মূল্য বাড়াতে কেউ মজুতদারিতে কেউ রাস্তায় পণ্য ফেলে প্রতিবাদে

23

নিজস্ব প্রতিবেদক

গেল চারমাসে তিন দফা তেলের দাম নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে সরকারিভাবে। তেলের দামবৃদ্ধির এই প্রভাব পড়ায় মানুষ তেল নিয়ে রীতিমত দিশেহারা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা কায়দা করে তেলের দাম বাড়িয়ে নেয় দফায় দফায়। প্রতিবারই কারণ দেখানো হয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধিকে। এবার চা পাতার ন্যায্য মূল্যের দাবিতে রাস্তায় নেমেছেন চা চাষী এবং চা বাগান মালিকরা। পঞ্চগড়ে কারখানা মালিকদের ‘সিন্ডিকেট ভেঙে’ তাদের কাছ থেকে ন্যায্য মূল্যে কাঁচা পাতা কেনার দাবি জানিয়েছেন বাগান মালিক ও চাষিরা। এই দাবিতে বৃহস্পতিবার দুপুরে পঞ্চগড়ের চৌরঙ্গি মোড়ে স্থানীয় ‘চা বাগান মালিক সমিতি’ এবং ‘চা চাষী অধিকার বাস্তবায়ন পরিষদ’ যৌথভাবে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে। এই কর্মসূচি চলাকালে চাষিরা সড়কে কাঁচা চা পাতা বিছিয়ে মানববন্ধন ও সমাবেশ করেন। প্রশ্ন উঠেছে, এবার কি অন্য কায়দায় চা পাতার দামও বাড়ানোর তৎপরতা শুরু হয়েছে?
এই ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চা বাগানের মালিক, শ্রমিক ও চাষিদের মধ্যে কাজের পারস্পরিক সমন্বয় সাধন না করলে যে কোন সময় চায়ের দামও বেড়ে যেতে পারে। এক্ষেত্রে সরকারি হস্তক্ষেপ জরুরি বলেও মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে সমাবেশে বাগান মালিক সমিতির নেতা ও সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান শেখ মিলন জানান, ‘চা পাতা সংগ্রহের এই ভরা মৌসুমে কৃষকদের ঠকিয়ে কারখানার মালিকরা ‘সিন্ডিকেট’ করে প্রতিবছর চা পাতা ক্রয় করছে। শুধু কম দামে নয় বিভিন্ন অজুহাতে ইচ্ছেমত দাম কর্তন করেই চলছে কারখানা কর্তৃপক্ষ। মৌসুমের শুরুতে ২০ থেকে ২২ টাকা কেজিতে চা পাতা ক্রয় করলেও বর্তমানে ১২/১৩ টাকাও প্রতি কেজি চা পাতার মূল্য পাচ্ছে না চাষিরা। অথচ বাজারে চা পাতার কেজি ২৩৫ থেকে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে বর্তমানে।
এ বিষয়ে চা চাষী অধিকার বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি আবু সাইদ জানান, ‘উৎপাদন খরচের থেকে কম দামে চা পাতা বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন চাষিরা। নিলাম বাজারে চায়ের ভালো দাম না পাওয়ার দোহাই দিয়ে প্রতি বছর সিন্ডিকেটের কারণে কারখানা মালিকরা চাষিদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা কৌশলে ঠকিয়ে নিচ্ছে।’ এর আগে বুধবার সন্ধ্যায় একই দাবিতে তেঁতুলিয়া উপজেলা চা চাষিদের আয়োজনে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
এ বিষয়ে পঞ্চগড় আঞ্চলিক চা বোর্ড কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ শামিম আল মামুন জানান, ‘চাষিদের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়ার পর পঞ্চগড়ের চা প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানার মালিক ও চাষিদের সাথে কথা হয়েছে। করণীয় ঠিক করতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আগামী ১৮ মে বিকালে বাগান মালিক, চা চাষী ও জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে জরুরি সভার আয়োজন করা হয়েছে। দুই পক্ষের বক্তব্য শুনে বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’
অন্যদিকে বর্তমানে বাজারে সয়াবিন তেলের দাম ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হচ্ছে। সর্বশেষ তথ্য মতে, ভোজ্য তেলের বর্তমান বাজার মূল্য ১৯৮ টাকা মোড়কজাত সোয়াবিন। খোলা সয়াবিন বিক্রয় হচ্ছে প্রতি লিটার ১৮০ টাকা। খোলা পামওয়েল বিক্রি হচ্ছে প্রতি লিটার ১৭২ টাকা। অন্যদিকে বোতলজাত সয়াবিন ৫ লিটার বিক্রয় করা হচ্ছে ৯৮৫ টাকা। তবে উপরে উল্লেখিত মূল্য সব সময় পরিবর্তনশীল।
গত সপ্তাহে এক লাফে বোতলজাত সয়াবিন লিটারে ৩৮ টাকা এবং খোলা সয়াবিন লিটারে ৪৪ টাকা বাড়ানোর ঘোষণা দেন ব্যবসায়ীরা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পরামর্শ করে নিজেরাই এই মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স ও বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স এসোসিয়েশন। এ নিয়ে গত ৪ মাসের মধ্যেই তৃতীয় দফায় বাড়ানো হলো ভোজ্য তেলের দাম। দাম বৃদ্ধি নিয়ে বরাবরই আন্তর্জাতিক বাজারের অজুহাত দিয়ে আসছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধির ফলে আমদানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়েই বাড়ানো হচ্ছে দাম। অনেকের অভিযোগ, বাড়তি মুনাফা লাভের জন্যই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজারে তেলের সংকট সৃষ্টি করে দফায় দফায় দাম বাড়ানো হচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় এবার ঈদের আগে থেকেই তেলের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হয়। ভোক্তাদের জিম্মি করে নেয়া হয় বাড়তি দাম। স্বয়ং সরকারও এসব ব্যবসায়ীর কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। ফলে সরকার যেকোনো পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে দিলেও তা মানা হয় না। বরং ইচ্ছেমতো দফায় দফায় বাড়ানো হয় দাম। এ নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি হতাশা প্রকাশ করে বলেছিলেন, ব্যবসায়ীদের প্রতি সরকার বিশ্বাস করেছিল। কিন্তু তারা তা রাখেননি। ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজার নিয়ন্ত্রণ করা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। এখানে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের বিষয় নেই। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন টনপ্রতি ১৯৫০ ডলার। আর পামঅয়েল ১৮০০ ডলার। এখন সরকার যে রেট দিয়েছে এই রেট থেকেও উপরে পড়বে বর্তমান আন্তর্জাতিক মূল্য। এরমধ্যে আবার ডলারের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। যেখানে রোজার ঈদের ৭-৮ দিন আগেও ছিল ৮৮ টাকা, এখন সেটা হয়েছে প্রায় ৯৫ টাকার উপরে। এখন আন্তর্জাতিক বাজারের এই পরিস্থিতিতে আমাদের আসলে করণীয় কিছুই নেই। আমাদের সোর্স করাটাও কঠিন হয়ে পড়েছে। একদিকে ইন্দোনেশিয়াতেও ব্যান হওয়ায় তারা এক্সপোর্ট অ্যালাও করছে না। সব চাপ পড়েছে মালয়েশিয়ার উপরে। আর মালয়েশিয়াও মে মাসে কোনো অফার দেয়নি। তিনি বলেন, সরকার ভ্যাট কমিয়ে দেয়ার ফলে কিছুটা কম আছে, নাহলে তো তেলের দাম আরও বাড়তো। ৫ শতাংশ ভ্যাট দেয়া হচ্ছে। তারপর আবার বিভিন্ন খরচ আছে।
এনিয়ে বেসরকারি ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনশাস কনজ্যুমার্স সোসাইটির (সিসিএস) নির্বাহী পরিচালক পলাশ মাহমুদ জানান, বর্তমানে তেলের সংকট সৃষ্টির পাশাপাশি অন্যান্য পণ্যেরও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি ও সিন্ডিকেট করে বাজার অস্থিতিশীল করে থাকেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সামান্য জরিমানার মতো লঘুদন্ড দেয়ায় অসাধু ব্যবসায়ীরা অনৈতিক কর্মকাÐ বন্ধ করছে না। বরং ভোক্তাকে জিম্মি করার এই প্রবণতা তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে বছরে প্রায় ২০ লাখ টন ভোজ্য তেলের চাহিদা রয়েছে। নিজস্ব জোগান বাদ দিয়ে ১৮ লাখ টন তেল আমদানি করতে হয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে ১৮ লাখ টনের বেশি তেল আমদানি করা হয়েছে। ফলে দেশে তেলের কোনো সংকট নেই। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের তদারকির ফলে মিল থেকেও তেল সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। কিন্তু অতিরিক্ত মুনাফার লোভে ডিলার ও খুচরা পর্যায়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বাজার অস্থিতিশীল করেছে।
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরুর পর পর বিশ্ববাজারে ভোজ্য তেলের দর বাড়তে থাকায় দেশের ব্যবসায়ীরাও দাম বাড়ানোর পক্ষে বলে আসছিলেন। এর মধ্যে রোজার ঈদের আগে হঠাৎ করেই খুচরা বাজার থেকে সয়াবিন তেল উধাও হয়ে যায়। যদিও আমদানিতে কোনো সংকট ছিল না। সর্বশেষ গত ফেব্রæয়ারিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ভোজ্য তেলের দাম নির্ধারণ করে দিয়েছিল। বোতলজাত সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১৬৭ টাকা ও খোলা সয়াবিন তেল ১৪৩ টাকা করে নির্ধারণ করা হয়েছিল। এরপর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে মিল মালিকরা দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব নিয়ে মন্ত্রণালয়ে গেলেও সরকার সায় দেয়নি। গত মার্চের মাঝামাঝিতে তেলের আমদানি, পরিশোধন ও বিক্রয় পর্যায়ে ভ্যাট প্রত্যাহারের পর ইদের আগে লিটারে ৮ টাকা করে দাম কমানো হয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে এপ্রিল ও মে মাসে ধীরে ধীরে বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দিতে থাকে বড় প্রতিষ্ঠানগুলো। দাম বৃদ্ধির আশায় ডিলার ও পাইকারি বিক্রেতারাও তেলের মজুত শুরু করে। এসব ঘটনা ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে ধরা পড়ে।
এদিকে ভোক্তারা বলছেন, এক তেলের দাম বাড়ার ফলে সব পণ্যেই এর প্রভাব পড়েছে। একে একে বাড়তে থাকে পেঁয়াজ, রসুন ও আদাসহ বেশির ভাগ ভোগ্যপণ্যের দাম। একেক পণ্যের দাম বাড়িয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে একেকটি অজুহাত হাজির করা হচ্ছে। এবার এক্ষেত্রে যোগ হল চা পাতা। রাস্তায় চা পাতা ফেলে প্রতিবাদের মাধ্যমে দাম বাড়ানোর দাবি কি তারই অংশ? এই প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে।