মাস্টারদা সূর্য সেন যেখানে প্রোথিত স্বাধীনতার শেকড়

30

 

 

আন্দোলন-সংগ্রাম এর গৌরবগাঁথার অমর সাক্ষী বিপ্লবতীর্থ চট্টগ্রাম। এই চট্টগ্রামের কৃতিপুরুষ মাস্টারদা সূর্য সেন। স্কুলে পড়াকালীন সময়ে ভালো লাগে মাস্টারমশাই হেমেন্দ্র বাবুকে। যিনি গলা ছেড়ে আবৃত্তি করতেন কবি নবীনচন্দ্র সেনের দেশাত্মবোধক কবিতাগুলি। শুনে সূর্য সেন প্রাণিত হতেন, উজ্জীবিত হতেন দেশপ্রেমে। দেওয়ালে টাঙানো থাকত বিদ্যাসাগরের ছবি। পড়তেন বঙ্কিম, শরৎচন্দ্র। আয়ারল্যান্ডের বিপ্লবী আন্দোলনের ইতিহাস, বিপ্লবী জন মিচেলের আত্মত্যাগের কাহিনী, ইস্টার বিদ্রোহের কথা। জেগে উঠে প্রিয় মাতৃভূমিকে পরাধীনতার হাত থেকে মুক্ত করার আকাক্সক্ষা। প্রাণে প্রাণে অনুরণন ঘটাতে চায় দ্রোহের আগুন। শৃঙ্খলমুক্তির তীব্র নেশায় পেয়ে বসে। ১৯১৬ -১৭ সাল। প্রথম মহাযুদ্ধের কয়েক বছর চলে গেছে। দুর্বল ব্রিটিশকে আঘাত করার মোক্ষম সুযোগ। ডাক দেন মাস্টার দা। মুক্তিকামী যুবকরা যোগ দেয় বিপ্লবী দলে। কাজ করতে থাকেন অবিরাম।নিরস্ত্র বিপ্লবীরা মেধা মননে কাজ করতে থাকে ধাপে ধাপে। আন্দোলন, সংগ্রাম,আক্রমণ সফলতা আসে ক্রমে ক্রমে। ব্রিটিশদের ভিত নড়ে ওঠে। ঘোষিত হলো সূর্য সেনকে ধরিয়ে দেবার পুরস্কার। ১৯৩৪ সালে আসে সে তমসাচ্ছন্ন দিন। আত্মমর্যাদা বিসর্জনের দিন। ২রা ফেব্রুয়ারি ১৯৩৩ পলাতক সূর্য সেনকে গৈরালা গ্রামে নিয়ে এসেছেন বিপ্লবী ব্রজেন সেন। মাস্টারদার সাথে রয়েছেন তার একান্ত অনুগত শান্তি, কল্পনা দত্ত, সুশীল ও মণি দত্ত। তাঁরা ছিলেন গ্রামের বিশ্বাস বাড়িতে, পরম যতেœ আগলে রেখেছিলেন সে বাড়ির বড়বধূ ক্ষিরোদপ্রভা।
বেশ ছিলেন কিন্তু বিপদ এলো অন্য দিক দিয়ে। প্রতিবেশী নেত্র সেনের সন্দেহ হলো কারা আছে বিশ্বাস বাড়িতে ? কিসের এত ফিসফাস গুঞ্জন। খবর লাগাতে বললেন নিজের গিন্নিকে। গ্রাম্য বধূটি সরল মনে এসে বললো ও বাড়িতে সূর্য সেন লুকিয়ে আছে গো ! অমন লোককে খাওয়ালেও যে পূণ্যি লাভ !
শুনে লাফ দিয়ে উঠলো নেত্র। খবর দিলেই যে কড়কড়ে দশ হাজার টাকা ! বউকে আশ্বস্ত করে ব্যাগ হাতে তখনই বেরিয়ে পড়লো, সোজা উঠলো গিয়ে থানায় ।সেদিন রাতে ঘুম ভাঙতে চমকে উঠলো ব্রজেন , জানলা দিয়ে লণ্ঠন দেখিয়ে কি করছে দাদা নেত্র সেন ? এক মিনিটও লাগলো না বুঝতে, ছুট লাগালেন বিশ্বাস বাড়ির দিকে। দেরী হয়ে গেছে ততক্ষণে, ক্যাপ্টেন ওয়ামসলের নেতৃত্বে গোটা বাড়ি ঘিরে ফেলেছে গোর্খা সেনার দল।রকেট বোমার আলোতে সবকিছু দিনের মতো স্পষ্ট ।
পরদিন সমস্ত সংবাদপত্রের হেডলাইন….. গৈরালা নামক গ্রামে সূর্য সেন গ্রেফতার । এনাকে ধরবার জন্য সরকার দশহাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করিয়াছিলেন ।( অমৃতবাজার পত্রিকা ১৭.২.১৯৩৩)
বৃটিশ পুলিশ কতবার কতভাবে জেরা করেছে সাধারণ আটপৌরে ঐ বধূটিকে। একবার তিনি বলুন স্বামীর ঘাতকের নাম। মুখ খোলেননি নেত্র সেনের বিধবা স্ত্রী।
অনেকদিন পর জানা গেছিল হত্যাকারী আর কেউ নয়, সেন বংশের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার দায়িত্ব স্বেচ্ছায় নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল ঐ বাড়িরই ছোট ছেলে কিরণ সেন। মাস্টারদা মরার আগে জেনে গেছিলেন দেশদ্রোহীকে চরম দন্ড দিতে তাঁর মন্ত্রশিষ্যরা এতটুকু দয়া দেখায়নি।
১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি ফাঁসি হয় মাস্টার দা সূর্য সেন। জীবনের শেষ দিনগুলোতে মাঝে মাঝে মৃত্যু চিন্তুা করতেন তিনি।এক চিঠিতে তিনি লিখেছেন, দার্শনিক এবং কবিরা মরণ জিনিসটাকে কত সুন্দরভাবে চিত্রিত করেছেন।মরণ রে তুঁহু মম শ্যাম সমান।মানুষ এত সুন্দর লেখা পড়েও উপলব্ধি করতে পারে না বলেই কি মৃত্যুকে ভয়ের জিনিস বলে মনে করে ?
বিশ্বব্রহ্মান্ড যিনি সৃষ্টি করেছেন,তিনি আমাদের আনন্দের জন্য প্রকৃতির অনন্ত সৌন্দর্য্যরে ভান্ডার খুলে রেখেছেন। মৃত্যু আমার দরজায় করাঘাত করছে। মন আমার অসীমের পানে ছুটে চলেছে। এই আনন্দময় পবিত্র মুহূর্তে আমি তোমাদের জন্য কি রেখে গেলাম? মাত্র একটি জিনিস, তা হল আমার স্বপ্ন, স্বাধীনতার স্বপ্ন।
আজকের দিনে মহামান্য সরকার বাহাদুরের নিকট দাবি-আমরা আজ স্বাধীন হয়েছি,তাই যদি তখনকার দিনের সরকারি দলিলাদি পরীক্ষা করা হয়,তাহলে এই দেশপ্রেমিক বিপ্লবী নেতার সৎকারের স্থান অনুসন্ধানে চিহ্নিত করে সেই স্থানে স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করা।