মিয়ানমার সীমান্তে অস্থিরতায় চোরাচালানিদের পোয়াবারো!

28

তুষার দেব

মিয়ানমার সীমান্তে দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি চোরাকারবারি চক্রের জন্য পোয়াবারো হয়েছে। কক্সবাজারের টেকনাফ-উখিয়া হয়ে নাইক্ষ্যংছড়ির তুমব্রু সীমান্তের শূন্যরেখা থেকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সাথে সেদেশের সেনাবাহিনীর বিরামহীন গোলাগুলিতে বৈধ পথে বাণিজ্য কমেছে। কিন্তু সীমান্ত দিয়ে চোরাপথে অবাধে মাদক ও ‘বার্মিজ’ স্বর্ণের বারসহ বিভিন্ন পণ্যের পাচার থেমে নেই। সীমান্ত পেরিয়ে দেশে ঢুকছে বার্মিজ গরুও। অস্থিতিশীলতাকে পণ্য পাচারের জন্য বাড়তি সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাচ্ছে চোরাচালানি চক্র।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যেও সীমান্তে থেমে নেই চোরাকারবার। সীমান্তের জল ও স্থলপথ ব্যবহার করে আইন-প্রয়োগকারী সংস্থার চোখ ফাঁকি দিয়ে চোরাকারবারি চক্র মাদক ক্রিস্টাল মেথ বা আইস, ইয়াবা ও বার্মিজ স্বর্ণের বারসহ অন্যান্য অবৈধ পণ্য নিয়মিতই মিয়ানমার থেকে দেশে নিয়ে আসছে। এসব অবৈধ পণ্য পাচারের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে সীমান্তের শুন্য রেখায় থাকা রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো। মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও বিজিপির সহযোগিতায় রোহিঙ্গাদের একটি অংশ রাতে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে মিয়ানমারে ঢুকে এসব পণ্য নিয়ে আসে। পরে দিনের বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রাক্ষাকারী বাহিনীর অগোচরে দেশে অভ্যন্তরে পাচার করছে। শূন্য রেখার রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ৯০ শতাংশের বাড়ি-ঘরে মিয়ানমার থেকে পাচার হয়ে আসা আইস, ইয়াবা, দামি সিগারেট ও স্বর্ণের বারসহ নানা চোরাই পণ্য থাকে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ১৫ পয়েন্ট দিয়ে ঢুকছে মাদক। এর মধ্যে দশটি কক্সবাজার এবং পাঁচটি বান্দরবান সীমান্তে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির মধ্যে সংঘাত শুরুর পর গত দেড় মাসে নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের ফুলতলী, লম্বাশিয়া, ভাল্লুকখাইয়া, চাকঢালা ও দৌছড়ি পয়েন্টে চোরাপথে প্রতিদিন দেশে প্রবশ করছে গরু-মহিষ এবং বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য। এসব অবৈধ পণ্যের চালান নিয়ন্ত্রণ করছে বিভিন্ন চোরাকারবারি চক্র।
বান্দরবানের আলীকদমের ৫৭ বিজিবি ব্যাটালিয়নের সদস্যরা গত ১৭ সেপ্টেম্বর পোয়ামুহুরী সীমান্ত এলাকা থেকে ১৭টি গরু আটক করে। এরপর ১৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় আলীকদমের কানা মেম্বার ঘাট থেকে ২২টি ট্রাকে করে নেয়ার সময় জব্দ করা হয় একশ’ ১৮টি গরু-মহিষ। এছাড়া গত ২৯ সেপ্টেম্বর নাইক্ষ্যংছড়ি ১১ বিজিবির সদস্যরা ২৪টি মহিষের একটি পাল জব্দ করে। সব মিলিয়ে সীমান্তে অস্থিরতার গত দেড় মাসে একশ’ ৮৪টি গরু-মহিষ জব্দের তথ্য পাওয়া গেছে। গত ২২ সেপ্টেম্বর বিকেলে উপজেলা প্রশাসন ও বিজিবির উদ্যোগে একশ’ ১৬টি গরু-মহিষ নিলামে ৮৭ লাখ ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়। এখনও প্রতিদিন সীমান্ত দিয়ে ১৫-২০টির মতো গরু-মহিষ এবং নানা ধরনের মাদকদ্রব্য দেশে আসছে।
