মুসলিম হৃদয়ে বাইতুল মুকাদ্দাস

24

সৈয়দ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন আল আযহারী

ফিলিস্তিনের জেরুজালেমে অবস্থিত বাইতুল মুকাদ্দাস বাইতুল মাকদিস শরীফ মুসলমানদের নিকট অত্যন্ত পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ স্থান। যা মসজিদুল আকসা ও আল কুদস হিসাবেও বিশ্বব্যাপী প্রসিদ্ধ ও সমাদৃত। আল কুদস ও আল মুকাদ্দাস অর্থ পবিত্র, আর বায়তুল মুকাদ্দাস অর্থ হল অত্যন্ত পবিত্র ঘর। কুরআনুল কারীমে একে ‘মসজিদুল আকসা’ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। যার অর্থ হল দূরবর্তী মসজিদ। কারণ এ মসজিদটি বাইতুল্লাহ শরীফ বা মসজিদে হারাম থেকে অনেক দূরে অবস্থিত তাই একে মসজিদে আকসা বলা হয়েছে।
এই বাইতুল মুকাদ্দাসের সাথে রয়েছে মুসলমানদের ঈমানী সম্পর্ক এবং ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বিরল স্মৃতি। এই মসজিদটি মুসলমানদের প্রথম কেবলা, বায়তুল্লাহ শরীফ ও মসজিদে নববী শরীফের পর তৃতীয় সর্বাধিক পবিত্র স্থান এবং পৃথিবীর ইতিহাসে দ্বিতীয় মসজিদ। যে মসজিদটি হলো রসুলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মেরাজ তথা উর্ধ্বগমনের শুভ সূচনার স্থান। যেই পবিত্র স্থানটির সাথে জড়িয়ে আছে হযরত আদম আলাইহিস সালাম, হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম এবং হযরত সোলায়মান আলাইহি সালামের বরকতময় স্মৃতি এবং হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু ও হযরত সুলতান সালাউদ্দিন আইয়ুবী রহমাতুল্লাহ আলাইহির বিজয় গাঁথা স্মৃতি। যে মসজিদের আশেপাশে রয়েছে অনেক বরকতময় নিদর্শনাবলী। বিশেষ করে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তথা নদ-নদী, গাছপালা ও ফল ফলাদির প্রাচুর্যতা। অন্যদিকে অসংখ্য নবী রসূলগণের পবিত্র মাজার শরীফ এবং তাঁদের বরকতময় জীবনের সাথে সংশ্লিষ্ট অনেক ঘটনা। এই মসজিদেই রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সমস্ত নবী-রাসুলের ইমাম হয়ে মেরাজ রাতে নামাজ আদায় করেছিলেন।
মসজিদে আক্বসা ইসরা ও মিরাজের পুণ্যভূমি : সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ রাসুল হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মু’জিযা হলো পবিত্র ইস্রা ও মি’রাজ। এটা প্রিয় নবীর জীবনে এবং ইসলামের ইতিহাসে একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তিনি ছাড়া পৃথিবীর অন্য কোনো মানুষ, অন্য কোনো নবী-রাসুল, এমন কি কোনো নৈকট্যধন্য ফেরেশতদের জীবনেও এ ধরনের সৌভাগ্যময় ঘটনা সংঘটিত হয়নি এবং কিয়ামত পর্যন্ত হবেও না। স্বয়ং আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন তাঁর প্রিয় হাবিবকে দাওয়াত করে হযরত জিব্রাইলকে পাঠিয়ে ‘বুরাক’ ও ‘রফরফে’ আরোহণ করিয়ে সর্বলোকের অতীত ‘কাবা কাওসায়ন আও আদনা’-এর মাকামে মহান আল্লাহর খাস কুরবতে নিয়ে যান এবং আল্লাহ পাকের দিদার প্রদানে ধন্য