মুক্তির গল্প

14

 

“উনিশশো একাত্তর সাল। সারাদেশে চলছে যুদ্ধ। তখন একদল মুক্তিযোদ্ধা এসে আশ্রয় নেয় আমাদের গ্রামে। তাঁরা যে বাড়ি এসে ওঠে সেটা ছিল একটা মাটির ঘর। একটা নিরিবিলি বাড়ি। পরের দিন সকালে গ্রামের পাশের পথ দিয়ে পাকসেনাদের অন্য এলাকায় যাওয়ার কথা। তাদের আক্রমণ করার সকল প্রস্তুতি নিয়ে শুয়ে পড়ে মুক্তিযোদ্ধারা।

গভীর রাতে এই গ্রামের হেলালুদ্দিন গোপনে পাকসেনাদের নিয়ে এসে হাজির হয় গ্রামে। সে মুক্তিবাহিনীরা যে ঘরে শুয়ে ছিল সেই ঘরটা দেখিয়ে দেয়। পাকসেনারা ঘিরে ফেলে মুক্তিবাহিনীর আশ্রয় নেওয়া বাড়িটা। গুড়ুম গুড়ুম গুলির শব্দে থরথর করে কেঁপে উঠে গ্রাম। কিন্তু একটি মুক্তিযোদ্ধাও তারা মারতে পারেনি সেদিন। কারণ, রাতে পাকসেনাদের সাথে হেলালুদ্দিনকে গ্রামের দিকে যেতে দেখে ফেলে মুদীর দোকানদার মঞ্জু ভূঁইয়া। তিনি এক দৌড়ে এসে আগেই খবরটা পৌঁছে দিয়েছিল মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে। মুক্তিযোদ্ধারা সাথে সাথে এ বাড়ি থেকে অন্য জায়গায় সরে গিয়েছিল।

গুলিতে বাড়িটা ঝাঁঝরা হয়ে যায়। পাকসেনারা বাড়িতে কাউকে না পেয়ে আগুন লাগিয়ে বাড়িটা পুড়ে ছাই করে ফেলে। পরে হেলালুদ্দিনের নেতৃত্বে পাকসেনারা গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে শুরু করে অত্যাচার আর জ্বালাও-পোড়াও। হেলালুদ্দিন পাকসেনাদের আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় কাকে ধরবে, কাকে মারবে আর কার করবে সর্বনাশ। সেনারা হেলালুদ্দিনকে সঙ্গে নিয়ে সেই রাতে সারাগ্রামে অত্যাচার ও লুটপাট করে। তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে গ্রামের নিরীহ মানুষের ওপর। গোটা গ্রাম তছনছ করে তারা হেলালুদ্দিনের বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া করে চলে যায়।

তখন ভোর রাত। পাকসেনাদের যাওয়ার পথে ‘খালপাড়’ নামক স্থানে মুক্তিবাহিনী তাদের আক্রমণ করে। শুরু হয় মরণপণ লড়াই। প্রচন্ড গোলাগুলি। এ লড়াইয়ে নিহত হয় দুই পাকসৈন্য আর দুই জনকে ধরে ফেলে এলাকার লোকেরা। বাকিরা কোনোমতে দৌড়ে পালিয়ে বাঁচে। গোলাগুলিতে গ্রামের এক মায়ের একমাত্র ছেলে কিশোর আলাউদ্দিন শহীদ হন। একজন মুক্তিযোদ্ধা তলপেটে ও হাঁটুতে গুলি খেয়ে আহত হন। তাঁর নাম জাহাঙ্গীর। এই গ্রামেই তাঁর বাড়ি। সেদিন পাওয়া যায়নি হেলালুদ্দিনকে।”

উনিশশো একাত্তর সালের এই ভয়ংকর ঘটনার কথা বলতে বলতে দাদি ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠেন।
তিনি বলেন, “আজ তোমরা যাঁকে ‘গল্পচাচা’ বলে চেনো, তিনিই সেদিন তলপেটে আর হাঁটুতে গুলি খেয়ে আহত হয়েছিলেন। পরে তাঁর একটি পা কেটে ফেলে দিতে হয়। তখন তিনি ছিলেন ষোলো বছরের টগবগে তরুণ। আজ তাঁর এত বয়স হলো তিনি বিয়ে-শাদী করেননি। সারাদিন ঘুরে ঘুরে মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলে বেড়ান।”

হ্যাঁ, গল্পচাচা। আমাদের এলাকায় সবচেয়ে প্রিয় একজন মুক্তিযোদ্ধার নাম। আমি এখন পড়ি দশম শ্রেণীতে। অথচ “উনিশশো একাত্তর সাল সালে ঘটে যাওয়া মুক্তিযুদ্ধের অনেক কাহিনি আমি হরহর করে বলতে পারব। শুধু আমি নই, আমাদের এলাকার শুধু শিশুরাই নয়, প্রায় সবাই মুক্তিযুদ্ধের বহু ঘটনার কথা পটাপট বলে ফেলতে পারবে। কারণ গল্পচাচা মুক্তিযুদ্ধে পঙ্গু হয়েছেন, তাতে কী! তিনি মুক্তিযুদ্ধের পরও আজীবন চালিয়ে গেছেন মুক্তিযুদ্ধ। তিনি ক্রাচে ভর দিয়ে হাঁটতেন। আর বিভিন্ন স্কুলে, মাদ্রাসায় গিয়ে সবাইকে ডেকে ডেকে গোল করে বসাতেন। তারপর তিনি মুক্তিযুদ্ধের কাহিনি বলতেন। এমন করে বলতেন যে, মনে হতো আমাদের চোখের সামনে মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে।

গল্পচাচার কোনো চাকরি বা কাজ ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলাই ছিল তাঁর একমাত্র কাজ। তিনি যেখানে যেতেন, ছেলে-মেয়ে বুড়ো তাঁর কথা শোনার জন্য ভিড় করতো। অনেক মজা করে গল্প বলতে পারতেন তিনি। গল্পচাচাকে সবাই আদর করে খাওয়াতেন আর গল্প শুনে সবাই দিত উপহার। খুব চলে যেতো গল্পচাচার।

গল্পচাচা হঠাৎ করে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। সারা এলাকার শিশু থেকে বৃদ্ধ আর নারীরা কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে কবর দেয়া হলো নিজ গ্রামে। হাজার হাজার মানুষ গল্পচাচার জন্য দোয়া করেন। এলাকার সকল শিশুর ভেতরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগিয়ে দিয়ে গেছেন আমাদের সকলের প্রিয় গল্পচাচা।