চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধু

15

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন ও ভাবনার প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে তাঁর লিখিত বই অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা ও আমার দেখা নয়াচীন গ্রন্থে। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন, ‘একজন মানুষ হিসেবে সমগ্র জাতি নিয়ে আমি ভাবি, একজন বাঙালি হিসেবে যা কিছু বাঙালিদের সঙ্গে সম্পর্কিত তা আমাকে গভীর ভাবে ভাবায়। এই নিরন্তর সম্পৃক্তির উৎস ভালোবাসা, অক্ষয় ভালোবাসা, যে ভালোবাসা আমার রাজনীতি ও অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে’ (পৃষ্ঠা-২)। বঙ্গবন্ধুর ভাবনার গভীরতম লক্ষ্য ছিল পরাধীনতার শৃঙ্খল ও পরাজয়ের অপমান থেকে মুক্ত শোষণহীন স্বাধীন বাংলাদেশ। এজন্য প্রয়োজন জনভিত্তি সম্পন্ন একটি রাজনৈতিক দল। তরুণ শেখ মুজিবের চিন্তার বাস্তবায়ন ঘটে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন। ঐ দিন পুরান ঢাকার টিকাটুলি কেএমদাস লেনে ঢাকা পৌরসভার তৎকালীন ভাইস চেয়ারম্যান কাজী বশির হুমায়ুনের রোজ গার্ডেন বাড়িতে এক সম্মেলনে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়। দল যখন প্রতিষ্ঠিত হয় বঙ্গবন্ধু তখন কারাগারে। সেখান থেকে তিনি দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৪৯ সালের ২৮ জুন বঙ্গবন্ধু কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে দল গঠনে মনোনিবেশ করেন। দলের জনসমর্থন বাড়াতে তিনি ঢাকার পরই ভাবেন চট্টগ্রাম নিয়ে। বৃহত্তর চট্টগ্রামে বঙ্গবন্ধুর ভাবনার প্রতিফলন হিসেবে সুসংগঠিত হয়েছে আওয়ামী লীগ।বঙ্গবন্ধুর সাথে চট্টগ্রামের সম্পর্ক ১৯৪২ সাল থেকে। কলকাতার রাজনীতির মাঠে এম এ আজিজ, জহুর আহমেদ চৌধুরীর সাথে পরিচয়ের মাধ্যমে সে সম্পর্ক শুরু হয়। বঙ্গবন্ধু তখন কলকাতা ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র। শরীফ শমসির সম্পাদিত ‘এক দফার প্রবক্তা এম এ আজিজ’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে… ‘১৯৪৪ সালে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজের সামনে ৩নং ওয়েলেসলি ফাস্ট লেনে অনুষ্ঠিত অল বেঙ্গল মুসলিম লীগের কাউন্সিলে শেখ মুজিবের সাথে এম এ আজিজ এর প্রথম পরিচয়’। জহুর আহমেদ চৌধুরী ১৯৪৪ সালে কলকাতার খিদিরপুর ডকে জাহাজী শ্রমিকদের সংগঠন গড়ে তোলেন।সেখানে বঙ্গবন্ধুর সাথে পরিচয় ও বন্ধুত্ব। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন ‘১৯৪৩ সাল থেকে চট্টগ্রামের এই কর্মীদের সাথে আমার বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। আজ পর্যন্ত সেই বন্ধুত্ব অটুট আছে। চট্টগ্রামের এম এ আজিজ, জহুর আহমেদ চৌধুরী, ডা. সুলতান আহমেদ (এখন কুমিল্লায় আছেন), আবুল খায়ের চৌধুরী আরও অনেকে ছাত্রলীগ ও মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। অনেকে ছিটকে পড়েছে। আজিজ, জহুর আজও সক্রিয় রাজনীতি করছেন’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা-২৯)।১৯৪৯ সালের ২৩ জুনের সম্মেলনে চট্টগ্রাম থেকে ১১ জন কর্মী যোগ দিলেও চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ এর যাত্রা শুরু বঙ্গবন্ধুর দুই বিশ্বস্ত সহচর জহুর আহমেদ চৌধুরী এবং এম এ আজিজ এর হাত ধরে। ১৯৪৯ সালে ঢাকায় আওয়ামী মুসলিম লীগের কমিটি গঠনের পর প্রথম যে দু’একটা জেলায় কমিটি গঠন হয় তাঁর মধ্যে চট্টগ্রাম অন্যতম। শেখ মোজাফফর আহমদ (সালারে জেলা)কে সভাপতি ও এম এ আজিজ কে সাধারণ সম্পাদক করে চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগ এবং আমীর হোসেন দোভাষকে সভাপতি ও জহুর আহমেদ চৌধুরীকে সাধারণ সম্পাদক করে চট্টগ্রাম সিটি আওয়ামী লীগ এর কমিটি গঠিত হয়। