মিরসরাই শিল্পনগরে ৩০ লাখ মানুষের ভাগ্য বদলে যাবে

38

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিষয়ক মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম বলেছেন, চট্টগ্রামের উন্নয়ন হলে বাংলাদেশের উন্নয়ন হবে। চট্টগ্রামের উন্নয়নের জন্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে আন্তরিক। কিভাবে চট্টগ্রামের আরও উন্নয়ন করা যায়, তা নিয়ে সকলের কাজ করা উচিত। দেশের উন্নয়নের স্বার্থেই চট্টগ্রামের উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এক্ষেত্রে যোগাযোগ ব্যবস্থা, লজিস্টিক ও অন্যান্য সুবিধাসমূহ কাজে লাগাতে হবে। পরিবেশের ভারসাম্য বিবেচনা করে উন্নয়ন যাতে বাধাগ্রস্ত না হয় সেদিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে।
গতকাল শনিবার সকালে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারস্থ বঙ্গবন্ধু কনফারেন্স হলে চিটাগাং চেম্বারের উদ্যোগে আয়োজিত ‘চট্টগ্রামের উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, মিরসরাই শিল্পনগরে প্রায় ৩০ লাখ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে। কক্সবাজার থেকে কর্ণফুলী টানেল হয়ে মিরসরাই পর্যন্ত মেরিন ড্রাইভ নির্মাণ করা হলে তা পর্যটনসহ লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। সভায় উত্থাপিত প্রস্তাবনাসমূহ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করা হবে।
তিনি বলেন, বিভিন্ন সমীক্ষা থেকে জানা গেছে, হালদা নদী থেকে পানি নিয়ে মিরসরাই অঞ্চলে সরবরাহ করা হলে প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। বৃষ্টি ও কাপ্তাই হ্রদ হতে নেমে আসা পানি সরাসরি সাগরে চলে যায়। এই পানি সংগ্রহ করে শিল্পায়নে ব্যবহার করা হলে তা মিরসরাই বঙ্গবন্ধু শিল্প নগরে ১২০ কোটি লিটার পানির চাহিদা পূরণে সহায়ক হবে। বিভিন্ন বিকল্প উৎস হতে পর্যাপ্ত পানি সংরক্ষণের জন্য ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট করা হবে। এক্ষেত্রে হালদার পরিবেশ অক্ষুন্ন রেখে পানি সংগ্রহ করার কথা জানান মন্ত্রী।
চিটাগাং চেম্বার প্রেসিডেন্ট মাহবুবুল আলম সভাপতির বক্তব্যে বলেন, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এবং অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়ন সাপেক্ষে চট্টগ্রাম এশিয়ার ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু এবং বিনিয়োগের আদর্শ গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে। এক্ষেত্রে চট্টগ্রাম জাপানের বিগ-বি ইনিশিয়েটিভ (বে অব বেঙ্গল গ্রোথ ট্রায়াঙ্গেল)’র একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বিধায় এর উন্নয়নের জন্য স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদী অর্থাৎ আগামী ২০ বছরের একটি ভিশন প্ল্যান তৈরি করা এবং সেটি বাস্তবায়নের জন্য একটি স্পেশাল টাস্কফোর্স গঠন করে কার্যকর বাস্তবায়ন দাবি করেন।
চেম্বার সভাপতি চট্টগ্রামের অপার সম্ভাবনার প্রসঙ্গে বছরের পর বছর কিছু জটিলতা রয়েছে জানিয়ে তা সমাধানের উপর জোর দেন এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে স্ব-স্ব অবস্থান থেকে আন্তরিক ও সহায়ক ভূমিকা পালনের আহŸান জানান। তিনি চট্টগ্রামকে স্মার্ট সিটি বাস্তবায়নে বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, অনতিবিলম্বে বে-টার্মিনাল নির্মাণ, পানি সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন, কর্ণফুলী নদীর ড্রেজিং, চট্টগ্রাম ব্যবসায়ী ও নাগরিকদের সুরক্ষা এবং কার্যক্ষেত্রের সক্ষমতা নিশ্চিত করা এবং বিভিন্ন প্রকল্পগুলো যথাযথ তদারকির উপরও গুরুত্বারোপ করেন।
