মৌলভী আবুল খায়ের নকশবন্দির ‘ফানাফিল্লার পথে’

47

 

মৌলভী আবুল খায়ের নকশবন্দি চট্টগ্রামের অন্যতম সুফিসাধক ও আধ্যাত্মিক গানের রচয়িতা। যৌবনকাল থেকে তিনি আধ্যাত্মিক গান রচনা করলেও পরবর্তীতে সুফিসাধনার পথ পরিক্রমায় তাঁর যে-অর্জন ও উপলব্ধি, তার প্রতিফলন ঘটিয়ে গান রচনা করে প্রকৃত আধ্যাত্মিক গানের রচয়িতা হিসেবে আবির্ভুত হন। বস্তুত তাঁর আধ্যাত্মিক গান রচনাও ছিল তাঁর সুফিসাধনার অংশ। ১৯৩০ সালে হিন্দুস্তানের মুরাদাবাদ মাদ্রাসা থেকে হাদিসে দাওরায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি ভারত-ভ্রমণে বের হন ভারতের দরবেশ, ফকির, সাধু ও সন্ন্যাসীদের সাক্ষাৎ লাভের উদ্দেশ্যে। এঁদের অনেকের সাক্ষাৎ লাভ করে, তাঁদের কাছ থেকে আধ্যাত্মিক জগত সম্পর্কে অনেককিছু অবগত হয়ে তিনি আধ্যাত্মিক জগতে প্রবেশ করার জন্য তখন আকুল হয়ে উঠেন। ১৯৩২ সালে তিনি দেশে ফেরার সময় পশ্চিম বঙ্গের ফুরফুরা দরবার শরীফের পীর হজরত আবুবকর সিদ্দিকী নকশবন্দি-র কাছে শিষ্যত্ব বরণ করে নকশবন্দিয়া তরিকার অনুসারী হয়ে সুফিসাধনার পথে অগ্রসর হন। তার পরবর্তীকালেই সুফিসাধনার অংশ হিসেবে তাঁর আধ্যাত্মিক গান রচনা শুরু। ১৯৭৩ সালের ১৯ অক্টোবর, অমরধামে প্রস্থান করার পূর্ব পর্যন্ত তিনি অজস্র আধ্যাত্মিক গান রচনা করেছিলেন। ১৯৬১ সালে তাঁর প্রথম আধ্যাত্মিক সঙ্গীতগ্রন্থ ‘অগ্নিশিখা’ প্রকাশিত হয়। পরে ‘ভাবের বাঁশি’, ‘নূর লহরী’, ‘ভক্তিমালা’, ‘প্রেম লহরী’, ‘জীবনসখা’ ও ‘শান্তিবীণা’ নামে তাঁর আরও অনেকগুলো আধ্যাত্মিক সঙ্গীতগ্রন্থ প্রকাশ পায়। তিনি ‘ফানাফিল্লার পথে’ নামে একটি গদ্যগ্রন্থও রচনা করেছিলেন, যেখানে আধ্যাত্মিক বা তরিকত জগতের অনেক জটিল, কঠিন ও রহস্যপূর্ণ জিজ্ঞাসার জবাব দেয়া হয়েছে। গ্রন্থটি তরিকতপন্থী, আধ্যাত্মিক বা তরিকত জগত সম্পর্কে জানতে আগ্রহী ও গবেষকদের জন্য অবশ্যই প্রয়োজনীয় ও পাঠযোগ্য। ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত গ্রন্থটি সম্পর্কে গ্রন্থটির ‘মন্তব্য’ অংশে বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তিতুল্য কবি, লেখক ও গবেষক সৈয়দ আলী আহসান লিখেছেন : “যাঁরা তত্ত¡জ্ঞ এবং সাধক তাঁরা আত্মবিলোপনের মাধ্যমে আল্লাহর সান্নিধ্যে উপনীত হবার চেষ্টা করেন। পার্থিব জীবনটি তাঁদের বিবেচনায় অহংকারের জীবন, অন্যায়ের জীবন এবং অসদভাবের জীবন। এই জীবনের মধ্যে মানুষকে বাস করতে হয়, কিন্তু সাধকগণ এই জীবনের প্রতি একটি নিরাশক্তি নির্মাণ করেন। এই নিরাশক্তির সাহায্যে তাঁরা মুক্তির পথ অনুসন্ধান করেন। এই মুক্তির পথকে ‘ফানাফিল্লার পথ’ বলা হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহর ঐশ্বর্যে বিলীন