মিয়ানমার সেনাপ্রধানের বক্তব্য আশাব্যাঞ্জক কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত থাক

21

মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থান, জরুরি অবস্থা ও সুচিসহ শীর্ষ নেতাদের আটকের ঘটনায় দেশটির জনগণের মনে ভর করেছে সেই পুরনো আতঙ্ক। দিন কাটছে উৎকণ্ঠা আর সংশয় নিয়ে। এদিকে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে দীর্ঘদিন পর যখন চীনের মধ্যস্ততায় একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ শুরু হয়েছে তখন মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থান আমাদেরও ভাবিয়ে তুলেছে। কারণ রোহিঙ্গাদের তাদের দেশ থেকে বিতাড়নের সাথে দেশটির সেনা বাহিনীর সরাসরি হস্তক্ষেপ রয়েছে-এমন অভিযোগ ইতোমধ্যে প্রমাণিত। সুতরাং ক্ষমতা যখন পরিপূর্ণভাবে সেনাবাহিনীর হাতে তখন রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার যে উদ্যোগ তা কতটুকু সফল হবে- এনিয়ে চলছে বিস্তর আলোচনা। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এ আলোচনা যখন তুঙ্গে তখন মিয়ানমারের সামরিক প্রশাসক রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে তাদের বক্তব্য স্পষ্ট করেছে।
আপাতত চুলছেরা বিশ্লেষণে না গিয়েই বলা যায়, সেনা শাসকের বক্তব্য আমাদের আশাবাদী করেছে; রোহিঙ্গাদেরও স্বদেশে ফেরত যেতে অনুপ্রাণিত করবে আশা করা যায়। গত সোমবার সামরিক প্রধানের ক্ষমতা দখলের আট দিন পর প্রথম টেলিভিশন ভাষণে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ভিত্তিতে বাংলাদেশ থেকে ‘বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের’ ফিরিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রæতি দিয়েছেন মিয়ানমারের সামরিক শাসক মিন অং হ্লাইং। খবরে প্রকাশ অতীতের মতোই ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহার করেননি জান্তা প্রধান। তার এভাষণটি মূলত নির্বাচিত সরকারকে উচ্ছেদের ও সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলের পক্ষে কারণ ব্যাখ্যা করাই প্রধান উদ্দ্যেশ্য বলে মনে হয়েছে। এসময় সেনা প্রধান নাগরিকদের প্রতি সেনা অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে আন্দোলনের নামে ‘আবেগের বশবর্তী না হয়ে সত্য তথ্য-উপাত্ত দেখার আহবান’ জানান। তিনি আরো বলেছেন, তার শাসনামল ২০১১ সাল পর্যন্ত চলা ৪৯ বছরের সামরিক নিয়ন্ত্রণের মতো হবে না। ‘সত্যিকারের এবং নিয়মতান্ত্রিক গণতন্ত্র’ অর্জনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন মিন অং হ্লাইং।
আমরা লক্ষ্য করেছি, সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখলের পর নড়েচড়ে বসেছে আন্তর্জাতিক স¤প্রদায়। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘ অং সান সু চির মুক্তি ও নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে চাপ দিচ্ছে। একই সঙ্গে রাখাইনে থাকা রোহিঙ্গা এবং বাংলাদেশে শরণার্থী রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের ভবিষ্যৎ নিয়ে জাতিসংঘ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সামরিক অভ্যুত্থানের কারণে প্রত্যাবাসন আলোচনার অগ্রগতি অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করেছে। ওই সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন সাংবাদিকদের এ বলে আশা ব্যক্ত করেছিলেন ‘মিয়ানমারের সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে’। আমরাও চাই কোনোভাবেই যেন রোহিঙ্গা ফেরতের বিষয় ঝুলে না যায় সেদিকে নজর রাখতে হবে। দেশটির সেনা প্রধানের সোমবারের বক্তব্য থেকে আশাবাদী করে তুলেছে।
জানা যায়, গত নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে সু চির দল এনএলডি ফের বড় ব্যবধানে জয় পায়। পার্লামেন্টের ৪৭৬টি আসনের মধ্যে সেনা সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি এন্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি পায় মাত্র ৩৩টি আসন। নির্বাচনের ফল ঘিরে সংকট ঘনীভ‚ত হয়। সেনাবাহিনী ও ইউনিয়ন সলিডারিটি এন্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি নির্বাচনের পর থেকেই ভোটে তথ্য ছাড়া কারচুপির অভিযোগ তুলে আসছে। এ নিয়ে সু চির সঙ্গে সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের মতবিরোধ তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত বেসামরিক সরকার ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে উত্তেজনা বাড়ার পর এই অভ্যুত্থান ঘটল। এতে করে অর্ধশতাব্দীর সেনাশাসনে ত্যক্ত-বিরক্ত মিয়ানমারবাসী গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের যে স্বপ্ন দেখেছিল তা বিনষ্ট হয়ে গেল। দীর্ঘ পাঁচ দশক সেনাশাসনে চলার পর ২০১১ সালে নামমাত্র গণতন্ত্র এসেছিল। বেসামরিক সরকার লেবাসের আড়ালে প্রকৃত ক্ষমতা ছিল সেনাবাহিনীরই হাতে। এ সময়ের মধ্যে রোহিঙ্গা গণহত্যার ঘটনাও ঘটেছে। ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে এসেছে বাংলাদেশে। প্রত্যাবাসনের অপেক্ষায় থাকা রোহিঙ্গারা এখন মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে।
জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক বলেছেন, মিয়ানমারের ভেতর রাখাইনে ছয় লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা বিভিন্ন শিবিরে মানবেতর জীবনযাপন করছে। তারা আশঙ্কা করছেন, মিয়ানমার সেনাবাহিনী তাদের ওপর আরো অত্যাচার-নির্যাতন চালাতে পারে। তাদের পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের ফেরাও বিলম্বিত হতে পারে। আমরা মনে করি, মিয়ানমারের ক্ষমতায় যারাই থাকুক না কেন, তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যেতে হবে। ক্ষমতায় সু কি আছে নাকি মিলিটারি, সেটার চেয়ে জরুরি হলো কারা এই আলোচনা এগিয়ে নিতে চায়। আমাদের উচিত হবে ক‚টনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাওয়া এবং সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখা।