মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ইসলাম

17

 

ইসলাম শান্তির ধর্ম, প্রগতির ধর্ম, নিরাপত্তার ধর্ম। মানুষের জীবন, সম্পদ, সম্মান, ধর্মবিশ্বাস, মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে ইসলাম। তাই ইসলাম ধর্মকে বলা হয় পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। এই বিধান বিশ্বের মানব জাতির জন্য কল্যাণকর। আল্লাহ পাক সকল কিছু সৃষ্টি করেছেন মানুষের কল্যাণে। মানুষকে করেছেন আশরাফুল। মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা জীব। আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত পবিত্র কোরানে ইরশাদ করেছেন, আমি আদম সন্তানকে মর্যাদাবান করেছি। (সুরা বনী ইসরাঈল : ৭০)
মানুষের জন্য ইজ্জত বা সম্মান অত্যন্ত মূল্যবান। তাই পবিত্র ইসলাম মানব জাতির ইজ্জত-সম্মানের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছেন। অনুমতি ছাড়া কারো শয়নকক্ষে প্রবেশ না করার কথা কোরআনে পাকে বর্ণিত হয়েছে। মুমিন মুসলমানের দৃষ্টি সংযুক্ত করা এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করার নির্দেশ ইসলামে আছে। মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষে কোন কথা শুনে সত্য মিথ্যা যাচাই না করে প্রচার করাকে মিথ্যার সমতুল্য বলা হয়েছে। কোন মানুষকে মন্দ নামে ডাকা, নিন্দা ও উপহাস করা আল্লাহ পাক নিজেই নিষেধ করেছেন। কুৎসা ও পরনিন্দাকে মৃত ভাইয়ের সমতুল্য বলা হয়েছে। এখানে পরনিন্দাকে দুটি হারামের সমান বলা হয়েছে। কারণ, জন্তু হালাল হলেও যখন মৃত্যু হয় তখন তা হারাম। এ জন্য বলা হয়েছে হালাল জন্তুর মৃত মাংস খাওয়াও হারাম এবং জীবিত মানুষের মাংস খাওয়াও হারাম।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সারা জীবন সংগ্রাম করে গেছে। তিনি জীবনে হজ করেছেন মাত্র একবার। বিদ্যায় বেলায় লক্ষাধিক মানুষের সামনে জবলে রহমতের উপর দাঁড়িয়ে আরাফাতের ময়দানে ঘোষণা করছিলেন, তোমাদের জানমাল এবং তোমাদের ইজ্জত সম্মান তোমাদের উপর পবিত্র যেমন পবিত্র তোমাদের আজকের (হজের) এদিন, তোমাদের এ শহর এবং এ মাস। মহানবী (দ.) ছিলেন, বঞ্চিত শোষিত দুস্থ অসহায় মানুষের আশ্রয়দাতা। তিনি নিজে অনাহারে থেকে ক্ষুধার্তকে খাওয়াতেন। তার কল্যাণকর কর্মসূচিতে মুগ্ধ হয়ে লক্ষ লক্ষ আদম সন্তান ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেছেন।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (দ.) কখনো ধনী-গরিব, সাদা-কালো, আরব অনারব মানুষের মাঝে পার্থক্য করতেন না। তিনি ইরশাদ করেছেন,‘সমগ্র সৃষ্টি জগৎ আল্লাহ পাকের একটি পরিবার। তাঁর কাছে প্রিয় হচ্ছে সে ব্যক্তি যিনি তাঁর সৃষ্টির প্রতি অনুগ্রহ করে।
মানবতার কাÐারী মহানবী হযরত মুহাম্মদ (দ.) মুসলমানগণ একে অপরকে কিভাবে সহযোগিতার মাধ্যমে ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠা করতে হয়-তা তাঁর বাস্তব জীবনে অনুশীলনের মাধ্যমে আমাদের শিখিয়ে গেছেন। তিনি হাদিসে পাকে বর্ণনা করেছেন, মুসলমান একে অপরের ভাই। এক ভাই যেন অন্য ভাইয়ের প্রতি জুলুম, অপমান এবং হেয় না করে। যে তার ভাইয়ের প্রয়োজন মিটাবে আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত তার প্রয়োজন মিটাবে।