হওয়া এবং আল্লাহর গুণাবলীতে বিলীন হওয়া। হযরত শাহ সূফী মৌলভী আবুল খায়ের নকশবন্দি (রহ.) আল্লাহর ঐশ্বর্যে বিলিন এই রকম একজন মহাপুরুষ ছিলেন। এই সাধক ঐশী প্রেমের অনেক গান রচনা করে গেছেন। তাঁরই রচিত ‘ফানাফিল্লার পথে’ গ্রন্থে ও গানগুলোতে জীবনের অর্থ আবিষ্কারের কথা এবং জীবনের গভীর জিজ্ঞাসার কথা আছে। উক্ত গ্রন্থ ও গানগুলোর মধ্যে সাধকের তন্ময়তা এবং রহস্যের সন্ধান পাওয়া যায়”।
‘ফানাফিল্লার পথে’ গ্রন্থে ‘চিত্তশুদ্ধির উপায় কি?’, ‘মনস্থিরতার উপায় কি?’, ‘জিতেন্দ্রীয় হওয়ার উপায় কি?’, ‘রিপুজিৎ হওয়ার উপায় কি?’, ‘সংসারের মায়ার বন্ধন হইতে মুক্তি পাইবার উপায় কি?’, ‘সাধু কাহাকে বলে?’, ‘ধ্যান কাহাকে বলে?’, ‘ভক্তি কাহাকে বলে?’, ‘ব্যাকুলতা কি, ইহার লক্ষণ কি?’, ‘সাধু বা সৎভাবের সঙ্গ কিরূপে করিতে হয়?’, ‘চিন্তাশীল মন কিরূপ?’, ‘মহাপুরুষ কে ও তাহার লক্ষণ কি?’, ‘শিষ্য কাহাকে বলে?’, ‘মৃত্যু কি, উহা কিরূপে ঘটে?’, ‘সংসার বলিতে কি বুঝিতে হয়?’, ‘পরকাল বলিতে আমরা কি বুঝিব?’, ‘আত্মার উন্নতি বলিতে কি বুঝা যায়?’, ‘ভাবের পথে যাবার প্রথম সোপান কি?’, ‘ধর্ম কাহাকে বলে?’, ‘জাতিভেদ সম্বন্ধে আপনার মত কি?’, ‘ত্রিগুন কাহাকে বলে এবং উহা কি?’, ‘জন্মরহস্য কি?’, ‘বাক সংযম কাহাকে বলে?’, ‘মন কি?’, ‘সিদ্ধিলাভ কাহাকে বলে?’, ‘আল্লাহ কি?’, ‘ধারণা কি?’, ‘প্রেম বলিতে আমরা কি বুঝিব?’, ‘গোর আজাব কিরূপ?’, ‘স্বর্গ-নরক সম্বন্ধে আমরা কিছু শুনিতে চাই’, ‘জ্ঞান বলিতে আমরা কি বুঝিব?’, ‘আমরা যে আমি আমি করি এই আমি কে?’, ‘গুরুকে আমি কি মনে করিব?’, ‘সংযম কাহাকে বলে?’, ‘ত্রিতাপ কাহাকে বলে?’, ‘কর্মফল কি?’, ‘নির্ভরতা কাহাকে বলে?’, ‘সংসারকে কবিগণ ভবসাগর বলেন কেন?’, ‘মায়া কাহাকে বলে?’, ‘গুরু ছাড়া সিদ্ধিলাভ করিতে পারে কিনা?’সহ মোট ৭৫টি প্রশ্নের উত্তর প্রদান করা হয়েছে। গ্রন্থটি চার পর্বে বিভক্ত। কথামৃত পর্ব, বাণী পর্ব, ফানাফিল্লা পর্ব ও উক্তি পর্ব। প্রশ্নোত্তর রয়েছে কথামৃত পর্বে। সুফিদর্শনের আলোকে আবুল খায়ের নকশবন্দি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়েছেন। এক্ষেত্রে তিনি মহিউদ্দিন ইবনুল আরাবি, আল কিন্দি ও গাজ্জালি প্রমুখ সুফি দার্শনিকের প্রতিনিধিত্ব করেছেন বলেই মনে হয়। ‘প্রেম বলিতে আমরা কি বুঝিব?’ প্রশ্নের তাঁর প্রদত্ত উত্তরে বলা হয়েছে, প্রেম বিভিন্ন প্রকারের; যেমন, কামজ প্রেম, গুণজ প্রেম, নিঃস্বার্থ প্রেম, রূপজ প্রেম ও স্বভাব প্রেম। কিন্তু প্রকৃত প্রেম হচ্ছে, স্বভাব প্রেম। এই প্রেম হলো মহাবিশ্বের সবকিছুকে আমিরূপে দেখা। যিনি এই প্রেমের স্তরের পর স্তর অতিক্রম করে অতীব উন্নত স্তরে এসে পৌঁছেন, তিনি খাঁটি প্রেমিক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন এবং পৃথিবীতে বহু কীর্তিও রাখতে সমর্থ হন।
স্বর্গ ও নরক সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তরে আবুল খায়ের নকশবন্দি স্বর্গ সম্পর্কে বলেছেন, সন্তুষ্ট মনের বিশেষ অবস্থাই আসলে স্বর্গ। ‘অনাবিল নিত্যানন্দ স্বরূপ’ এই বিশেষ অবস্থা ‘রজঃ মিশ্রিত স্বত্বঃগুণী অথবা শুদ্ধ স্বত্বঃগুণী ব্যক্তিরা’ অর্জন করেন। তিনি আরও বলেছেন, স্বর্গ কোনো জায়গার নাম নয়। “নশ্বর জগতে মায়া-মমতা, আত্মীয়-স্বজন, কামিনী-কাঞ্চন, অনিত্যবোধ করিয়া অনেকটা সাধ্য-সাধনা এবাদত বন্দেগী করার হেতু চিত্তে শান্তি বারি প্রবাহিত হয় বলিয়া বহুদিন যাবত শান্তিস্রোতে তিনি (চিত্ত) ভাসমান থাকেন। উহাকে স্বর্গের স্রোতোস্বিনী বলে। ঐ মানসিক আনন্দ ও শান্তির অবস্থাকে একাধিক ভাগে ভাগ করা হইয়াছে। যথা-জনলোক বা জান্নাতুল আদম, সরলোক বা জান্নাতুল ফেরদাউস, দেবলোক বা জান্নাতুল মাওয়া, ব্রহ্মলোক বা দারুস সালাম, অনন্তলোক বা দারুল-করার…। ব্রহ্মলোক বা অনন্তলোকে প্রায় সাধক মহাপুরুষেরা গমন করিয়া থাকেন। উহা চিরশান্তি নিকেতন; অর্থাৎ মৃত্যুর পর সংসারের অনাসক্ত আত্মা যেই সূ²দেহ গ্রহণে জগত-জীবের মঙ্গলার্থে ঘুরিয়া বেড়ান অথবা শান্তিতে অবস্থান করেন সেই অবস্থার নামই স্বর্গ। এই স্থুলদেহে জগতে অনাসক্ত অবস্থায় শান্তিতে বাস করার নামও মহাপুরুষেরা স্বর্গসুখ বলিয়া থাকেন। পূর্ণ কামেল দরবেশগণের স্বর্গ নরক নাই”। নরক সম্পর্কে তিনি বলেছেন : “ইহা একটি মানসিক যাতনা বিশেষ। তমঃগুনী লোকদের জন্য নরক যাতনা নির্ধারিত। রজঃগুনীদের নরক যাতনা একটু কম হইয়া থাকে। স্বত্বঃগুনীদের নরক নাই। যাহার আত্মা সংসারের প্রতি যত আসক্ত তাহার নরক যাতনা তত বেশী। হাদীসে আছে, বিষয়ী লোক মৃত্যুর পর হেডমুন্ড হইয়া থাকে। অর্থাৎ তখনও সংসারের আসক্তির টান কঠিন রূপে রহিয়া গিয়াছে। কাজেই ঊর্ধ্বাকাশে নিরাকার জ্যোতিষ্কমন্ডলে তাহাদের গতি হয় না। যে স্ত্রী-পুত্র, ধন-দৌলত, অনিচ্ছাসত্তে¡ও বিচ্ছিন্ন হওয়ার হেতু, বাসনার অপূরণ থাকাতে হৃদয়ে বৃশ্চিক দংশনের মত ভীষণরূপে যাতনার সৃষ্টি হয় এবং তৎসঙ্গে অনেক রকমের অমানুষিক নিষ্ঠুরতার সহিত পাপ করিয়াছি বলিয়া ধারণা বদ্ধমূল থাকা বশতঃ তদানুরূপ শাস্তি কাল্পনিক ও ভাবনা বলে কালগর্ভ হইতে বহুদিন স্থায়ী স্বপ্নবত আসিতে থাকে। উক্ত দুর্বিসহ যাতনা কারো কারো জন্য সূ²দেহের উপর যুগ যুগান্ত কাল পর্যন্ত থাকে। উহাকে শাস্ত্রকার মহাপুরুষেরা নরক বলিয়া থাকেন”।
