মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে সত্যের সাথে লড়াই করা যায় না

11

মনসুর নাদিম

 

কয়েক সপ্তাহ হাড় কাঁপানো শৈত্যপ্রবাহে মানুষের অবস্থা কাহিল । সকিনার বাপ ঘরের বাহির হয় নাই সাপ্তাহ খানিক। আমিও কম্বলের অন্দরে ছিলাম কয়েকদিন। নাতি মশকুর নানার বাড়ি গিয়াছে পহেলা মর্তবা। আমার সময় যেন কাটিতেছেনা। সকিনার বাপ ও আসিতেছেনা শৈত্য প্রবাহে তামাম মানুষকে হিমশীতল করিয়া জমাইয়া ফেলিয়াছে। এই বয়সে শীতে কাঁপিতেছি নাকি বয়সে কাঁপিতেছি তাহা অনুমান করিতে পারিতেছিনা। একটা সময় ছিল শীতকালেও ঘামিয়াছি। আর এখন গরমেও ঘাম বাহির হইতে চাহেনা। গুলবদন কাশ্মিরী শাল গায়ে দিয়া কহিল, ইহা শৈত্যপ্রবাহ না, এইটা হইল শাস্তি প্রবাহ। হিম শীতল জলে পাঁচ ওয়াক্ত অজু করিতে পরাণ বাহির হইয়া যায়। গিজার লাগাইব লাগাইব করিয়াও লাগানো হইলনা কী এক অজানা আলস্যে।শীতল বাতাস প্রবাহিত হইবার আর সময় পাইলনা। এক হুজুরকে মওকা মতে পাইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, আপনারা এতো এতো কিতাব পড়েন শীতকালে অজু ছাড়া নামাজ পড়িবার কোন জুতসই ফতোয়া পান নাই ? রসিক হুজুর মৃদু হাস্যে কাঁচাপাকা দাঁড়িতে পঞ্চ আঙুল চালাইয়া কহিলেন , কেন থাকবেনা, কিতাবে নাই এহেন কথা হইতে পারেনা। আমি উৎসুক নয়ন মেলিয়া হুজুরের ফর্সা চেহেরার তরফ হাবাতের মতো তাকাইয়া আছি। ষাটোর্ধ্ব জিন্দেগিতে এহেন কথা পহেলা মর্তবা শুনিলাম। হুজুর আমার তরফ চাহিয়া ভ্রু নাচাইয়া কহিলেন- বলিব ? তাজ্জব হইয়া ক্ষীণ কণ্ঠে কহিলাম- বলেন। হুজুর কাশিয়া গলাটা ছাফ করিয়া কহিলেন-শীতের অজু, গরমের রোজা আর যৌবন কালের ইবাদত আল্লাহর বড়ই পছন্দ। শীতের সময় চব্বিশ ঘণ্টা উনুনের উপর গরম পানির ডেক্সি রাখিতে গিন্নিকে কহিয়া দিবেন , নতুবা গিজার, ইলেকট্রনিক হিটার ইত্যাদি দ্বারা জল গরম করিয়া লইবেন। ঠাÐা পানি শরীরে লাগাইলে অসুস্থতার আশংকা থাকিলে তৈয়াম্মুম করিয়া লইবেন। হুজুরের ফতোয়ায় আমি হাসিব নাকি কাঁদিব তাহা বিলকুল ভুলিয়া গিয়াছি। শীত মৌসুমের মজা ছিল শৈশবে। দাদী মাঝখানে আমি আর ছোটভাই বেলাল দুইজন দুই পাশে। কম্বল আমি টানিলে বেলাল উদম হইয়া যাইত বেলাল টানিলে আমি উদম হইয়া যাইতাম। এই কম্বল টানাটানি চলিত ঘুম না আসা পর্যন্ত। ঘুম আসিলে দাদীকে জড়াইয়া স্বপ্নের রাজ্যে ঘোড়া দৌড়াইতাম।
