মেট্রোরেলের উদ্যোগ খুলছে সম্ভাবনার দ্বার

85

নগরীতে মেট্রোরেল করার উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)। সিটি কর্পোরেশন এলাকায় এ দ্রæত গণপরিবহন ব্যবস্থা হবে তিনটি লাইনে। যার মোট দৈর্ঘ্য সাড়ে ৫৪ কিলোমিটার। তা বাস্তবায়ন করতে আনুমানিক ৮৪ হাজার ২০২ কোটি ৫ লাখ টাকা ব্যয় হবে।
এ নিয়ে গতকাল চসিকের সম্মেলন কক্ষে বাসস্থান ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড কনসালটেন্টস লিমিটেড নামে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের প্রাক-যোগ্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য উঠে আসে।
তবে এমন পরিকল্পনা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আরবান ট্রান্সফোর্ট মাস্টারপ্লানেও রয়েছে। সিটি কর্পোরেশনের এমন উদ্যোগে সিডিএকে অনাপত্তি দেওয়ার আহŸান জানান সিটি মেয়র। তবে এ বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলেননি সিডিএ চেয়ারম্যান।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। বিশেষ অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান মো. জহিরুল আলম দোভাষ।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের ডেপুটি টিম লিডার মাহবুবুর রহমান তথ্যচিত্র উপস্থাপন করেন। এতে কালুরঘাট থেকে বহদ্দারহাট, চকবাজার, লালখান বাজার, দেওয়ানহাট, পতেঙ্গা হয়ে বিমানবন্দর পর্যন্ত সাড়ে ২৬ কিলোমিটার, সিটি গেট থেকে একে খাঁন বাসস্টপ, নিমতলী বাসস্টপ, সদরঘাট, ফিরিঙ্গিবাজার হয়ে শাহ আমানত সেতু পর্যন্ত সাড়ে ১৩ কিলোমিটার এবং অক্সিজেন থেকে মুরাদপুর, পাঁচলাইশ, আন্দরকিল্লা, কোতোয়ালি হয়ে একে খাঁন বাসস্টপ পর্যন্ত সাড়ে ১৪ কিলোমিটার (ম্যাস রেপিড ট্রানজিটের-এমআরটি) মেট্রোরেল লাইন চালুর উদ্যোগ উপস্থাপিত হয়।
এছাড়া সাড়ে ৫৪ কিলোমিটারের তিনটি লাইনে ৪৭টি স্টেশনের প্রস্তাব করা হয়। একেকটি স্টেশনের দূরত্ব হবে ৭০০ মিটার থেকে ২ দশমিক ৪ কিলোমিটার। ঘণ্টায় ৪৫ কিলোমিটার গড় গতিবেগ থাকবে মেট্রোরেলের। ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটির মাধ্যমে ঘণ্টায় দুই প্রান্তে ৬০ হাজার যাত্রী পরিবহন সম্ভব। প্রতিটি এমআরটি লাইনের জন্য ৬০ একরের অর্থাৎ তিনটি লাইনের জন্য ১৮০ একর জায়গা দরকার হবে। জায়গাগুলো হুকুম দখল করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এসব তথ্য উপাস্থাপন করা হলেও প্রকল্পটি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে কোনো স্পষ্ট ধারণা দেওয়া হয়নি।
এ প্রাক যোগ্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদনে কিছু প্রতিবন্ধকতার কথা বলা হয়। প্রতিবন্ধকতা গুলো হচ্ছে বহদ্দারহাট-লালখান বাজার সড়কাংশে ইতোমধ্যে সিডিএ কর্তৃক উড়াল সড়ক (ফ্লাইওভার) নির্মাণ করা হয়েছে, লালখান বাজার থেকে বিমানবন্দর সড়কাংশে পতেঙ্গা পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করছে সিডিএ।
এসব প্রতিবন্ধকতার সমাধানে বলা হয়, লালখান বাজার থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত চলমান ফ্লাইওভারে কাজ বন্ধ রেখে এমআরটি স্থাপনকে অগ্রাধিকার প্রদান করা, ওই ফ্লাইওভারের ডিজাইন পুনর্বিবেচনা করে সমন্বিতভাবে ফ্লাইওভার ও এমআরটি স্থাপন করা যেতে পারে, ফ্লাইওভারের পাশ দিয়েও এমআরটি নির্মাণ করা যেতে পারে, তবে সেক্ষেত্রে ভূমি হুকুম দখল, ক্ষতিপূরণ ও ইউটিলিটি শিফটিং এর জন্য ব্যয় ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে।
এ প্রতিবেদনের উপর নিজ নিজ মতামত তুলে ধরেন নগর পরিকল্পনাবিদ, প্রকৌশলী, রাজনৈতিক সংগঠন ও বিভিন্ন সেবা সংস্থার প্রতিনিধিগণ।
নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী আলী আশরাফ বলেন, চট্টগ্রামের জন্য এমআরটি দরকার এ বিষয়ে দ্বিমত নেই। এটি মেয়রের সাহসী উদ্যোগ। চট্টগ্রাম এক রাস্তার শহর। ইতোমধ্যে ওয়াসা, সিডিএ অনেকগুলো প্রকল্প এ রাস্তার উপর নিয়েছে। রাস্তাগুলোকে আর কত নির্যাতন করা হবে? হুকুম দখল, ইউটিলিটির লাইন সরানো কঠিন ও ব্যয়বহুল। তাই ৫শ গজ দূরে নতুন লাইনের পরিকল্পনা নিতে পারতেন।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরে চ্যালেঞ্জে আছে। বে-টার্মিনাল বাস্তবায়িত হচ্ছে। এবারের মতো জলাবদ্ধতা ও যানজট জীবনে দেখিনি। তাই এমআরটি লাইন নির্বাচনে গভীরভাবে ভাবতে হবে। এটি স্বপ্নের প্রকল্প, এর বিকল্প নেই। মিরসরাইয়ের বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরের কথা চিন্তা করে ৫০-১০০ বছর ব্যবহার উপযোগী এমআরটির পরিকল্পনা করতে হবে। চট্টগ্রাম শহরকে বাঁচাতে হলে চসিক-সিডিএর সমন্বয় জরুরি। এছাড়া এমআরটির জন্য এত জায়গা হুকুম দখল করা সম্ভব কি না সেটাও ভাববার বিষয়।
নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া বলেন, স্বাধীনতার পর চট্টগ্রামের একজন মেয়র গণপরিবহন নিয়ে ভাবছেন। সেজন্য তাকে ধন্যবাদ জানাই। তবে আজকের প্রতিবেদনে যা দেখলাম, তাতে কিছু প্রতিবন্ধকতার কথা বলা হয়েছে। ২০১৬ সালের ৯ এপ্রিল সেমিনার করে আমরা তুলে ধরেছিলাম, যদি অল্প কিছুসংখ্যক মানুষের জন্য হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিময়ে ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়, তাহলে পরবর্তীতে এমআরটি, বিআরটি কোনো কিছুই প্রয়োগ করা যাবে না। তখন না বুঝলেও এখন সেটা বোধগম্য হচ্ছে।
তিনি বলেন, ফ্লাইওভার নির্মাণ করতে গিয়ে বন্দরের বাধার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। কেননা সবার ঊর্ধ্বে বন্দরকে রাখতে হবে। তাই আরও অনেক স্টাডি লাগবে। বন্দরকে বাদ দিয়ে কিছু করা যাবে না চট্টগ্রামে। পুরো দেশের জন্য চট্টগ্রামকে বাঁচাতে হবে। বে-টার্মিনাল হলে বারিক বিল্ডিং থেকে সল্টগোলা সড়কে চাপ কমবে। বন্দরের সাথে বসে তাদের মতামত নিতে হবে। অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। তিনি বলেন, আইএসপিএস কোড মানলে বন্দরের ওপর দিয়ে ফ্লাইওভার করা যাবে না। নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকে।
চুয়েটের ভিসি রফিকুল আলম বলেন, ভিশন হতে হবে দূরদর্শী। নগরের আয়তন বাড়বে। ২০৪১ সালের চট্টগ্রাম কেমন হবে, সেই দূরদর্শিতা থাকতে হবে। প্রতিবেদনে প্রকল্প কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, তার কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই। তাছাড়া কী পরিমাণ জায়গা হুকুম দখল করতে হবে এবং তা করা বাস্তবপক্ষে সম্ভব কি না? এ নিয়েও কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই। এটা নিয়ে আরও স্টাডি করার পরামর্শ দেন তিনি।
স্থপতি আশিক ইমরান বলেন, ৬০ লাখ জনসংখ্যার শহরে মেট্রোরেল অপরিহার্য। ইকোনমিক জোনগুলো সংযুক্ত রাখতে হবে। সিডিএ ২০৪১ সালের আলোকে মাস্টারপ্ল্যান করতে যাচ্ছে। ওয়ার্ড পর্যায়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে নিয়ে কমিটি করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞ কমিটি হয়েছে। মাস্টারপ্ল্যানের আলোকে এমআরটি হওয়া উচিত। পটিয়া, রাউজান, হাটহাজারীকে এমআরটির সুবিধা দেওয়া উচিৎ।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের বিধান রায় বলেন, চট্টগ্রামে আমি এমআরটি চাই। এটি সাহসী পদক্ষেপ। ২০ কিলোমিটারে ঘণ্টায় ৬০ হাজার যাত্রী দরকার। এমআরটি চালু হলে নগরে গাড়ি চলাচল কমে যাবে। এমআরটির বিকল্প নেই। ভবিষ্যতে হাটহাজারী, মিরসরাইকে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রাখতে হবে।
