মান্না দে ও কফি হাউজের আড্ডা

19

পূর্বদেশ ডেস্ক

মান্না দে’র নাম এলেই বাঙালির সবার আগে মাথায় আসে এই গানটা, ‘কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’। সারা জীবনে তিনি কতো কালজয়ী গানই তো গেয়েছেন। ‘ও কেন এত সুন্দরী হলো’, ‘বাজে গো বীণা’, ‘যখন কেউ আমাকে পাগল বলে’, ‘কে তুমি তন্দ্রাহরণী’, ‘সে আমার ছোটো বোন’, ‘আমি যে জলসা ঘরে’ বাংলাতেই রয়েছে এমন অসংখ্য বিখ্যাত গান। এরপরও বাঙালির কাছে ‘কফি হাউজের সেই আড্ডাটা’-র মতো জনপ্রিয় আর কোনো গান হয়নি। নিখিলেশ, রমা রায়, সুজাতা, মইদুল, ডি সুজা, অমল এবং লেখক নিজে-গানের এই চরিত্রগুলো আমাদের যাপনে মিশে রয়েছে।
৯৪ বছর বয়সে মান্না দে ২৪ অক্টোবর ২০১৩ সালে ব্যাঙ্গালোরে মৃত্যুবরণ করেন। আজ তাঁর চলে যাওয়ার ৮ বছর পূর্ণ হলো। ১৯১৯ সালের ১ মে কলকাতার একটি সম্ভ্রান্ত হিন্দু পরিবারে বাবা পূর্ণ চন্দ্র এবং মা মহামায়া দে’র ঘর আলোকিত করে জন্মগ্রহণ করেন মান্না দে। আসল নাম প্রবোধ চন্দ্র দে হলেও দীর্ঘ ষাট বছরের সংগীতময় জীবনে ‘মান্না দে’ ডাকনামেই খ্যাতি লাভ করেন তিনি।
মান্না দে ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম সেরা সঙ্গীত শিল্পীদের একজন। হিন্দি, বাংলা, মারাঠি, গুজরাটিসহ অনেক ভাষায় তিনি ষাট বছরেরও অধিক সময় সঙ্গীত চর্চা করেছিলেন। বৈচিত্র্যের বিচারে তাঁকেই হিন্দি গানের ভুবনে সবর্কালের সেরা গায়ক হিসেবে স্বীকার করে থাকেন অনেক বিশেষজ্ঞ সঙ্গীতবোদ্ধারা।
মান্না দে গায়ক হিসেবে ছিলেন আধুনিক বাংলা গানের জগতে সর্বস্তরের শ্রোতাদের কাছে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় ও সফল সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব। এছাড়াও, হিন্দি এবং বাংলা সিনেমায় গায়ক হিসেবে অশেষ সুনাম অর্জন করেছেন। মোহাম্মদ রফি, কিশোর কুমার, মুকেশের মতো তিনিও ১৯৫০ থেকে ১৯৭০ এর দশক পর্যন্ত ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতে সমান জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। সঙ্গীত জীবনে তিনি সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি গান রেকর্ড করেন। সঙ্গীত ভুবনে তার এ অসামান্য অবদানের কথা স্বীকার করে ভারত সরকার ১৯৭১ সালে পদ্মশ্রী, ২০০৫ সালে পদ্মবিভূষণ এবং ২০০৯ সালে দাদাসাহেব ফালকে সম্মাননায় অভিষিক্ত করে। ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে রাজ্যের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ‘বঙ্গবিভূষণ’ প্রদান করে।
