মেধাপাচারকে অর্থপাচারের চেয়ে খাটো করে দেখার অবকাশ নেই

11

কাজি রশিদ উদ্দিন

আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পার করতে যাচ্ছি। এ সময় নানা বিষয়ের আলোচনা-সমালোচনা পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে। অর্থপাচারের বিষয়টি প্রায়ই আলোচনা হতে দেখি। এক্ষেত্রে তথ্যবহুল বক্তব্যের একটি বিষয় আলোচনা হওয়া উচিত-তা হলো মেধা পাচার। মেধাপাচারকে অর্থপাচারের চেয়ে খাটো করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। যথাযথ মূল্যায়নের অভাব, সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তিতে অনিয়ম, ভর্তি-চাকুরি পদোন্নতির ক্ষেত্রে সুষ্ঠু নীতিমালা না থাকায় এমনটা হচ্ছে। সেই সাথে আছে রাজনৈতিক শিষ্টাচারের অনুপস্থিতি, পরিবেশ দূষণ এবং সন্তানের নিরাপদ ভবিষ্যত প্রসঙ্গ।
অপরদিকে তদবির বাণিজ্য এতটা প্রকট হয়ে উঠেছে যে, অযোগ্যতা-অদক্ষতার ভারে প্রতিষ্ঠানগুলো নুইয়ে পড়ছে। পরাজয় ঘটেছে মেধার। অর্থের লেনদেনে। প্রকৃত মেধাবীরা হেরে যাচ্ছে এবং হতাশা থেকেও বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন অনেকে। এক সময় দেখা যেত, বিদেশ থেকে ভালো ভালো ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরে নিজ পেশায় যোগ দিত প্রায় সবাই। এখন এই হার কমে গেছে। বিভিন্ন দেশে থেকে যাওয়ার প্রবণতা বেড়ে যাচ্ছে। রাজনীতির কোন্দল, হানাহানি, অস্থির পরিবেশ মানুষকে বিদেশমুখী করছে দিন দিন। শুনা যায়, এসব বঙ্গসন্তানরা অনেক বেশি পরিশ্রম করছেন বিদেশে। সহায়ক কর্মীর অভাবে নিজ পেশার পাশাপাশি পারিবারিক কাজে যথেষ্ট সময় দিতে হয়। তারপরও তাদেরকে বলতে শুনি, ভালো আছি, খাটাখাটনি করি, খাই-দাই, নিশ্চিন্তে ঘুমাই। সব মিলিয়ে একটা সিস্টেমের মধ্যে আছি।
বিদেশের প্রতি তাদের এই আসক্তির কারণে আস্তে আস্তে দেশের প্রতি আকর্ষণ কমতে থাকে। বিদেশের আয়-উপার্জন সেখানে রাখার পাশাপাশি দেশের সম্পদ বেচা-বিক্রি করে সে দেশে নিয়ে যেতে থাকে। একথা সত্য যে নি¤œ আয়ের শ্রমিক শ্রেণীর মানুষ আয়ের পয়সা দেশে পাঠিয়ে থাকেন। তবে উচ্চবিত্তের বিষয়টা ভিন্ন। পেশাজীবী মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্তের ছেলে-মেয়েদের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুযোগ পেলে বিদেশে পড়তে যাওয়া। ছেলে-মেয়েরা এক পর্যায়ে পড়াশোনার পাশাপাশি খÐকালীন কাজের সুযোগ পেয়ে যায়। ডিগ্রি নেয়া, চাকুরির ব্যবস্থা হওয়া, তারপর আস্তে আস্তে বিদেশের জীবনযাত্রার সাথে অভ্যস্থ হয়ে পড়ে। মা-বাবাও সন্তানের নিরাপদ ভবিষ্যৎ চিন্তা করে তাদের বসতির ব্যবস্থাদি পাকাপোক্ত করার জন্য অর্থের জোগান দিতে থাকেন।
বিদেশে একটি সুবিধা আছে, অল্প বিনিয়োগে ব্যাংক ঋণের সহায়তায় বাড়ি-গাড়ির বন্দোবস্ত হয়ে যায়। সুযোগ সুবিধাম মতো বাবা-মা ভ্রমণ করতে থাকেন। দেশের নানাধি ঝুটঝামেলা আর সমস্যা থেকে আইনকানুন দ্বারা পরিবেষ্টিত সমাজে নাম লেখাতে পেরে তারাও ধন্য বোধ করে। থাকার অনুমতি, কাজের ব্যবস্থা, পরবর্তি সময়ে পাসপোর্ট … ধীরে ধীরে এসবের মধ্য দিয়ে এগোতে থাকে।
অর্থনীতি, সমাজ, দেশ গঠন- সবকিছুর মূলে রয়েছে শিক্ষা। কোনো সন্দেহ নেই, মেধার গুরুত্ব সর্বধিক। মেধাকে অস্বীকার করে কোনো দেশ-অগ্রসর হতে পারেনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পরাজয় নিশ্চিত জেনে বিজয়ের আগ মুহূর্তে দেশের বিশিষ্টজনদের (বুদ্ধিজীবীদের) নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। সদ্য স্বাধীনতা পাওয়া জাতিটি যাতে অগ্রসর হতে না পারে ওই হত্যাকান্ডের উদ্দেশ্য ছিল তাই।
