মোহাম্মদ খান ছিদ্দিকী (রহ.) নায়েবে উজির জামে মসজিদ

40

সবুর শুভ

বাংলাদেশে ইসলামের আগমন ঠিক কবে ঘটেছিল তা সুনির্দিষ্টভাবে দিন তারিখ উল্লেখ করে বলা কঠিন। তবে এই সম্পর্কে ঐতিহাসিকগণের পরিবেশিত তথ্যাদি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, হিজরি প্রথম শতকেই ভারতীয় উপমহাদেশে তথা মালাবারে ইসলামের আগমন ঘটে এবং বাংলায় ইসলাম আগমনের পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয় চট্টগ্রাম অঞ্চল। বিভিন্ন হিসাব-নিকাশ এবং তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে বলা যায়, খ্রিস্টাব্দ অষ্টম অথবা নবম শতকে চট্টগ্রামের সঙ্গে আরবের মুসলমান বণিকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ স্থাপিত হয়। আর সেই সূত্র ধরে বাংলায় ইসলামের আগমন ঘটে। প্রসঙ্গে বাংলাদেশের খ্যাতিমান ঐতিহাসিক ড. আবদুল করিম লিখেছেন, ‘খ্রিস্টীয় অষ্টম অথবা নবম শতাব্দীতে চট্টগ্রামের সঙ্গে আরবীয় মুসলমান বণিকদের যোগাযোগ ছিল। যুগেযুগে ইসলামি ভাবধারার গোড়াপত্তন, মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ, জাগতিক ও আধ্যাত্মিক প্রেমের নিদর্শন ও ইতিহাস ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে বিভিন্ন ধর্মীয় স্থাপনা গড়ে তুলেছেন সমাজ ও ধর্ম হিতৈষী প্রভাবশালী মানুষজন। এসব স্থাপনার মধ্যে নান্দনিক ও ঐতিহ্যমন্ডিত অনেক মসজিদ এখনও কালের সাক্ষী হয়ে আছে তৎকালীন সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে। একদিকে ইবাদতগাহ আরেকদিকে ইতিহাস ঐতিহ্য ও স্থাপত্যের অংশ মিলে অনন্য এসব মসজিদ আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে এখনও। এই ধরনেরই একটি ইসলামি ঐতিহ্যের স্মারক মোহাম্মদ খান ছিদ্দিকী (রহ.) নায়েবে উজির জামে মসজিদ। লোহাগাড়া উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের মল্লিক ছোবহান চৌধুরী পাড়ায় ৩৫৬ বছরের এই মসজিদটির অবস্থান। মসজিদটি এলাকায় ছোট্ট মসজিদ বা কেরানি মসজিদ হিসাবেও পরিচিত। কালের পরিপক্রমায় এটি আজ প্রাচীন স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন। মোগল স্থাপত্যের অনন্য মুসলিম নিদর্শনও। মসজিদের পরতে পরতে নান্দনিকতার ছোঁয়া। দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যশৈলী। রুচিশীল পরিপাটি কাজ। শক্ত-মজবুত গাঁথুনি। সবমিলে পরিপাটি নিটোল কালের প্রতিনিধি হিসেবে এই মসজিদের সুনাম সুবিদিত।
এদিকে ইসলামের প্রবশেদ্বার হিসেবে চট্টগ্রামের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে এ ধরনের বহু ঐতিহাসিক নিদর্শন ও নান্দনিক স্থাপত্য শৈলী। মসজিদের গায়ের উপর থাকা শিলালিপি অনুসারে ১৬৬৬ খৃস্টাব্দে চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার আমিরাবাদের মোহাম্মদ খান ছিদ্দিকী (রহ.) নায়েবে উজির জামে মসজিদটি নির্মিত হয়। মুঘল আমলে নির্মিত আয়তাকার আকৃতির এই মসজিদের ৩টি বড় গম্বুজ রয়েছে, যা স্থাপত্য শৈলীর অপূর্ব নিদর্শন। মসজিদের উত্তর পাশে দীঘি, পূর্ব পাশে পুকুর রয়েছে। মসজিদের নামে ৩৬০ দ্রোন জমি বরাদ্দ ছিল। এ ঐতিহাসিক মসজিদে এক সঙ্গে প্রায় ৭শ’ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। মোহাম্মদ খান সম্রাট শাহজাহানের নায়েবে উজির ছিলেন। তিনি তাঁকে মহাস্থানগড় গৌড় রাজ্যের অধিপতি নিযুক্ত করেন। সম্রাট আওরঙ্গজেব মামা শায়েস্তা খানকে বাংলার সুবেদার নিযুক্ত করায় মোহাম্মদ খান অভিমান করে মহাস্থানগড়ের অধিপতি ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম প্রচারে মনোনিবেশ করেন।
মোহাম্মদ খানের পরবর্তী বংশধররা এখনও এ এলাকায় আছেন। চট্টগ্রামকে যেমন ওলি-দরবেশের পুণ্যভূমি বলা হয় তেমনি ইসলামী শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র মনে করা হয় চট্টগ্রাম জেলার লোহাগাড়াকে। মসজিদটিকে ঘিরে রয়েছে এলাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্য। কিন্তু ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে এই ঐতিহ্য। বস্তুত প্রাচীন এই নিদর্শনটি কালের সাক্ষী হয়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে লালন করে আসছে। এলাকাবাসীর দাবি, মুঘল আমলে নির্মিত এ মসজিদের অপূর্ব স্থাপত্য শৈলী সংরক্ষণে রাখার ব্যবস্থা করা হোক।