করেন। যা আল্লাহ্ পাক রাব্বুল আলামীনের মহান কুদরত ও তাঁর প্রিয় হাবীবের নবূয়্যত-রিসালতের সত্যতার স্বপক্ষে একটি বিরাট প্রমাণ এবং ঈমানদার ও জ্ঞানীদের জন্য হেদায়ত, নেয়ামত, রহমত ও শিক্ষা। মেরাজের রাতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদুল হারাম থেকে আল-আকসা মসজিদে তাশরীফ নিয়ে আসেন এবং এখান থেকেই তিনি ঊর্ধ্বাকাশের দিকে যাত্রা করেন। প্রিয় রাসুলকে ঊর্ধ্বাকাশে ভ্রমণ করানোর আগে আল্লাহর নিদর্শনাবলি দেখানোর জন্য বাইতুল মুকাদ্দাসে নিয়ে আসা থেকেও এ মসজিদের বিশেষ মর্যাদা ও ফজিলত বোঝা যায়। আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেন “তিনি পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাতে ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আক্বসা পর্যন্ত, যার চতুর্দিকে আমি বরকতময়তার বিস্তার করেছি, তাকে আমার নিদর্শনাবলী দেখানোর জন্য। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” [বনী ইসরাঈল, আয়াত-১]
মুসলমানদের নিকট তৃতীয় সর্বাধিক পবিত্র স্থান : মসজিদে আকসা মুসলমানদের কাছে তৃতীয় সর্বাধিক পবিত্র স্থান। হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, ‘তোমরা তিনটি মসজিদ ব্যতীত অন্য কোনো মসজিদে (নামাজ আদায়ের মাধ্যমে অধিক সওয়াব লাভের উদ্দেশ্যে) পরিভ্রমণ করো না। আর সে তিনটি মসজিদ হলো, মসজিদুল হারাম, মসজিদে নববী ও মসজিদুল আকসা।’ (সহিহ বুখারি: ১১১৫)
মুসলমানদের প্রথম কেবলা : ফিলিস্তিনের মসজিদে আকসা মুসলমানদের প্রথম কেবলা। মানবজাতির প্রথম কেবলা ‘কাবা’ শরিফ হলেও মসজিদুল আকসা বা বায়তুল মুকাদ্দাস নির্মাণের পর এটি কেবলা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওহি লাভ ও নবুয়ত প্রকাশের সময় বায়তুল মুকাদ্দাসই কিবলা ছিল। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনা মুনাওয়ারায় হিজরতের প্রায় ১৬/১৭ মাস পর এ কেবলা পরিবর্তন হয়ে পুনরায় ‘কাবা শরীফ’ কেবলা হিসেবে পুনর্নির্ধারিত হয়। এর সাক্ষী হিসেবে মদিনা শরিফে ‘মসজিদ যুল কেবলাতাইন’ বা দুই কিবলার মসজিদ এখনো বিদ্যমান। ঐতিহাসিক এ ঘটনাকে ‘তাহবিলে কেবলা’ বা কেবলা পরিবর্তন বলা হয়। মহান আল্লাহ বলেন, নিশ্চয়ই আমি আপনাকে বার বার আকাশের দিকে তাকাতে দেখছি। অতএব, অবশ্যই আমি আপনাকে সে কেবলার দিকেই ঘুরিয়ে দেব যাকে আপনি পছন্দ করেন। এখন আপনি মসজিদুল-হারামের দিকে মুখ করুন এবং তোমরা যেখানেই থাক, সেদিকে মুখ কর। যারা আহলে-কিতাব, তারা অবশ্যই জানে যে, এটাই ঠিক পালনকর্তার পক্ষ থেকে। আল্লাহ বেখবর নন, সে সমস্ত কর্ম সম্পর্কে যা তারা করে। … আর যে স্থান থেকে তুমি বের হও, নিজের মুখ মসজিদে হারামের দিকে ফেরাও-নিঃসন্দেহে এটাই হলো তোমার পালনকর্তার পক্ষ থেকে নির্ধারিত বাস্তব সত্য। বস্তুতঃ তোমার পালনকর্তা তোমাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অনবহিত নন। আর তোমরা যেখান থেকেই বেরিয়ে আস এবং যেখানেই অবস্থান কর, সেদিকেই মুখ ফেরাও, যাতে করে মানুষের জন্য তোমাদের সাথে ঝগড়া করার অবকাশ না থাকে। অবশ্য যারা অবিবেচক, তাদের কথা আলাদা। কাজেই তাদের আপত্তিতে ভীত হয়ো না। আমাকেই ভয় কর। যাতে আমি তোমাদের জন্যে আমার অনুগ্রহসমূহ পূর্ণ করে দেই এবং তাতে যেন তোমরা সরলপথ প্রাপ্ত হও। (সুরা বাকারা: ১৪২-১৫১)
