মুক্তির রাত : মহাপুণ্যময়ী শবে-বরাত

4

মুহাম্মদ জাবেদ হোছাইন

পাঁচ রাতের এক রাত। শবেবরাত। ‘শব’ মানে রাত। আর ‘বরাত’ তথা ‘বারাআত’ মানে ভাগ্য, মুক্তি বা বণ্টন। তাই শবেবরাত মানে যেমনি ভাগ্যরজনী, তেমনি এটি মুক্তি ও বাজেট প্রণয়নের রাতও বটে। মহাবরকতময়ী এই রজনীর তাৎপর্য বর্ণনায় মহান আল্লাহ ঘোষণা করেন, ‘শপথ ঐ সুস্পষ্ট কিতাবের! নিশ্চয়ই আমি সেটাকে (কোরআন) বরকতময় রজনীতে অবতীর্ণ করেছি। নিশ্চয় আমি সতর্কবাণী শুনাই। তাতে প্রত্যেক হিকমতময় কাজ বণ্টিত হয়’ (সূরা দুখান, আয়াত: ২-৪)। অত্র আয়াতে ‘বরকতময় রজনী’ দ্বারা মহান আল্লাহ কোন রজনীকে বুঝিয়েছেনÑএমন প্রশ্নের জবাবে তাফসির, হাদিস ও বিজ্ঞ আলিমদের অভিমত হলো এটা ‘লাইলাতুল নিসফি মিন শাবান’ তথা শা’বানের মধ্য রজনী। আর সেই রাতটি হলো শা’বান মাসের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাত। যা মুসলিম বিশ্বে লাইলাতুল বরাত বা শবেবরাত হিসেবেই প্রসিদ্ধি লাভ করেছে।
মহামহিমান্বিত রজনী শবেবরাতের ফজিলত ও গুরুত্ব সম্পর্কে হাদিস শরিফের বিভিন্ন স্থানে বিশদ বর্ণনা রয়েছে। উম্মুল মু’মিনিন হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বর্ণনা করেন, শা’বানের মধ্যরজনীতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার চাদরের নিচে থেকে চুপিসারে বের হয়ে গেলেন… আমার ধারণা হলো তিনি অন্য কোনো স্ত্রীর হুজরায় তাশরিফ নিয়ে গেছেন। আমি উঠে তাঁকে হুজরায় তালাশ করলাম। তাঁর পা মোবারক স্পর্শ করলাম। তিনি তখন সিজদারত ছিলেন। সিজদায় তিনি যে দু’আ পাঠ করছিলেন তা আমি মুখস্থ করে ফেলেছি। দু’আটির অনুবাদ: ‘হে আল্লাহ! আমার দেহ ও হৃদয় তোমায় সিজদা করছে। আমার অন্তর তোমার প্রতি ইমান এনেছে। আমি তোমার অনুগ্রহরাজির কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আপন ত্রæটি-বিচ্যুতির কথা স্বীকার করছি। আমি আমার নফসের ওপর যুল্ম করেছি। তুমি আমাকে ক্ষমা করো। তুমি ব্যতীত অন্য কেউ পাপ মার্জনাকারী নেই। আমি তোমার শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য তোমারই আশ্রয়ে এসেছি। তোমার ক্রোধ থেকে রেহাই পেতে তোমার সন্তুষ্টিরই প্রার্থনা করছি। তোমার প্রশংসা-স্তুতিগান কেউ বর্ণনা করতে পারে না, তুমি নিজেই নিজের প্রশংসা করেছ। তুমি নিজেই নিজের যথাযথ প্রশংসা করতে পার, অন্য কেউ পারে না।’
মু’মিন-জননী হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, এভাবে ভোর পর্যন্ত নবীজি ইবাদতে মশগুল রইলেন। কখনো তিনি দাঁড়িয়ে, কখনো বসে বসে ইবাদত করেন। এমনকি তাঁর পা মোবারকে পানি এসে স্ফীত হয়ে গিয়েছিলো। আমি তাঁর পা মোবারক মালিশ করতে করতে আরজ করলাম, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার পিতা-মাতা আপনার ওপর উৎসর্গ হোন! আল্লাহ তা’আলা কি আপনাকে নিষ্পাপ করেননি? তিনি কি আপনাকে এমন এমন অনুগ্রহ করেননি?’ জবাবে নবীজি ফরমালেন, ‘হে আয়েশা! আমি কি আল্লাহর নি’মাতসমূহের কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী বান্দা হবো না? তুমি জানো কি এ রাতটা কেমন?’ আমি আরজ করলাম, ‘আপনিই বলুন এ রাতটি কেমন!’ তখন রাসূলুল্লাহ (দ.) ইরশাদ করলেন, ‘এই রাতে পুরো বছরে জন্মগ্রহণকারী প্রত্যেক শিশুর নাম লিপিবদ্ধ করা হয়। প্রতিটি মৃত্যুবরণকারীর নামও লিপিবদ্ধ করা হয়। এ রাতেই সৃষ্টির রিয্ক বণ্টন করা হয়। এ রাতে বান্দার আমলসমুহ তাদের রবের নিকট প্রেরিত হয়।’