বিশেষ অতিথি এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রথম টানেল কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মাণ করা হচ্ছে। মিরসরাই শিল্পাঞ্চলসহ চট্টগ্রামের বাইরেও শিল্পের প্রসার ঘটছে। পদ্মা সেতু নির্মাণ শেষ হলে মাদারীপুর-ফরিদপুরসহ ঐ অঞ্চলে শিল্প সম্প্রসারণ হবে। কুমিরা নৌবন্দর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মেরিন ড্রাইভকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ হবে। হালদা নদী থেকে পরিবেশ অক্ষুন্ন রেখে কিভাবে শিল্পের জন্য পানি সংরক্ষণ করা যায় সে ব্যাপারে কাজ করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
বিশেষ অতিথি পবন চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রামের উন্নয়নে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। মিরসরাই শিল্পনগর, সীতাকুন্ড, ফেনী, নোয়াখালী শিল্পাঞ্চলের পাশাপাশি স›দ্বীপেও ১৩ হাজার একরজুড়ে শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা হবে, যা পর্যায়ক্রমে লাকসাম-কুমিল্লা পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। বঙ্গবন্ধু শিল্প নগরে ১৯ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হবে। মিরসরাই জোন থেকে ৩০ কিলোমিটার মেরিন ড্রাইভ বেজা বাস্তবায়ন করছে। বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান উন্নয়নের সাথে সামঞ্জস্য রেখে আগামীতে ১০টি বন্দরের প্রয়োজন হবে। বর্তমানে বেজার মাধ্যমে ৩২টি সেবা একযোগে প্রদান করা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি হালদা, কর্ণফুলী ইত্যাদি নদী বাঁচানো, প্রাকৃতিক জীব-বৈচিত্র্য রক্ষা এবং একই সাথে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ইত্যাদি কর্মকাÐ পরিচালনা করতে হবে বলে মন্তব্য করেন।
সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন চট্টগ্রাম বন্দরের টেইলার, কাভার্ডভ্যান, ট্রাক ইত্যাদি পরিবহনের জন্য পৃথক লেনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন। তিনি চট্টগ্রামের সাথে মিরসরাই, দোহাজারী রুটে আরও ট্রেন পরিচালনা করা, শিল্প কারখানায় নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে ট্যারিফবিহীন অনুমতি প্রদানের ব্যবস্থা বিবেচনা, শেরশাহ কলোনি, হালিশহর কলোনিতে হাইরাইজ বিল্ডিং নির্মাণ করে আবাসন সমস্যা সমাধান, রেল ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, বিভিন্ন সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়সাধন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে ক্ষমতায়নের উপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার এবিএম আজাদ, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. জহিরুল আলম দোভাষ, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন, চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এমএ সালাম, চিটাগাং চেম্বার পরিচালক মো. অহীদ সিরাজ চৌধুরী (স্বপন), এসএম আবু তৈয়ব, অঞ্জন শেখর দাশ, মো. শাহরিয়ার জাহান, নাজমুল করিম চৌধুরী শারুন ও সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর, প্রাক্তন পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ, রাউজান উপজেলা চেয়ারম্যান এহসানুল হায়দার চৌধুরী (বাবুল), বিকেএমইএ’র প্রাক্তন পরিচালক শওকত ওসমান, বন্দরের সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) মো. জাফর আলম ও জিপিএইচ ইস্পাতের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমাস শিমুল বক্তব্য রাখেন। এ সময় অন্যদের মধ্যে চেম্বার পরিচালক মো. জহুরুল আলম, মো. আবদুল মান্নান সোহেল, মো. এম মহিউদ্দিন চৌধুরী, সাকিফ আহমেদ সালাম, চট্টগ্রাম ওয়াসার এমডি প্রকৌশলী একেএম ফজলুল্লাহসহ সরকারি উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় ওয়াসার প্রস্তাবিত ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট প্রকল্প ও হালদা নদী বিষয়ক তথ্যচিত্র উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম ওয়াসা বোর্ড চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর মঞ্জুরুল কিবরিয়া।