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনায় মূলত জহুর আহমেদ চৌধুরীর আন্দরকিল্লা অফিসকে ঘিরে জমে উঠেছিল চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ এর রাজনীতি। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘আমরা এখনও জেলা কমিটি গুলো করতে পারি নাই। তবে দু’একটা জেলায় কমিটি গঠিত হয়েছিল। চট্টগ্রামে এম এ আজিজ, জহুর আহমেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা-১৩০)।বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনায় ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ। ১৯৫০ সালে দলের প্রচার কাজে তিনি চট্টগ্রাম সফর করেন। স্টেশন রোডের হোটেল ওয়ালেসে অবস্থান করেন।ঐদিন বঙ্গবন্ধু লালদীঘি মাঠ ও জেএমসেন হলে দলীয় কর্মীদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন। সভায় জহুর আহমেদ চৌধুরী, এম এ আজিজ, আমীর হোসেন দোভাষ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। ১৯৫২ সালের ৩১ জানুয়ারী চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ এর আন্দরকিল্লাস্থ অফিসে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। কবি মাহবুবুল আলম চৌধুরী আহবায়ক, চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগ এর সাধারণ সম্পাদক এম এ আজিজ যুগ্ম আহবায়ক মনোনীত করা হয়। আওয়ামী লীগ নেতা জহুর আহমেদ চৌধুরী, শেখ মোজাফফর আহমদ, এটিএম শামসুদ্দিন, ফজলুল হক বিএসসি, ফেনীর খাজা আজিজ, আজিজুর রহমান (গোরা আজিজ) প্রমুখ এই কমিটির সদস্য ছিলেন।আইয়ুব খানের সামরিক শাসন নির্মম প্রকৃতি ধারণ করলে বঙ্গবন্ধু সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন করার সিদ্ধান্ত নেন। ষাটের দশকে এ কাজে বঙ্গবন্ধু আস্থা রাখেন চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ নেতাদের উপর। চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ এর সাধারণ সম্পাদক এম এ আজিজ, কোষাধ্যক্ষ ভূপতিভূষন চৌধুরী (মানিক চৌধুরী), বিধান কৃষ্ণ সেন, ডা. সৈয়দুর রহমান প্রমুখ নেতৃত্ব সশস্ত্র গোপন সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর সহযোগী ছিলেন।বঙ্গবন্ধু, এম এ আজিজ, মানিক চৌধুরী খাতুনগঞ্জের রামজয় মহাজন লেনে ‘নিউ এজেন্সি’ নামক প্রতিষ্ঠান খুলে কিছুদিন ব্যবসা করেন। প্রতিষ্ঠানের আয়ের সিংহভাগ খরচ হত দলের সাংগঠনিক কাজে। পরবর্তীতে সশস্ত্র সংগ্রামের তথ্য ফাঁস হয়ে গেলে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করা হয়। এই মামলা ১২ নং আসামি মানিক চৌধুরী, ১৩নং আসামি হন বিধান কৃষ্ণ সেন, এবং সিটি আওয়ামী লীগ নেতা ডা. সৈয়দুর রহমান এ মামলায় ব্যাপক নির্যাতিত হন বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফার সমর্থনে বঙ্গবন্ধু ১ম জনসভা করেন চট্টগ্রামে। বঙ্গবন্ধু মনে করতেন চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ সাংগঠনিকভাবে অনেক শক্তিশালী। ১৪ ফেব্রæয়ারি ১৯৬৬ ছয় দফার সমর্থনে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রথম বিবৃতি দেন চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগ এর সাধারণ সম্পাদক এম এ আজিজ, সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল হারুন, দপ্তর সম্পাদক এমএ হান্নান, কোষাধ্যক্ষ জানে আলম দোভাষ প্রমুখ। ছয় দফার সমর্থনে প্রথম জনসভা চট্টগ্রামে ১৯৬৬ সালের ২৫ ফেব্রæয়ারি অনুষ্ঠিত হয়। জহুর আহমেদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে সভায় বঙ্গবন্ধু বলেন- ‘এই চট্টলার জালালাবাদ পাহাড়ে বীর চট্টলার বীর সন্তানরা স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করেন। আমি চাই বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনতার পতাকা চট্টগ্রাম থেকে উড্ডীন হোক’।