মুক্তির রাত : উম্মুল মু’মিনিন হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (দ.) আমাকে এক রাতে বললেন, ‘হে আয়েশা! এটা কোন্ রাত?’ আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই এই সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত আছেন। তখন নবীজি ইরশাদ করলেন, ‘এটা শা’বানের মধ্যবর্তী রাত। এ রাতে দুনিয়ার আমলসমুহ ও বান্দাদের কর্মসমূহ আল্লাহর দরবারে উত্থিত হয় আর আল্লাহ তা’আলা এ রাতে ‘বনু কাল্ব’ গোত্রের সব মেষ-ছাগলের পশমের সমান সংখ্যক লোককে দোযখ থেকে মুক্তি দেন।’

বিশেষ পুরস্কার : রাসূল (দ.) ইরশাদ করেছেন, যখন শা’বান মাসের ১৫ তারিখ আসে তখন সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ তা’আলা দুনিয়ার আসমানে তাশরিফ আনেন এবং এই বলে আহবান করতে থাকেন: ‘তোমাদের মধ্যে কেউ কি ক্ষমাপ্রার্থী রয়েছে? আমি তাকে ক্ষমা করে দেবো। তোমাদের মধ্যে জীবিকা অন্বেষণকারী কেউ রয়েছে? আমি তাকে রিয্ক প্রদান করবো। তোমাদের মধ্যে বিপদগ্রস্ত কেউ রয়েছে? আমি তাকে বিপদমুক্ত করে দেবো।’ এভাবে আহŸান করতে করতে সূর্যোদয় হয়ে যায় (ইবনে মাজাহ)।
তিনটি রোজার ফজিলত : শা’বান মাসের ১৫ তারিখ অর্থাৎ শবেবরাতের রোজার অত্যন্ত ফজিলত রয়েছে। বর্ণিত আছে, কেউ এ রোজা রাখলে আল্লাহ তা’আলা ওই ব্যক্তির পঞ্চাশ বছরের গুনাহ মাফ করে দেবেন। হাদিস শরিফে এসেছে, যে ব্যক্তি এ মাসে তিনটি রোজা (শা’বানের ১৩, ১৪, এবং ১৫ তারিখ) রাখবে এবং প্রতিদিন ইফতারের সময় তিনবার দরূদ শরিফ পাঠ করবে, আল্লাহ তার জীবনের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেবেন এবং রিয্ক বৃদ্ধি করে দেবেন। হাদিস শরিফে আরো বর্ণিত হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি শা’বান মাসে তিনটি রোজা রাখবে, আল্লাহ তাকে কঠিন কিয়ামত দিবসে বেহেশতের উষ্ট্রীর ওপর সওয়ার করে হাশর করাবেন।’ সুবহানাল্লাহ!

এ রাতের আরো কিছু বিশেষ আমল : পুণ্যময় এ রাতের ফজিলত ও বরকতের দিকে লক্ষ করলে বোঝা যাবে যে মহান এ রাতের সবটুকই বরকতময়। তাই এমন একটি রাত আল্লাহর ইবাদতে কাটিয়ে দিতে পারাটাই প্রকৃত সৌভাগ্যের বিষয়।
কোরআন তিলাওয়াত : এ রাতে বেশি বেশি পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত বিশেষ করে কোরআন মাজিদের বিশেষ বিশেষ সূরা যেমন ইয়াসিন, আর-রাহমান, মুল্ক, আয়াতুল কুরসি এবং সূরা বাকারার শেষ দুটি আয়াত তিলাওয়াতের খুবই ফজিলত রয়েছে।