পৃথিবীর দ্বিতীয় মসজিদ : ইতিহাসে প্রথম নির্মিত মসজিদ দমজসিদুল হারাম‘। এরপরের ¯’ানে আছে সুশোভিত প্রাচীনতম মসজিদে ‘মসজিদে আকসা’। পবিত্র কাবাঘর নির্মাণের ৪০ বছর পর নির্মিত হয় আল আক্সা। তাই এটিই মক্কার পর পৃথিবীর দ্বিতীয় প্রাচীনতম নগরী। হযরত আবু যর গিফারি রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি আরয করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! দুনিয়াতে প্রথম কোন মসজিদটি নির্মিত হয়েছে? তিনি বলেন, মসজিদুল হারাম। আমি পুনরায় আরয করলাম, তারপর কোনটি? প্রতিউত্তরে তিনি বললেন, তারপর হলো মসজিদুল আকসা। এরপর আমি জানতে চাইলাম যে, উভয়ের মধ্যে ব্যবধান কত বছরের? তিনি বললেন চল্লিশ বছরের ব্যবধান। (সহিহ বুখারি: ৩১১৫)
কুরআনের ভাষায় বরকতময় স্থান : পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ফিলিস্তিনকে বরকত ও পুণ্যময় ভূখÐ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। যেমন, আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন, ‘যার আশপাশে আমি বরকত নাজিল করেছি।’ (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত, ১) আল্লাহ তাআলা আরও এরশাদ করেন, ‘আর আমি তাকে (সাইয়িদুনা ইবরাহিম আলাইহিস সালাম) ও লুতকে উদ্ধার করে নিয়ে গেলাম সেই ভূখÐে, যেখানে আমি কল্যাণ রেখেছি বিশ্ববাসীর জন্য।’( সূরা আম্বিয়া, আয়াত, ৭১)
নবী-রাসুলগণের স্মৃতি বিজড়িত বরকতময় স্থান : ঐতিহাসিক এ ¯’ানের সাথে জড়িয়ে আছে মুসলমানদের নানা স্মৃতি। এখানেই শুয়ে আছেন হযরত ইবরাহিম ও হযরত মুসা আলাইহিমাস সালামসহ অসংখ্য নবী-রাসুল। এটি দীর্ঘকালের ওহি অবতরণ¯’ল, ইসলামের কেন্দ্র এবং ইসলামি সংস্কৃতির চারণভূমি। এখানেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সব নবী-রাসুল এবং ফেরেশতাদের নিয়ে নামাজ পড়েছিলেন। যেই জামাতের ইমাম ছিলেন স্বয়ং নবীজি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। এখান থেকেই তিনি বোরাকে করে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার উদ্দেশ্যে ঊর্ধ্ব-যাত্রা করছিলেন। পবিত্র কোরআনের প্রায় ৭০ জায়গায় উচ্চারিত হয়েছে এ মসজিদের কথা।
