‘মিডআইল্যান্ডে’ আড্ডাবাজি সেলফি আর ভিডিও তৈরি!

15

ছুটির দিন আসলেই দর্শনার্থীদের ভিড় জমে শাহ আমানত সেতুতে। হেঁটে পার হওয়ার জন্য দুইপাশে ফুটপাত রাখা হলেও দর্শনার্থীর ভিড়ে হাঁটা কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া সেতুর ‘মিডআইল্যান্ডেও’ ভীড় করেন দর্শনার্থীরা। কেউ দাঁড়িয়ে সেলফি তুলছেন, কেউ কেউ ঠিকঠকে ভিডিও তৈরি থেকে শুরু করে বিড়ি ফুঁকে ফুঁকে আড্ডাতে মেতে উঠেন। বিশেষ করে উঠতি বয়সের কিশোর-কিশোরীদের ঝুঁকিপূর্ণ চলাচল গাড়ি চালকদের মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটায়। ফলে মারত্মাক দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থেকে যায়। অন্যদিকে শাহ আমানত সেতুতে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানোর সংখ্যাও কম নয়।
তবে এসব নিয়ে ভাববার যেন কেউ নেই! থানা পুলিশ সেতুর দুইপাশে দায়িত্ব পালন করে। আবার সেতুটির নির্মাণ কর্তৃপক্ষ সড়ক ও জনপথ বিভাগেরও এ নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। আর সেতুর ইজারাদারের তো গাড়ি থেকে টোল আদায় ছাড়া অন্য কোন কাজ নেই। দুর্ঘটনা কমাতে সুনির্দিষ্ট কোনো উদ্যোগের খবর কখনো কোন পক্ষ থেকে পাওয়া যায়নি।
আনোয়ারা কলেজ ছাত্রলীগ নেতা আব্দুল্লাহ আল নোমান। বাইক যোগে শহরে ফিরছিলেন। কর্ণফুলীর নদীর উপর শাহ আমানত সেতু পার হতেই আচমকা বাইকের সামনে এক যুবক। সেতুর মিডআইল্যান্ডে দাঁড়িয়ে সেলফি তুলতে গিয়ে হঠাৎ পড়ে যান। মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকলেও গাড়ির কড়া ব্রেকে প্রাণে বেঁচে যান দুজনই। গতকাল শুক্রবার বিকাল তিনটায় শাহ আমানত সেতুর উপরে এমন ঘটনা ঘটে। তারই দেওয়া তথ্যমতে সেতুতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সেতুর দুইপাশে দর্শনার্থীর ভিড়। সেতুর ফুটপাতে দাঁড়িয়ে নদী দেখছেন বা বিকালে শান্ত হাওয়া উপভোগ করছেন তারা। সেখানে পার্কের আমেজ তৈরি করেছে কপোত-কপোতীর ‘রোমান্টিক’ অঙ্গভঙ্গি ও চালচলন। এ ছাড়া যোগ হয়েছে ফুসকা ও বাদাম বিক্রেতাদের মজাদার পরিবেশনা। বিনোদনের জায়গায় সব ঠিকঠাক। তবে হেঁটে পার হওয়ার জন্য ফুটপাত দখল করে এমন বিনোদনমূলক পরিবেশনা বড্ড বেমানান। কর্মজীবী মানুষের বাড়ি ফিরতে বড্ড দুর্ভোগ পোহাতে হয়। দুর্ভোগের গল্প আপাতত শেষ হলেও সেতুর মিডআইল্যান্ডে মানুষের ভিড় দেখে রীতিমত অবাক হওয়ারই কথা। একদল বসে বিড়ি ফুঁকছেন আর গানের সাথে আড্ডায় মেতেছেন। কিশোর-কিশোরীদের দল জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঠিকঠক ভিডিও বানাচ্ছেন। ব্যাপারগুলো অদ্ভুত হলেও সরেজমিনে গিয়ে তারই সত্যতা মিলে। আর সেতুর মাঝে দাঁড়িয়ে সেলফি তোলা তো বেশ স্বাভাবিক ঘটনা। এসব দর্শনার্থী শুধু নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছেন না, ঝুঁকিতে ফেলছে সেতু দিয়ে চলাচলকারী লাখ লাখ মানুষের জীবন।
এসব বিষয় নিয়ে নিরাপদ সড়ক চাই সংগঠনের চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক শফিক আহমেদ সাজিব পূর্বদেশকে জানান, শাহ আমানত সেতুতে এমন চিত্র একদম স্বাভাবিক। যার যেভাবে ইচ্ছে সেভাবে আড্ডা দিচ্ছে। অথচ সেতুতে দারোয়ানসহ বেশ কয়েকজন কর্মচারী রয়েছেন। এদের কোনো কর্মচিত্রের দেখা মেলে না। তবে মাসে মাসে বেতন নিচ্ছেন। এসব নিয়ে পুলিশ কমিশনারকে লিখিতভাবে জানিয়েছিলাম। এমনকি ব্রিজ এলাকায় সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ওখানে উপস্থিত থেকে মানুষকে বুঝিয়েছে। ওই সময় আমাদের সাথে পুলিশও ছিল। কিন্তু তার পরবর্তী পুলিশের কোনো ভূমিকা চোখে পড়েনি। তিনি বলেন, মানুষের জীবনের গুরুত্ব বুঝতে হবে। একটু অবহেলায় মানুষের জীবন অকালে ঝরতে দেওয়া যাবে না। তিনি প্রশাসনের নজরদারি কঠোর করা ছাড়া এই সমস্যা থেকে পরিত্রাণ সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন।
এ নিয়ে বাকলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নেজাম উদ্দীন পূর্বদেশকে জানান, আমাদের থানার দুইটি দল সেতু এলাকায় সার্বক্ষণিক থাকে। সেতুতে টহল দেওয়ার সময় ঝুঁকিপূর্ণভাবে অবস্থান করা দর্শনাথীদের সরিয়ে দেওয়া হয়। এমনকি গাড়িতে থাকা মাইকে করে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে মিডআইল্যান্ডে না দাঁড়ানোর জন্য এবং রেলিংয়ে না বসার অনুরোধ করা হয়।
তিনি আরও বলেন, ঘনবসতি এলাকার আশপাশে কোনো বিনোদন স্পট না থাকায় মানুষ সেতুতে ভিড় করেন। তারপরও আমরা চেষ্টা করছি উপভোগের আয়োজন যেন দুর্ভোগের কারণ না হয়।
২০১০ সালের ৮ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হয় শাহ আমানত সেতু। বাংলাদেশ ও কুয়েত সরকারের যৌথ অর্থায়নে ৯৫০ মিটার দৈর্ঘ্য, ৪০ দশমিক ২৪ মিটার প্রস্থের সেতুটি নির্মাণ করে চীনের মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশন। বাংলাদেশের প্রথম এক্সেটার ডোজ সেতু এটি। সেতুটি নির্মাণের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ চট্টগ্রামের ৭টি উপজেলা, পার্বত্য জেলা বান্দরবান, পর্যটন নগরী কক্সবাজার, টেকনাফে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের যাতায়াত হচ্ছে। ফলে ওইসব এলাকার অর্থনীতিতেও চাঙ্গাভাব দেখা যাচ্ছে।