কবর জিয়ারত : হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, মহানবী (দ.) এই রাতে মদিনা শরিফের বিখ্যাত কবরস্থান জান্নাতুল বাকীতে গিয়ে কবর জিয়ারত করতেন এবং কবরবাসীদের জন্য দু’আ করতেন। তাই কবর জিয়ারত শবেবরাতের একটি পুণ্যময় আমল।
দশ রাকআত নামায : মহানবী (দ.) ইরশাদ করেন, ‘আমার সৌভাগ্যবান উম্মতের মধ্যে যে এ রাতে দশ রাকআত নামায এই নিয়মে আদায় করবে, প্রত্যেক রাকআতে সূরা ফাতিহার পর এগারো বার করে সূরা ইখলাস পাঠের মাধ্যমে, তাহলে তার গুনাহ ক্ষমা করা হবে এবং তার আয়ুতে বরকত নসিব হবে।’

আট রাকআত নামায : এ রাতে দুই রাকআতের নিয়্যতে আট রাকআত নফল নামায এই নিয়মে পড়তে হবে যে প্রত্যেক রাকআতে সূরা ফাতিহার পর সূরা ক্বাদর একবার ও সূরা ইখলাস পঁচিশবার করে পাঠ করবেন। এই নামায আদায়কারীর পাপসমূহ আল্লাহপাক ক্ষমা করে দেন।

কবরের আযাব থেকে মুক্তির নামায : এ জন্য চার রাকআত নিয়্যতে আট রাকআত নামায আদায় করতে হবে। প্রত্যেক রাকআতে সূরা ফাতিহার পর দশবার করে সূরা ইখলাস পাঠ করবেন। মহান আল্লাহ এই নামায আদায়কারীদের জন্য অসংখ্য ফিরিশতা নিয়োজিত করে দেন যাঁরা তাদের কবরের আযাব থেকে পরিত্রাণ দিয়ে বেহেশতে প্রবেশের শুভসংবাদ প্রদান করেন।

ওয়াজিফা : শা’বান মাসে দৈনিক নামাযের পর নিম্নোক্ত দু’আটি পাঠ করা গুনাহ মাফের জন্য খুবই উত্তমÑ ‘আস্তাগফিরুল্লাহাল আজীম আল্লাজী লা-ইলাহা ইল্লা হুয়াল হাইয়্যুল ক্বাইয়্যূমু ওয়া আতূবু ইলাইহি।’
মহানবী (দ.) ইরশাদ করেন, ‘শা’বান মাসে যে কেউ তিন হাজারবার দরূদ শরিফ পাঠ করে আমার ওপর বখশিশ করবে, কঠিন হাশরের দিন তাকে শাফআত করা আমার ওপর ওয়াজিব হয়ে যাবে।’

এমন রাতেও হতভাগ্য যারা! : শবেবরাত এমন একটি রাত যে রাতে আল্লাহর কাছে দু’আ করলে তা তিনি কবুল করেন এবং কারো পাপ পাহাড় সমান হলেও আল্লাহ তা মাফ করে দেন। তবে সাত কিসিমের লোকের জন্য এ রাতেও কোনো ক্ষমা নেই! ১. যাদুকর; ২. নিত্য মদ্যপানকারী; ৩. ব্যভিচারে অভ্যস্ত ব্যক্তি; ৪.

আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী; ৫. পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান; ৬. চুগলখোর এবং ৭. ঐ কৃপণ যে শত্রুতাবশে তার মুসলিম ভাইয়ের সঙ্গে তিন দিন পর্যন্ত কথা বলা বন্ধ রেখেছে। বছর ঘুরে এ মহিমান্বিত রজনী বিশ্ব মুসলিমের নিকট আসে আল্লাহর অফুরন্ত ক্ষমা, পরিত্রাণ ও রহমতের বারতা নিয়ে। তাই হেলায় ও খেলায় না কাটিয়ে মহাপুণ্যময়ী এ রাতটি আল্লাহপাকের দরবারে কায়মনোবাক্যে তওবা-ইসতিগফারের মাধ্যমে ইবাদত-বন্দেগীতে কাটিয়ে দেওয়াই হবে প্রকৃত বুদ্ধিমান ইমানদারের কাজ।
লেখক : প্রাবন্ধিক