চসিকের প্রধান প্রকৌশলী লে. কর্নেল মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, এ এমআরটি বা মেট্রোরেল কোনো মাস্টারপ্লানের সাথে মিল রয়েছে কি না, তা বিবেচনায় রাখতে হবে। ওসব প্লানের সাথে এ প্লানের মিল কি এবং কি সংযুক্ত হয়েছে বা বাদ দিতে হবে তাও নির্ধারণ করতে হবে। এখন সিটি কর্পোরেশন ফিজিবিলিটি স্টাডি করছে। পরে যদি অন্য কোনো সংস্থা এসে বাস্তবায়ন করে, তাহলে প্রকল্পটাই বরবাদ যাবে। তাই বাস্তবায়ন কর্তৃপক্ষ ও রক্ষণাবেক্ষণ আগে থেকে নির্ধারণ করতে হবে। তাই তিনি সিডিএ-কে অনাপত্তি পত্র দেওয়ার আহŸান জানান।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী প্রবীর কুমার সেন বলেন, সিডিএ-চসিকের সমন্বয় নেই, এ রকম শুনি। কিন্তু আজ দুই সংস্থার প্রধানকে এক সঙ্গে দেখে খুব খুশি হয়েছি। এমআরটির বিষয়ে সত্যিকার ফিজিবিলিটি স্টাডি করতে হবে। অবশ্যই বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, টেলিফোন, ইন্টারনেট ইত্যাদি ইউটিলিটি সরানোর অর্থ বরাদ্দ রাখতে হবে।
চসিকের প্রধান পরিকল্পনাবিদ রেজাউল করিম বলেন, এমআরটি হতে হবে সমন্বিত। উন্নয়নের জন্য চট্টগ্রামের পাহাড়, সাগর, নদীর ক্ষতি করা যাবে না।
সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী হাসান বিন শামস বলেন, ফ্লাইওভার ও এমআরটি দুটোই দরকার। এজন্য সমন্বয় দরকার। ঢাকায় এমআরটি কর্তৃপক্ষ করেছে। ৫০-১০০ বছরের যাত্রীর চাপ বিবেচনা করতে হবে। নগর স¤প্রসারণ বিষয়ে ভাবতে হবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান মো. জহিরুল আলম দোভাষ বলেন, আমার মতামত হচ্ছে, যেকোন প্রকল্প শুরু করার আগে সকল সেবাসংস্থার সাথে বসে মতামত নেওয়া উচিত। আজকে রেলওয়ে ও বন্দর কর্তৃপক্ষের কেউ থাকলে আলোচনা করতে আরও সুবিধা হত। আমরা সবাই একটি রোডই ব্যবহার করছি। এ একটিতে আর কত প্রকল্প চলবে?
এ প্রসঙ্গে সিটি মেয়র বলেন, জীবন-জীবিকার তাগিদে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে এ শহরে বিভিন্ন পেশার মানুষ আসছে। ফলে মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রতিনিয়ত। এদের জন্য গণপরিবহনসহ বিভিন্ন সেবা নিশ্চিত করা নগরীর সেবাসংস্থাগুলোর নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। নগরবাসীকে সেবাদানের জন্য ৩২টি সেবা সংস্থা রয়েছে। প্রতিষ্ঠান সমূহের কার কী দায়িত্ব, তা লিপিবদ্ধ আছে। প্রতিষ্ঠানসমূহ যতবেশী সচল হবে, নগরবাসী ততবেশী উপকৃত হবে।
তিনি বলেন, ৩২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়রই একমাত্র জনপ্রতিনিধি। তিনি নগরবাসীর প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত। অপরাপর প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা সরকার কর্তৃক মনোনীত। তাই তাদের উচিত নগর উন্নয়নে সিটি মেয়রকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা।
মেট্রোরেল নির্মাণ প্রসঙ্গে মেয়র বলেন, এমআরটির প্রাক-যোগ্যতা সমীক্ষার উপর আরও বৃহৎ পরিসরে মতবিনিময় হবে। এরপর চ‚ড়ান্ত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। এ মেট্রোরেল নির্মাণে নগরসেবা সংস্থাসহ নগরবাসীর সহযোগিতা কামনা করেন মেয়র।
তিনি বলেন আধুনিক বিশ্বে শহরকেন্দ্রিক গণপরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে এমআরটি অপ্রতিদ্ব›দ্বী মাধ্যম। এটি শুধু গণপরিবহন নয়, দ্রুত গণপরিবহন। তাই সকল উন্নত দেশে এমআরটি ব্যবস্থা চালু রয়েছে। চট্টগ্রাম শুধু বন্দর নগরীই নয়, এটি দেশের বাণিজ্যিক রাজধানীরও। তাই মেট্রোরেল স্থাপন এ নগরীর জন্য সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।