সিঙ্গাপুরসহ বহু উন্নত রাষ্ট্র শিক্ষার ওপর সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করে উন্নতির শিখরে আরোহন করেছে। এ কথা বিশ্বের সব উন্নত দেশের জন্যই প্রযোজ্য। মেধাবী দেশে মাতৃকার সুসন্তান দেশ গণহারে দেশত্যাগের হিসাব কেউ রাখছেন কি ? এই দিকটা খতিয়ে দেখা খুব জরুরি। মেধাপাচারের সাথে সাথে অর্থের স্থানান্তরও ঘটছে। এ বিষয়ে পর্যালোচনা, সমীক্ষা করা দরকার, কারণ খুঁজে বের করা তা প্রতিরোধের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ সময়ের দাবি।
সরকারি কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে মেধাবীরা সুযোগ পেয়ে থাকেন। মেধার ক্রমানুসারে ভর্তির বিষয়টি নিশ্চিত হচ্ছে, যা স্বাভাবিক। সেই স্বাধীনতা উত্তরকালে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে আমরা চাকরিতে যোগদান করেছিলাম। মফস্বল শহর থেকে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে পরীক্ষা দিয়েই চাকুরি পাওয়া যেত। চাচা-মামার কোনো রেফারেন্স ছিল না, প্রয়োজনও হয়নি। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে আজ শুনতে হয় ভর্তির তদবির, চাকুরির তদবির, ক্ষমতা আর অর্থের দাপটে মেধাবীরা গুটিয়ে গেছেন।
আজ চাকুরি প্রার্থীদের ‘মামা-চাচা বা কোনও প্রভাবশালীর তদবির ছাড়া চাকুরি নেই’ একথা শুনতে হয়। চাকুরিপ্রার্থীদের মধ্যে একটা নেতিবাচক চিন্তা গড়ে উঠেছে। ‘স্বাভাবিকভাবে কিছু হবে না’। এই ধারণা তাদেরকে রুদ্ধ করে বিপথে নিয়ে যাচ্ছে। ভর্তি বাণিজ্য চাকুরি বাণিজ্য নিয়ে কিছু কিছু সংবাদ প্রকাশ পেলেও লক্ষনীয় কোনো পদক্ষেপ দেখা যায় না। এসব মানুষ কিন্তু অর্থপাচারের জন্য বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন না। তবে সঙ্গত কারণে মেধার সাথে অর্থ সম্পদের ব্যাপারটাও জড়িয়ে যাচ্ছে। যারা এভাবে চলে যান, তাদের দুঃখের জায়গাগুলো কোথায়?
কোন কষ্টে তারা নিজের মাতৃভূমিকে ভুলে থাকতে পারছেন ? তাদের সেই কষ্টকে উপলব্ধি করতে হবে। সমাজ সংস্কারদের দৃষ্টিতে বিষয়টা খতিয়ে দেখতে হবে। পুরো ব্যাপারটাকে হালকাভাবে দেখার কোনো অবকাশ নেই। সুদূরপ্রসারী ভাবনার আলোকে চিন্তা করা দরকার। ধনীদের অর্থপাচারের ক্ষেত্রে একটি কমিটির মাধ্যমে তদন্ত করে টাকাগুলো ফিরিয়ে আনা উচিৎ। যেনতেন উপায়ে দ্রুত কিভাবে ধনী হওয়া যায় এটিও চিন্তা করার বিষয়।
রাজনৈতিক হানাহানি, নানা ষড়যন্ত্র এই অঙ্গনটিকে কলুষিত করেছে। সুষ্ঠু, সুন্দর, বাসোপযোগী আর গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টির দায়িত্ব সব দলের রাজনীতিবিদদের। সরকারের গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে তার দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করে তোলার জন্য একটি শক্তিশালি বিরোধী দল থাকা খুবই জরুরি। একজন ব্যক্তি শুধু নিজের জন্য বাঁচে না। বরং দেশ, পরিবার, গোষ্ঠী, সমাজ, দেশের প্রতি তার কিছু প্রতিশ্রুতি থাকতে হয়। এই সত্যটা প্রত্যেককে ধারণ করতে হবে। প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দি ইংরেজিতে বলেছিলেন। ‘It I am to live only for myself, then there is no hoint in such living..’ অর্থাৎ যদি আমাকে কেবল নিজের জন্য বাঁচতে হয়, তবে এই বাঁচার কোনো অর্থ হয় না। এই মানসিকতা, দায়িত্ববোধ সৃষ্টিতে সমাজপতিদের ভ‚মিকা রাখতে হবে। কবি বলেছেন,
‘আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে আসেনি কেহ ধরনি তলে,
সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকেই আমরা পরের তরে’।
দেশে অনেক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। আশা করি তারা মেধাপাচার নিয়ে কাজ করবে। কারণ এবং প্রতিকার খুঁজে বের করবে। এটা এখন সময়ের দাবি।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট