মিঠুর চাওয়া

13

 

আজ কদিন ধরে বেশ জাঁকিয়ে শীত পড়েছে। সকালবেলা মিঠুর ঘুম থেকে উঠতেই ইচ্ছে করে না।
মাও তাকে আগের মতো সকাল সকাল ডেকে বলেনা “ওঠ ওঠ মিঠু। দেরি হয়ে যাবে স্কুলের।”
করোনার জন্য এখন ক্লাস অন লাইনে হয়। মিঠুর ভালো লাগেনা এভাবে ক্লাস করতে। স্কুলে গেলে বন্ধুদের সাথে দেখা হয়, কথা হয়,গল্প হয়,কতো খেলতো ওরা। ফুটবল ক্রিকেট। তাই মিঠু এখন সকালবেলা দেরি করে ঘুম থেকে ওঠে। কিন্তু আজ সকালে বেশ মন ভালো করা ঝকঝকে রোদ উঠছে। তাই সে আজ খুব তাড়াতাড়ি উঠে পড়েছে। বাড়িতে মিঠুর মা সবার আগে ঘুম থেকে ওঠে। তারপর এই শীতের সকালেও স্নান সেরে ভিজে চুলে, সাজি হাতে বাড়ির পেছনের বাগানে গান গাইতে গাইতে ফুল তোলে। জবা,গাঁদা,চন্দ্রমল্লিকা আরও কতো ফুল। মিঠু মায়ের পিছু পিছু বাগানে ঢুকবার সমর কানে এলো কুঁইকুঁই শব্দে কেউ যেন ডাকছে। সে তার মাকে বললো “মা এ কিসের ডাক?”
ওর মা বললো মনে হয় ভুলু কাল রাতে বাচ্চা দিয়েছে। মিঠু খুশিতে তখনই পেছন ফিরে বললো “মা আমি দেখে আসি”?
মা হেসে বললেন যাও। মিঠু ওমনি একছুটে লেবু গাছের নিচে গিয়ে দেখে সত্যিই ভুলু তিনটে বাচ্চা নিয়ে শুয়ে আছে। মিঠুকে দেখেই লেজ নাড়ছে ভুলু। অন্যসময়ে মিঠুকে দেখলে ছুটে আসতো ভুলু। আজ বাচ্চাদের ছেড়ে আসছে না। মিঠু মনে মনে ভাবলো। আহা ভুলু তো এখন বাচ্চাদের মা। তাই আগের মতো ছুটে আসছে না। আর তার বাচ্চা তিনটিও এমন করে মায়ের গায়ের সাথে লেপ্টে আছে সে উঠতেই পারবে না। কী সুন্দর বাচ্চাগুলো তার। দুটোর গায়ের রং সাদা আর একটি লাল রঙের ভুলুর মতো। মায়ের মুখের কাছে মুখ এনে কুঁইকুঁই করে ডাকছে। ভুলু ওদের গা চেটে দিয়ে আদর করছে। মিঠুকে দেখে ভুলু লেজ নাড়াতে কী যেন বলতে চাইছে। আহা ওদের কী খিদে পেয়েছে? এই শীতের মধ্যে কেমন করে শুয়ে আছে
গুটিশুটি দিয়ে। মিঠু একদৌঁড়ে বাড়ির ভেতরে গিয়ে কিছু বাসি রুটি আর ছেঁড়া চট নিয়ে এলো ওদের জন্য। কৃতজ্ঞতায় ভুলুর চোখ যেন জল জমে আছে। কুকুর বলে যেন শুধু কথা বলতে পারে না। তার পরদিন থেকে মিঠু রোজ ওদের জন্য খাবার নিয়ে আসে। এখন বাচ্চাগুলোও তাকে চেনে। দেখলেই দৌঁড়ে আসে লেজ নাড়াতে নাড়াতে। মিঠুর সাথে বল খেলে বিকেলে। মিঠু ওদের নাম রেখেছে ভুলুর নামের সাথে মিলিয়ে কালু,নিলু,দুলু। ওরা যখন খেলে ভুৃলু তাকিয়ে দেখে আর লেজ নাড়ে। একদিন এমন করে খেলতে খেলতে মিঠু তাল সামলাতে না পেরে পুুকুরে পড়ে যায়। মিঠু তো সাঁতার জানে না। সে জল খেতে খেতে ডুবে যাচ্ছিল। বাচ্চাগুলোর কি অসহায় ডাক! আর ভুলু ওদের ডাকের শব্দে দৌঁড়ে এসে দেখে মিঠু পুকুরে ডুবে যাচ্ছে। ওমনি সে জলে ঝাঁপ দিয়ে মিঠুর কাছে গিয়ে শার্টের কলার কামড়ে ধরে সাঁতরে পারে এসে ঘেউ ঘেউ করে ডাকতেই মিঠুর মা, দিদি ঘাটে এসে মিঠুকে দেখে তাড়াতাড়ি ধরে শুইয়ে দেয়। একটু পরে মিঠু সুস্থ হয়ে উঠে বসে। ভুলু আর তার বাচ্চাগুলো মিঠুকে সুস্থ হয়ে উঠতে দেখে আনন্দে লেজ নাড়াতে নাড়াতে বাগানের দিকে চলে গেল। মিঠু বুঝলো পশু হলেও ওরা অকৃতজ্ঞ নয়। বরং মানুষের চাইতেও যেন বেশি বিশ্বস্ত।
সেই থেকে মিঠুর পশু-পাখিদের প্রতি খুব দয়া। তার বাবা তাই দেখে বলেন মিঠু আমাদের একদিন স্বামী বিবেকানন্দ হবে। মিঠু তখন খুব লজ্জা পায়। কিন্তু মনে মনে সেও তাই হতে চায়।