বায়তুল মুকাদ্দাস হবে হাশরের ময়দান : উম্মুল মুমিনিন মায়মুনা রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহা থেকে বর্ণিত, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে আরয করলাম, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমাদেরকে বায়তুল মাকদিস সম্পর্কে কিছু বলুন!’ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘বায়তুল মাকদিস হলো হাশরের ময়দান। পুনরুত্থানের জায়গা। তোমরা তাতে গিয়ে সালাত আদায় করো। কেননা, তাতে এক ওয়াক্ত সালাত আদায় করা অন্যান্য মসজিদে এক হাজার সালাত আদায়ের সওয়ার পাওয়া যায়। তিনি বললেন, ‘যে ব্যক্তি মসজিদুল আকসাতে গমনের শক্তি-সামর্থ্য রাখেন না তার ব্যাপারে আপনার কী অভিমত?’ তিনি বললেন, ‘সে যেন তার জন্য জ্বালানি তেল হাদিয়া হিসেবে প্রেরণ করে। কেননা যে বায়তুল মাকদিসের জন্য হাদিয়া প্রেরণ করে, সে তাতে নামাজ আদায়কারী ব্যক্তির মতো সওয়ার লাভ করবে।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস, ২৬৩৪৩)
বায়তুল মুকাদ্দাসবাসীর মর্যাদা : হযরত আবু উমামা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, ‘আমার উম্মতের একটি দল সত্যের ওপর বিজয়ী থাকবে। শত্রæর মনে পরাক্রমশালী থাকবে। দুর্ভিক্ষ ছাড়া কোনো বিরোধী পক্ষ তাদের কিছুই করতে পারবে না। আল্লাহর আদেশ তথা কেয়ামত পর্যন্ত তারা এমনই থাকবে। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, তারা কোথায় থাকবেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, ‘তারা বায়তুল মাকদিস এবং তার আশপাশে থাকবেন।’ (মুসনাদে আহমদ: ২১২৮৬)
উম্মুল মুমিনিন হযরত উম্মে সালামাহ রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি মসজিদুল আকসা থেকে মসজিদে হারামে হজ কিংবা ওমরা পালনে গমন করবে তার পূর্বাপর সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে কিংবা তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যাবে।’ (সুনানে আবু দাউদ: ১৪৭৯)
বায়তুল মুকাদ্দাসে নামাজ আদায়ের বিশেষ ফজিলত : বায়তুল মুকাদ্দাসে নামাজ আদায়ের বিশেষ ফজিলত রয়েছে। হযরত আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, ‘মসজিদে হারামে এক নামাজ এক লাখ নামাজের সমান, আমার মসজিদে (মসজিদে নববী) এক নামাজ পঞ্চাশ হাজার নামাজের সমান এবং বাইতুল মাকদাসে এক নামাজ পঁচিশ হাজার নামাজের সমান।’ -(মাজমাউয যাওয়াইদ, ৪/১১)
হযরত সুলায়মান আলাইহিস সালাম যখন এই মসজিদ নির্মাণ শেষ করেন, তখন আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন যে, যে ব্যক্তি কেবলমাত্র নামাজের উদ্দেশ্যেই ওই মসজিদে উপ¯ি’ত হবে, সে ব্যক্তি যেন ওই দিনকার মতো নিষ্পাপ হয়ে ফিরে আসে, যেদিন তার মা তাকে প্রসব করেছিল। (নাসায়ি: ৬৬৯, ইবনে মাজাহ: ১৪০৮)
মসজিদে আকসা নির্মাণের ইতিহাস : হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম কর্তৃক কাবাঘর নির্মাণের ৪০ বছর পর হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম আল-আকসা মসজিদ নির্মাণ করেন। অতঃপর হযরত সুলায়মান আলাইহিস সালাম জ্বিনদের মাধ্যমে এই পবিত্র মসজিদের পুনর্নির্মাণ করেন। ৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দে হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে পুরো বায়তুল মুকাদ্দাস এলাকা মুসলমানদের অধীনে আসে।
