়নের পশ্চিম গোমাতলীতে বন বিভাগের প্রায় ২শ একর উপকূল ‘ম্যানগ্রোভ’ নিধন ও দখল করে এ অবৈধ চিংড়ি ঘের তৈরি হচ্ছে।
মাসাধিককাল ধরে পরিবেশ বিধ্বংসী একাজ চললেও মাথাব্যাথা নেই সংশ্লিষ্টদের বরং উপকূলীয় বন বিভাগের রহস্যজনক ভূমিকা জনমনে ব্যাপক প্রশ্ন উঠেছে।
হুমকি-ধমকি ও মামলা-হামলার ভয়ে স্থানীয়রা বিভিন্ন দপ্তরে মৌখিকভাবে জানালেও সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেয়নি।
স্থানীয়রা জানান, অস্ত্রের মহড়ায় প্রকাশ্যে মাসব্যাপী সরকারি সম্পদ ধ্বংসলীলায় দখলবাজচক্র মেতেছে। কেউ তাদের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস করেন না। এ নিয়ে কেউ কথা বলতে চাইলে তাকে এলাকা ছাড়া করা কিংবা মামলা-হামলার ভয় দেখানো হয়। এমন কি সাংবাদিককে প্রকাশ্যে মাটিতে পুঁতে ফেলার হুমকিও দেওয়া হয়।
সরেজমিন দেখা যায়, বন বিভাগের মহেশখালী গোরাকঘাটা রেঞ্জের চৌফলদন্ডী বিট অফিসের আওতাধীন পোকখালী ৬নং স্লুইস গেটস্থ হান্নান মিয়ার ঘোনা নামক ঘেরের পশ্চিমে প্রায় ২শ একর ম্যানগ্রোভ বন দখল করে বাঁধ দিয়ে রেখেছে স্থানীয় দখলবাজ চক্রটি। এ দখলযজ্ঞে কেটে ফেলা হচ্ছে হাজারো বাইন, কেওড়াসহ হরেক প্রজাতির গাছ। এতে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি আবাসস্থল হারাচ্ছে নানা প্রজাতির প্রাণী।
ওই এলাকায় দেশি-বিদেশি অস্ত্র হাতে পাহারায় রয়েছে বিভিন্ন এলাকা থেকে ভাড়ায় আনা অর্ধশতাধিক দাগী অপরাধী। গণমাধ্যম, বন বিভাগ, পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতাকর্মীসহ অন্যন্যা সংস্থার লোকজন ঘটনাস্থলে গেলে অস্ত্রধারীরা ভয়ভীতি প্রদর্শন করে বলেও জানান কয়েকজন সাংবাদিক।
ঘটনাস্থল সাগরের পাশে হওয়ায় দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে সেখানে যাওয়া দুরুহ। আবার দুর্ঘটনা ও জীবনহানীর আশঙ্কায় সহজে কেউ যেতে চান না। এ সুযোগে স্কেভেটরসহ শতশত শ্রমিক দিয়ে দখলযজ্ঞ চলছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গোমাতলী এবং চরপাড়ার প্রায় ২শ পরিবার থেকে ১ জন করে ২শ সদস্যের একটি সমিতি গঠন করা হয়েছে। সমিতির প্রতিটি সদস্য থেকে তোলা হয়েছে নির্দিষ্ট হারে চাঁদা। এ টাকা বিনিয়োগ করা হচ্ছে সরকারি কোটি টাকার উপকূলীয় জমি দখল ও বন এলাকা ধ্বংসে।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এক পর্যায়ে চৌফলদন্ডী বিট কর্মকর্তা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করলেও রহস্যজনক কারণে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। তাই দখলবাজরা আরও দাপটের সাথে দখল কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এলাকায় চাউর হয়েছে, বিট কর্মকর্তা ও সংষ্টিদের মোটা অংকের অর্থে ম্যানেজ করে বনসম্পদ দখল কাজ চলছে।
উপকূলীয় বন বিভাগের গোরকঘাটা রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আইয়ুব আলী জানান, সংবাদ পেয়ে স্থানীয় বিট কর্মকর্তাকে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছিল। দখলকৃত এলাকায় কয়েকটি বাঁধ কেটে দেওয়া হয়েছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে।
চৌফলদন্ডী বিট কর্মকর্তা সাইফুল ইসলামের সাথে কথা হলে অর্থ লেনদেনের বিষয়টি সত্য নয় দাবি করে তিনি বলেন, যে পরিমাণ জায়গা বলা হচ্ছে, আসলে ততটুকু নয়। সংবাদ পাওয়া মাত্রই ঘটনাস্থলে গেছি। সেখানে বন নিধন করে ঘের তৈরির মতো কোন ঘটনা ঘটছে না।
তিনি আরও বলেন, স্থানীয় কিছু জেলে সাগরে মাছ শিকার করতে ১৬০ ফিটের মতো চর দখল করেছিল। তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে।
স্থানীয়রা জানান, চৌফলদন্ডী বিট কর্মকর্তা সাইফুল ইসলামের রহস্যজনক ভূমিকার কারণে দখলবাজরা অস্ত্রের মহড়ায় কোটি টাকার বনভূমি দখল করছে। তারা বন সম্পদ দখলকারী এবং অসাধু বন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ঊর্ধ্বতন কর্মকতাদের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
এদিকে স্থানীয় সংবাদকর্মীদের মাধ্যমে এ সংবাদ জানতে পেরে গত বৃহস্পতিবার সকালে ঈদগাঁও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুবল চাকমা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন বলে জানা গেছে। তবে এ বিষয়ে ইউএনওর মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সংযোগ পাওয়া যায়নি।
পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজারের উপপরিচালক নুরুল আমিন জানান, তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। পরিবেশ ধ্বংসকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।