মান্না দে ১৯৪২ সালে কৃষ্ণ চন্দ্র দে’র সাথে বোম্বে (বর্তমান মুম্বাই) দেখতে আসেন। সেখানে শুরুতে তিনি কৃষ্ণ চন্দ্র দে’র অধীনে সহকারী হিসেবে এবং তারপর শচীন দেব বর্মণ (এস.ডি. বর্মণ) এর অধীনে কাজ করেন। পরবর্তীতে তিনি অন্যান্য স্বনামধন্য গীতিকারের সান্নিধ্যে আসেন এবং তারপর স্বাধীনভাবে নিজেই কাজ করতে শুরু করেন। ঐ সময় তিনি বিভিন্ন হিন্দি চলচ্চিত্রের জন্য সঙ্গীত পরিচালনার পাশাপাশি উস্তাদ আমান আলি খান এবং উস্তাদ আব্দুল রহমান খানের কাছ থেকে হিন্দুস্তানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তালিম নেন।
‘তামান্না’ (১৯৪৩) চলচ্চিত্রে গায়ক হিসেবে মান্না দে’র অভিষেক ঘটে। দ্বৈত সঙ্গীতে লতা মুঙ্গেশকরের সাথে ‘কে প্রথম কাছে এসেছি (শঙ্খবেলা)’ গান করেছেন। রবীন্দ্র সঙ্গীতসহ প্রায় ৩৫০০ গান গেয়েছেন মান্না দে।
আশির দশকের কথা। গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার মান্না দে’র জন্য একটা গান লিখতে মনস্থির করলেন। এরই মধ্যে একদিন তিনি গেলেন নিউ আলিপুরে নচিকেতা ঘোষের বাড়িতে। তখন ১৯৮৩ সাল। নচিকেতার ছেলে সুপর্ণকান্তির সঙ্গেও গৌরীপ্রসন্নের ভালো হৃদ্যতা। ইতিমধ্যেই সুপর্ণ কান্তির সুরে মান্না দে গেয়ে ফেলেছেন ‘সে আমার ছোটো বোন’ এবং আরো কয়েকটি সুপারহিট গান। নচিকেতার বাড়িতে গৌরীপ্রসন্ন সুপর্ণকে লিখে নিতে বললেন, ‘কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই/কোথায় হারিয়ে গেল সোনালি বিকেলগুলো সেই’। সঙ্গে সঙ্গেই তাতে সুর দিয়ে দিলেন সুপর্ণ। তখনই ঠিক করে ফেলেছেন, গানটা তিনি মান্না দে’কে দিয়েই গাওয়াবেন।
পরের দিন সকালে সুপর্ণকে ফোন করলেন গৌরীবাবুর স্ত্রী। বললেন, ‘কী গান দিয়েছিস তোর কাকাকে? সারা রাত জেগে লিখে গিয়েছে। এত অসুস্থ, বহুদিন পরে রাত জেগে কোনও গান লিখল।’ ততদিনে ক্যানসার বাসা বেঁধেছিল গৌরীপ্রসন্নের শরীরে। দু’দিন পর গান লিখে গৌরীবাবু সুপর্ণের কাছে হাজির। সুপর্ণ চাইছিলেন, গানে আরেকটি স্তবক যোগ হোক। কিন্তু গৌরীবাবু প্রথমে রাজি ছিলেন না। তাঁর বক্তব্য ছিল, ‘একটা নতুন স্টাইলে এই গানটা শেষ করছি, ওরকমভাবে বাড়তি লাইন যোগ করার মানে হয় না।’ অন্যদিকে সুপর্ণের আবদার, গানে একটা ক্লাইম্যাক্স দরকার। অনেক পীড়াপীড়ি করে শেষ পর্যন্ত গৌরীবাবুকে রাজি করান আরেকটা স্তবক লিখতে। যোগ হয়, ‘ সেই সাতজন নেই আজ, টেবিলটা তবু আছে…’ স্তবকটি।
এই গানের শেষ তিনটে লাইন গৌরীপ্রসন্ন লিখেছিলেন হাওড়া স্টেশনে, একটা সিগারেটের প্যাকেটের পিছন দিকে। চিকিৎসা করাতে চেন্নাই যাচ্ছিলেন তিনি। এক চেনা লোকের মারফত গানের শেষ লাইনগুলো ‘খোকার’ কাছে পাঠিয়ে দেন তিনি। ‘কফি হাউজের সেই আড্ডাটা’ গানটি বোম্বে শহরে রেকর্ড করলেন মান্না দে। পরের ঘটনা তো ইতিহাস।