অনেকদিন পর সকিনার বাপ আসিলেন। সূর্যের দেখা নাই অনেকদিন। সূর্যের সাথে সাথে সকিনার বাপও গায়েব। আজ খানিকটা সূর্যের দেখা মিলিতেই বৈঠক খানার এই সূর্যের দরশনও পাওয়া গেল। সামনের কুরছিটাই তশরিফ রাখিতে রাখিতে কহিলেন- আপনার গত সংখ্যার লেখার শিরোনাম ছিল, মেধাবী রাজনীতিবিদের আকাল’’। কচি নেতা নুরু কাÐে তাহা প্রমাণ হইয়া গেল। ও কা ভাইছা কহেন খেলা হইবে।
শামীম ওসমান কহেন ‘’ খেলা হইবে’’। এই বাক্যটার ওপর অনেকের গোস্বা থাকিলেও নুরু সাহেব শুরু করিয়া দিয়াছেন। ইসরায়েলি গোয়েন্দা মেন্দি এন সাফাদির সহিত নুরুর কী কজ ? সকিনার বাপ কহিলেন- নুরু ফান্ড কালেকশনে গিয়াছেন ওমরাহ্র অজুহাতে। ইহাতে কেহই বেজার না। এই মুল্লুকে ধর্মকে পুঁজি করিয়া অনেকেই মালদার বনিবার ইতিহাস আছে। শবে বরাত, শবে ক্বদরে সকলের আগে তাহাদের মস্তকে নতুন টুপি শোভা পায়। কড়া আতরের সৌরভে চতুর্দিক মৌ মৌ করিয়া তাহারা মনে করিয়া থাকে উম্মতে মোহাম্মদীর পহেলা কাতারে আসিয়া গিয়াছে। প্রকৃত পক্ষে তাহারা কুয়োর ব্যাঙ।নুরুর ব্যাপারে কিছু বলিতে আমার রুচিতে বাধে। বাচ্চা একটা ছেলে দেশীয় রাজনীতির পাঠ ভালোভাবে রপ্ত নাকরিয়া আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্তর্জালে আটকা পড়িয়াছে। এখনো কিছু মানুষের পাকিস্তানি রোগ রহিয়া গিয়াছে। যাহা দমন করা যায়, নির্মুল করা যায়না । যে প্রদীপ খুব তাড়াতাড়ি জ্বলিয়া উঠে তাহার আয়ুষ্কাল ক্ষীণ হয় ইহাতে বিলকুল আন্দেশা নাই। রাজনীতিতে এত মিথ্যাচার এর আমদানি হইয়াছে যে মাঝে মাঝে শিহরিয়া উঠি। রাজনীতিতে এত হালকা খেলা আর কেহ খেলিয়াছে কিনা জানিনা। বাঘ আসিয়াছে বাঘ আসিয়াছে কহিয়া প্রতিদিন চিৎকার করা মিথ্যুক রাখাল বালকটার গল্প মনে পড়িয়া গেল। একবার কহিয়াছিল আওয়ামীলীগকে ভোট দিলে ভারতের কাছে দেশ বিক্রি করিয়া দিবে। মসজিদ থাকিবেনা। আজানের পরিবর্তে উলু ধ্বনি শোনা যাইবে, আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আজ চৌদ্দ বছর।
মসজিদে শুধু আগের মতো আজান শোনা যাইতেছে তাহা নহে মসজিদ ও বাড়িয়াছে। সরকার মডেল মসজিদ নির্মান করিতেছে। এবার কহিল- ১০ ডিসেম্বর দেশ চলিবে খালেদা জিয়ার কথায়। আজকে এক মাস হইয়া গেল কাহার কথায় দেশ চলিতেছে ? নুরু সাহেব কহিয়াছিলেন- ফ্লাইট রেডি তল্পিতল্পা গুটাইয়া ২৭টি লাগেজ লইয়া পলায়ন করিবে। এখন নুরু কোথায় ? আরও কহিয়াছিল বাংলাদেশ শ্রীলংকা হইবে। তাজ্জব বনিয়া যায় আমাদের দেশে এখনও পঞ্চাশের দশকের রাজনীতি চলিতেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ হইতে স্মার্ট বাংলাদেশ হইতেছে। মাগার আফসোস রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের কোনই উন্নতি হইলনা।