১০৯৯ সালের ১৫ জুলাই খ্রিষ্টান ক্রুসেডাররা সমগ্র সিরিয়া ও ফিলিস্তিন দখল কওে নেয়। এরপর তারা ১০৯৯ সালের ৭ জুন বায়তুল মুকাদ্দাস অবরোধ করে এবং ১৫ জুলাই মসজিদের ভেতর প্রবেশ করে ব্যাপক পরিবর্তন করে একে গির্জায় পরিণত করে। ১১৬৯ সালের ২৩ মার্চ ফাতেমি খিলাফতের কেন্দ্রীয় খলিফার নির্দেশে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি গভর্নর ও সেনাপ্রধান হয়ে মিসরে আগমন করেন। এরপর ১১৮৭ সালের ২০ সেপ্টেম্বর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে এই মুসলিম বীর জেরুজালেম শহর মুসলমানদের অধিকারে নিয়ে আসেন। অতঃপর ১১৮৭ সালের ২ অক্টোবর শুক্রবার সালাহউদ্দিন আইয়ুবি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বায়তুল মুকাদ্দাসে প্রবেশ করেন।
মসজিদে আকসা একমাত্র মুসলমানদেরই : আল-আকসা মসজিদ নির্মাণের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হযরত আদম আলাইহিস সালাম, হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম, হযরত সুলায়মান আলাইহিস সালাম এর নাম। জড়িয়ে আছে প্রায় অর্ধ জাহানের মুসলিম শাসক হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর নাম এবং এরপর সুলতান সালাউদ্দিন আইয়ুবীসহ অসংখ্য বীরের নাম। উল্লেখিত কেউ ইহুদিদের পূর্বপুরুষ ছিলেন না। এমনকি হযরত সুলায়মান আলাইহিস সালামও ইহুদিদের সরাসরি নবী ছিলেন না। তাই ‘জেরুজালেম তাওরাত কিংবা ইহুদিদের ভূমি’ সংক্রান্ত ইসরাইলি দাবি সম্পূর্ণ অর্থহীন। বরং মুসলমানরাই সুলায়মান আলাইহিস সালাম-এর যথার্থ উত্তরাধিকারী। কেননা ইসলাম সকল নবীর উপর ঈমান আনার নির্দেশ দিয়েছে। তাছাড়া হযরত মুসা আলাইহিস সালাম -এর উপর তুর পাহাড়ে তাওরাত নাজিল হলেও তিনি ফিলিস্তিনে বাস করেননি এবং ইহুদিদের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে তা সম্ভবও হয়নি। এছাড়াও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে মেরাজে গমন করার কারণে তা চূড়ান্তভাবে ইসলামেরই পবিত্র স্থান ও পুণ্যভূমি হিসেবে পরিগণিত।
১৯৬৭ সালে অবৈধ রাষ্ট্র ইসরায়েল ‘মসজিদুল আকসা’ জবরদখল করে। ১৯৭৯ সাল থেকে ‘আল-আকসা’ মসজিদ মুক্তির লক্ষে সমগ্র মুসলিম উম্মাহ প্রতিবছর রমযান মাসের শেষ শুক্রবার ‘আল-কুদস’ দিবস পালন করে। তখন থেকে সারা বিশ্বে দিনটি ফিলিস্তিন মুক্তির ও বিশ্ব মুসলিম ঐক্যের প্রতীকরূপে পালিত হয়। আজ ফিলিস্তিন ইস্যু ও কুদস শরীফের ভাগ্য কেবলমাত্র একটি ফিলিস্তিনি এমনকি একটি আরবীয় ইস্যু নয়, এটি সমগ্র ইসলামি বিশ্বের ও সমস্ত মুসলমানের বিষয়। ইসলামি বিশ্বের সকল ক্ষমতা ও সুযোগ-সুবিধাকে একত্রিত করে ফিলিস্তিনে দখলদারিত্বের অবসান এবং ফিলিস্তিনিদের পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত করা আজ সময়ের দাবি।

লেখক : বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়, খতীব, মুসাফিরখানা জামে মসজিদ