আওয়ামী লীগ এর কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে চট্টগ্রামের গুরুত্ব প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই। ১৯৫৩ সালের কাউন্সিলে কেন্দ্রীয় সদস্য পদে চট্টগ্রাম থেকে জহুর আহমেদ চৌধুরী, এম এ আজিজ নির্বাচিত হন। ১৯৫৩ সালে ময়মনসিংহের অলকা সিনেমা হলে দলের বিশেষ কাউন্সিলে জহুর আহমেদ চৌধুরীর প্রস্তাবে বঙ্গবন্ধু পুনরায় সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৫ সালের কাউন্সিলে ‘মুসলিম’ শব্দ দিয়ে অসা¤প্রদায়িক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সেই সম্মেলনে চট্টগ্রাম থেকে সদস্য পদে জহুর আহমেদ চৌধুরী, এম এ আজিজ, অধ্যাপক আসহাব উদ্দীন আহমেদ স্থান পায়। ১৯৫৭ সালের কাউন্সিলে জহুর আহমেদ চৌধুরী শ্রম সম্পাদক, এম এ আজিজ সদস্য নিযুক্ত হন। বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী, এম এ আজিজ, মানিক চৌধুরী, ফজলুল হক বিএসসি প্রমুখের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগ কে সুসংগঠিত করার জন্য চট্টগ্রামের তৃনমূল পর্যায়ে চষে বেড়িয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে তাঁর সহযোগীদের বাড়িতে বৈঠক করে নির্দেশনা দিতেন। হালিশহর এলাকায় এম এ আজিজের বাড়ি, পল্টন রোডে জহুর আহমেদ চৌধুরীর বাড়ি, রামজয় মহাজন লেনে মানিক চৌধুরীর বাড়ি, আগ্রাবাদ আবিদ পাড়া এলাকায় সুলতান আহমদ কন্ট্রাক্টর বাড়ি, ডা. সৈয়দুর রহমানের চৈতন্য গলির বাসা, ফিরিঙ্গি বাজারে জানে আলম দোভাষের বাড়ি, মাদারবাড়ির সিরাজুল হক মিয়ার বাড়ি, বাঘঘোনায় এম আর সিদ্দিকীর বাংলোতে বঙ্গবন্ধু একাধিক সাংগঠনিক বৈঠক করেন। এই স্মৃতিধন্য স্থান চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ ও নতুন প্রজন্মের কাছে প্রেরণার উৎস। বঙ্গবন্ধু অনুধাবন করতেন, দলকে জনমুখী করতে হলে আদর্শিক নেতৃত্ব প্রয়োজন। সেজন্য চট্টগ্রামে তিনি গড়ে তুলেছেন একঝাক নির্মোহ দেশপ্রেমিক নেতৃত্ব। যাদের মধ্যে অন্যতম এম এ ওহাব, আব্দুল্লাহ আল হারুন, অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ, ডা. এএম জাকারিয়া, ওবায়দুল হক (সাংবাদিক), এম সিদ্দিক মিয়া, এনজি মাহমুদ কামাল, মিয়া আবু মোহাম্মদ ফারুকী, এম ইদ্রিস বিএসসি, ইদ্রিস আলম, নুর মোহাম্মদ, শাহ বদিউল আলম, বদন দিদারী, এমএ মান্নান, ডা. এম এ মান্নান, এসএম ইউসুফ, ইনঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, শহীদ মুরিদুল আলম, মৌলভী সৈয়দ, প্রয়াত এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী প্রমুখ।একটি চারাগাছ যতœ করলে এটি যেমন ফুলে ফলে বেড়ে উঠে, বঙ্গবন্ধুর স্নেহ ভালবাসায় সিক্ত হয়ে চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ সেভাবে সুসংগঠিত হয়েছে। রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে বঙ্গবন্ধু চট্টগ্রামকে গুরুত্ব দিতেন সর্বদা। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা বার্তা চট্টগ্রামে প্রেরণ করে চূড়ান্ত ভাবে তিনি তা প্রমাণ করেন। বঙ্গবন্ধু ভালবাসত চট্টগ্রামকে, তাঁর ভালবাসা চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের চলার পথের অনুপ্রেরণা। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতে সেই প্রেরণা তিল পরিমাণ কমতি হয়নি। বঙ্গবন্ধুর ভালবাসায় জনমানুষের অন্তরে স্থান করে এগিয়ে চলেছে আওয়ামী লীগ। আগামীর পথচলা শুভ হোক, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ চির জাগরুক হোক, ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এটাই প্রত্যাশা

লেখক: ইতিহাস বিষয়ক গবেষণাকর্মী