অন্তরে দেশপ্রেম না থাকিলে যাহা হয় আরকী। বঙ্গবন্ধুর মতো নেতা হাজার বছরে একজন পয়দা হয়। সেই বঙ্গবন্ধুকে যাহারা তুচ্ছ্যতাচ্ছিল্য ভাবে সম্বোধন করিয়া থাকে তাহারা আর যাই হোক রাজনৈতিক শিষ্টাচার কী তাহা জানেনা। তাহারা জাতীয় বেওফা। বঙ্গবন্ধু আওয়ামীলীগের সম্পদ না। বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশের। যার অক্লান্ত পরিশ্রম ও রাজনৈতিক দুরদর্শিতায় আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে এই দেশ স্বাধীন হইয়াছিল। যাহারা একাত্তরে স্বাধীনতার বিরোধিতা করিয়াছিল তাহারা ও তাহাদের আওলাদ ফর্জন্দেরা এখনও মুল্লুকের বিরোধিতা করিতেছে। সকিনার বাপ একটানা কথাগুলি কহিয়া শরীর হইতে কাশ্মীরী শালটা খুলিয়া খানিকটা দম ফেলাইলেন। ভাগ্যিস আজ মাস্টার সাহেব ছিলেন না। থাকিলে তর্ক জমিয়া উঠিত। মাস্টার সাহেব থাকিলে কহিতেন, খালেদা জিয়া তিন তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষক ছিলেন। সকিনার বাপ কহিতেন, তিন তিনবার প্রধানমন্ত্রী থাকিয়া কয়টা সেতু বানাইয়াছেন ? ঠিকমত বিদ্যুৎ পর্যন্ত দিতে পারেননি। খাম্বা খাড়া করিয়া সান্ত¡না দিয়াছেন। কৃষকদের সার দিতে পারেনাই তাই গুলি দিয়াছেন। মানুষ কী তাহা ভুলিয়াছে ? তখন লাল হইয়া যাইত মাস্টার সাহেবের চেহেরা। আমাকেই তখন পরিস্থিতি সামাল দিতে হইত। তবে আজ মাস্টার সাহেব আসিলে আমি অবশ্যই জিজ্ঞাসা করিতাম- ২৭ টি লাগেজ লইয়া কেহ কী পলাইয়াছে ? দেশ কী শ্রীলংকা হইয়া গিয়াছে ? ক্ষমতায় যাইতে হইলে সরকারের দুর্বলতা লইয়া কথা বলিতে হইবে। জনগণ সম্পৃক্ত সমস্যা লইয়া আন্দোলন করিতে হইবে। মিথ্যুক রাখাল বালকের মতো বাঘ আসিয়াছে, বাঘ আসিয়াছে কহিয়া দেশবাসীকে লইয়া মজা করিলে যেদিন সত্যি সত্যি বাঘ আসিবে সেদিন সাহায্য করিতে কেহই আগাইয়া আসিবেনা। কেননা মিথ্যার ওপর খাড়াইয়া সত্যের সহিত লড়াই করা যায়না। কেহ কেহ সরকারের বিরোধিতা করিতে গিয়া আওয়ামীলীগের বিরোধিতা করিতেছে। সকিনার বাপ সব সময় কহিয়া থাকেন, এই মুল্লুকে দুইটা দল আছে, একটা আওয়ামীলীগ অন্যটা এন্টি আওয়ামীলীগ। সরকার আর দল এক নয়। গোলাম আলী ধুমায়িত চা আর নাস্তা লইয়া আসিলে সকিনার বাপকে নাস্তা লইতে কহিলাম।

লেখক : সাংবাদিক, রম্যলেখক