মীর শওকত আলী (১৯৩৮-২০১০)

108

সামরিক কর্মকর্তা, মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর কমান্ডার, রাজনীতিক। ১৯৩৮ সালের ১১ জানুয়ারি ঢাকায় তাঁর জন্ম। মীর শওকত আলী প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন ঢাকার মাহুতটুলি ফ্রি প্রাইমারি স্কুলে। তিনি ১৯৫৩ সালে আরমানিটোলা সরকারি হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯৫৫ সালে ঢাকা কলেজ থেকে আইএসসি পাস করেন। এরপর তিনি পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন। মীর শওকত আলী ১৯৫৮ সালে বিএসসি ডিগ্রি এবং আর্মিতে কমিশন লাভ করেন। ১৯৫৫ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন রেজিমেন্টে অ্যাডজুট্যান্ট, কোয়ার্টার মাস্টার, কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে এবং সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীতে কাজ করেন। ১৯৬৫ সালে তিনি রংপুর সীমান্তে পাক-ভারত যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। শওকত আলী ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের কোয়েটা স্টাফ কলেজ থেকে পিএসসি ডিগ্রি লাভ করেন এবং চট্টগ্রামের ষোলোশহরে ৮-ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দেন।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মীর শওকত আলী ইউনিটের সঙ্গে চট্টগ্রামে অবস্থানরত ছিলেন। ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় পাক বাহিনীর বর্বরোচিত হত্যাকান্ডের সংবাদ পেয়ে তিনি ৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সঙ্গে বিদ্রোহ করেন এবং রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ৩০ মার্চের পর তিনি পুরো বাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। এপ্রিলের প্রথমদিকে তিনি কালুরঘাটের যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন এবং আর্মি, বিডিআর, ছাত্র-জনতা এবং আওয়ামী লীগের স্বেচ্ছাসেবক দল নিয়ে গঠিত বাহিনীসহ ২ মে পর্যন্ত রেজিমেন্টের প্রধান হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যান। কালুরঘাট প্রতিরক্ষা অবস্থানের পতনের পর তিনি তাঁর অধীনস্ত সৈন্যদের নিয়ে বান্দরবনে পৌঁছেন। পরে মহালছড়িতে তাঁর সদর দপ্তর স্থাপন করে প্রতিরক্ষা অবস্থান গড়ে তোলেন। প্রবল হামলার মুখে তিনি রামগড় অতিক্রম করে সীমান্তের ওপারে চলে যান। পরে তিনি ছাতক ও সুনামগঞ্জ এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। মুজিবনগরে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠনের পর মীর শওকত আলী ৫নং সেক্টরের অধিনায়ক নিযুক্ত হন। তাঁর সেক্টরের বিস্তৃতি ছিল সিলেট জেলার ডাউকা (তামাবিল) থেকে ময়মনসিংহের সীমান্ত পর্যন্ত। প্রথমে ৪০০ মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে যুদ্ধ শুরু করে তিনি ১২ হাজার মুক্তিযোদ্ধার বিশাল বাহিনী গড়ে তোলেন। ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহে মীর শওকত আলী লে. কর্নেল পদে উন্নীত হন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পুনর্গঠনে মীর শওকত আলীর সক্রিয় ভূমিকা ছিল। তিনি ১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামে ইনফ্যান্ট্রি ব্রিগেড গঠন করে এর ব্রিগেড কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৫ সালে তিনি অন্যান্য ব্রিগেডের কমান্ডার ছিলেন। তিনি ১৯৭৪ সালে কায়রোতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সফরে নেতৃত্ব দেন। ১৯৭৫ সালে মীর শওকত সেনাবাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ নিযুক্ত হন। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭ সালে তিনি পুরনো ঢাকা উন্নয়ন কমিটির চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। একই সময়ে তিনি ঢাকা অঞ্চলের সামরিক প্রশাসকের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৮০-১৯৮১ সালে তিনি সেনাবাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার ছিলেন। মীর শওকত আলী ১৯৮১ সালের ৯ জুন লেফটেন্যান্ট জেনারেল হিসেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রদূত হিসেবে মিশর, সুদান, জার্মানী, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও পর্তুগালে কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করেন।
মীর শওকত আলী স্বৈরাচারী শাসনের প্রতিবাদে ১৯৮৮ সালে রাষ্ট্রদূতের পদ থেকে অবসর নেন। পরে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) যোগ দেন এবং ঢাকা মহানগর শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে তিনি ঢাকার লালবাগ আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সালে তিনি প্রথমে খাদ্যমন্ত্রী এবং পরে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি ছিলেন।
২০০৭ সালের পর থেকে মীর শওকত আলী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে গঠিত সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের ভাইস চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ সালে তিনি রাজনীতি থেকে স্বেচ্ছা অবসরগ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর বীরত্ব ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করে।
এছাড়া ক্রীড়া ও কৃষি খাতে অবদান রাখার জন্য দু’বার তিনি রাষ্ট্রপতি পদকে ভূষিত হন। মীর শওকত আলীর তিন খন্ডের আত্মজীবনীগ্রন্থ ঞযব ঊারফবহপব ২০০৮ সালে প্রকাশিত হয়। ২০১০ সালের ২০ নভেম্বর ঢাকায় তাঁর মৃত্যু হয়।