আবুল খায়ের নকশবন্দি ‘গুরু ছাড়া সিদ্ধিলাভ করিতে পারে কিনা?’ প্রশ্নের জবাবে বলেছেন : “মুর্শিদ বা গুরু ছাড়া সিদ্ধিলাভ করা দুঃসাধ্য। প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে অথবা স্বপ্নাদিষ্ঠ গুরু থাকিতে হইবে। স্থুল বা সূক্ষèগুরু ব্যতীত কচিৎ কাহারো যদি সিদ্ধিলাভ হয় তাহা প্রকৃতি দর্শনের ভিতর মনন, চিন্তণ ও ভাবনার জোরে হইতে পারে। তাহার জন্যও আমরা প্রকৃতিকে গুরু বলিয়া সাব্যস্ত করিব। কোরানে বর্ণিত আছে, উছিলা ব্যতীত আল্লার পথে অগ্রসর হওয়া যায় না”।
এ কারণে আবুল খায়ের নকশবন্দির ১৯৯০ সালে প্রকাশিত ‘অগ্নিশিখা-২য় খন্ড’ সঙ্গীতগ্রন্থে লক্ষণীয়, তিনি গুরুর কাছে ‘দয়ার ভিখারী’ হয়ে কাঁদছেন :
আমি দয়ার ভিখারী গুরু, আমি দয়ার ভিখারী
তোমার দয়া বিনে গুরু কেমনে ত্বরি\
মনে রাখি বিষয় জ্বালা
ভাবতে নারি ভক্তি চিতে, বসি নিরালা
ভক্তি ভজন সরলতা, রিপুগনে নিল্ হরি\
আমার দ্বারা সাধন ভজন
নিশ্চয় জানিও গুরু, হবে না কখন
আছে কেবল তোমার স্মরণ, নামের মালা জপ করি\
তুমি জানি দয়ার সাগর
সেই আশাতে আনন্দিত, আমার অন্তর
দয়া কর রাখ মার, দয়াল আল্লা নাম ধরি\
ভুলি থাকি নামের মালা
গরল ভরা চিত্তে আবুল, খেলে রং খেলা
পড়বে যে দিন দুঃখ সাগরে, কুল পাবে না সাঁতারি\
‘ফানাফিল্লার পথে’ গ্রন্থে চার পর্বের মধ্যে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব হলো ফানাফিল্লা পর্ব। এই পর্বে আবুল খায়ের নকশবন্দি ‘অন্নময় কোষ বা বদনে জিসমানী’, ‘প্রাণময় কোষ বা বদনে বা’দী’, ‘মনময় কোষ বা আলমে মাহ্ছুছাত’, ‘বিজ্ঞানময় কোষ বা আলমে মা’কুলাত’ এবং ‘আনন্দময় কোষ বা ফানাফিল্লাহ’ স্তরের বিবরণ দিয়েছেন। সর্বশেষ স্তর ‘আনন্দময় কোষ বা ফানাফিল্লাহ’র বিবরণ দিতে গিয়ে লিখেছেন : “সর্বশেষে দরবেশ আনন্দময় কোষে উপনীত হয়। তথায় স্তরের পর স্তর ব্যাখ্যা করার তেমন কিছু পাওয়া যায় না। ব্যাকুলতা ও একাগ্রতার দরুন বহুদিন নিয়মিত কর্ম করার হেতু দক্ষতা ও নিপুণতার ফলে নির্বিকল্প সমাধি হইয়া যায়। মহাপুরুষ কিছু চাহিয়া রহিয়াছেন, অথবা কথা বলিতেছেন, এমনকি কর্ম করিতে দেখিলেও দরবেশগণকে সমাধিস্থ বলিয়া মনে করিতে হইবে। দরবেশ সর্বদা নিত্যলোকে নিত্যানন্দে বাস করেন। (তাঁকে)… কান্নাকাটি করিতে দেখিলেও (বুঝতে হবে তিনি) আনন্দে আছেন।… সদাসর্বদা…(তাঁর) চৈতন্যতে উৎপত্তি, চৈতন্যতে অবস্থান; চৈতন্যতেই (তাঁর) লয় প্রাপ্তি হয়; (তিনি) সর্বত্র চৈতন্যময়, এই অবস্থায় দরবেশ মায়িক খাঁচা লইয়া মায়িক জগতে যতদিন মায়িক লীলা করেন, ততদিন… আনন্দময় কোষে অবস্থান করিয়া থাকেন। তৎপর কোষাতীত অবস্থায় আত্মলয় হইয়া যান। যাবৎ মায়ার খাঁচায় থাকেন তাবত লীলা করেন। তাঁহারা ক্রিয়া করিয়াও নিষ্ক্রিয়, কথা বলিলেও মৌন, (তাঁহারা) আসক্তি অনাসক্তির উপর”।
‘ফানাফিল্লার পথে’ পাঠক ও সুফিপ্রেমিকদের কাছে সমাদৃত হবে বলেই আশা করি।