একইভাবে কক্সবাজারের টেকনাফ-উখিয়া সীমান্তের নাফনদীসহ বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে নিয়মিতভাবেই মাদক ও স্বর্ণের চালান দেশে ঢুকছে। এর মধ্যে গত ২০ সেপ্টেম্বর ভোর চারটার দিকে বিজিবি সদস্যরা উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়নের তুলাতলী বেতবুনিয়া এলাকা থেকে এক লাখ ইয়াবাসহ তিন মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তার হওয়া তিনজনই মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিক।
তারা হলেন উখিয়ার কুতুপালং আশ্রয়শিবিরের বাসিন্দা মো. আবদুস সালামের ছেলে মো. আলী হোসেন (৩৪), শহিদুল্লাহর ছেলে মো. ইউনুস (৩৭) ও মো. হাসু মিয়ার ছেলে হোসেন আহম্মেদ (২৫)।
এর আগের দিন অর্থাৎ গত ১৯ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপ সংলগ্ন সমুদ্র এলাকায় কোস্টগার্ডের একটি টহল দল অভিযান চালিয়ে ৪২ হাজার ইয়াবা জব্দ করে। এরপর গত ২৪ সেপ্টেম্বর দিবাগত গভীর রাতে টেকনাফ সদর ইউনিয়নের বরইতলীতে কোস্টগার্ড ও শুল্ক গোয়েন্দাদের যৌথ দল অভিযান চালিয়ে ৩০ কেজি বার্মিজ গুড়ের মধ্যে অভিনব কায়দায় লুকিয়ে রাখা মোট দুই কেজি একশ’ ৫৯ দশমিক ৪৩ গ্রাম ওজনের ১৩টি ‘বার্মিজ’ স্বর্ণের বার জব্দ করে। জব্দকৃত স্বর্ণের আনুমানিক বাজারমূল্য এক কোটি ৫২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। এর পরদিন গত ২৫ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত দু’টার দিকে উখিয়ায় দুই লাখ ৩৮ হাজার ইয়াবার বিশাল চালানসহ ‘ইয়াবা সম্রাট’ নামে খ্যাত আলমগীর ও তার দুই সহযোগীকে আটক করে র‌্যাব-৭। তারও দু’দিন পর গত ২৭ সেপ্টেম্বর উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের বালুখালীর কাঁকড়া ব্রিজ এলাকায় অভিযান চালিয়ে র‌্যাব এক লাখ ইয়াবাসহ দুই মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করে। এ ধরনের উপর্যুপরি চোরাই পণ্য ও মাদক জব্দের ঘটনা সীমান্ত দিয়ে চোরাকারবারিদের রমরমা তৎপরতার দিকেই ইঙ্গিত করে।
সীমান্তে অস্থিতিশীল অবস্থার মধ্যেও চোরাকারবারি চক্রের অপতৎপরতা সম্পর্কে জানতে চাইলে বিজিবি ৩৪ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক কর্নেল মেহেদি হাসান কবির পূর্বদেশকে বলেন, মিয়ানমারের ভেতরে চলমান সংঘাতকে নিজেদের অনুকূলে কাজে লাগাতে একদল চোরাকারবারি সক্রিয় হয়ে উঠেছে। অস্থিরতার মধ্যেও প্রায় প্রতিদিন সীমান্তে গরু-মহিষ, মাদক ও স্বর্ণের বারসহ বিভিন্ন চোরাই পণ্যের চালান জব্দ হচ্ছে। যে কোনও পরিস্থিতিতে দেশের সীমান্ত ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য বিজিবি সদা প্রস্তুত। সীমান্ত এলাকায় সব ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এবং চোরাচালান রোধে বিজিবি সবসময় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও মিয়ানমারে নিযুক্ত সাবেক রাষ্ট্রদূত মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম বলেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে জান্ত সরকারের সঙ্গে তাদের সশস্ত্র গ্রুপগুলোর যে সংঘাত চলছে তার নেপথ্যের অন্যতম কারণ হলো, সীমান্ত ঘিরে অবৈধ কারবারের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেয়া। একথা তো মোটেই মিথ্যা নয় যে, ইয়াবা ও আইসসহ নানা ধরনের চোরাই পণ্য সীমান্তপথে পাচার হয়ে থাকে। সেখানে তৎপর সশস্ত্র গ্রæপগুলো এসবের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়। আবার জান্তা সরকারও সীমান্তের কারবার থেকে দূরে থাকতে চায় না। তাই সীমান্তে উত্তেজনা ও কড়াকড়ির মধ্যেও চোরাকারবারিরা সক্রিয় রয়েছে।