ইসলাম মানুষ ও মানুষের ধনসম্পদের নিরাপত্তা প্রদান করেছেন। সকল মানুষকে বৈধভাবে সম্পদ অর্জনের অধিকারও প্রতিষ্ঠা করেছেন। আল্লাহ পাক অপরের সম্পদ অবৈধভাবে গ্রাস করো না। (সুরা বাকারা : ১৮৮) প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (দ.) ইরশাদ করেছেন, নিজের সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে যে মৃত্যুবরণ করে সে শহিদ। (বোখারি শরিফ)
ইসলাম ধর্ম বর্ন গােত্র পার্থক্য না মৌলিক চাহিদাকে অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। বেকার অসহায় এতিম বিধবা প্রতিবন্ধী, বৃদ্ধ, শারীরিক অক্ষম ব্যক্তিগণকে রাষ্ট্রীয় কোষাগার হতে সাহায্য প্রদানের বিধান ইসলামে আছে। ইসলামে শুধু মানুষের অধিকার না, শুকর-কুকুরের অধিকারও আছে। আমিরুল মোমেনিন খলিফাতুন মোসলেমিন হযরত ওমর ফারুক (রা.) বলেছেন, আল্লাহর শপথ! আমার শাসনে সানআ পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসরত শেষের প্রস্থানে বসে তার প্রাপ্য অংশ পাবে, চেহারায় বিষন্নতার ছাপ পড়ার আগেই। (সূত্র: কিতাবুল খারাজ, পৃষ্ঠা : ২১২)। খলিফাতুল মোসলেমিন আরো ঘোষণা করেছিলেন, ‘ফোরাতের তীরের একটি কুকুরও অনাহারে মরলে কিয়ামতের দিন তার জন্য আমাকে জবাবদিহি করতে হবে।
মহান আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জতের মনােনীত ধর্ম ইসলাম অমুসলিমদের স্বাধীনতারও অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছেন। অমুসলিমদের উপাস্যদের নিন্দা করা হারাম ঘোষণা করেছেন। মহান আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন, আল্লাহ ছাড়া যারা দেব-দেবীর উপাসনা করে তাদের উপাস্যদের তোমরা গালি দিও না। (সূত্র আনআম আয়াত: ১০৮)।
মহানবী হযরত মোহাম্মদ (দ.) তায়েফ প্রান্তরে ধর্ম প্রচার করতে গেলে আবু আবদ আলাইন নামক ব্যক্তি রাসুল (দ.)কে উৎপীড়ন করে। বেশ কয়েকজন দুষ্ট বালককে লেলিয়ে দেয় মুসলমানদের বিদ্রæপ করতে। নবীজীর শরীর মোবারকে পাথর নিক্ষেপ করার কারণে রক্ত ঝরে। এই আবু আবদ আলাইন একদিন তারেফ হতে একটি প্রতিনিধি দলের নেতা হয়ে পবিত্র মদীনায় উপস্থিত হলে আল্লাহর রাসুল (দ.) তাকে অভিনন্দন জানান এবং তাদেরকে মসজিদে নববীর চত্বর তাঁবু স্থাপন করে থাকার ব্যবস্থা করে দেন। প্রিয় নবী (দ.) প্রতিদিন তাঁবুতে গিয়ে এই মেহমানদের খোঁজ-খবর নিতেন। মহানবী (দ.)’র মহানুভবতা দেখে তারা মুগ্ধ হন এবং দলবলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।
মুসলমানগণ মহানবী (দ.) এর উত্তম আদর্শ গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়েছে বলেই আজ দুর্গতি।
ইসলামে সত্য গোপন করার কোন সুযোগ নেই। স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করার অধিকার ইসলাম ধর্ম নিশ্চিত করেছেন। আমিরুল মোমেনিন হযরত ওমর ফারুক (রা.) একদিন মসজিদে জুমার খুৎবা প্রদান করছিলেন। এমন সময় এক ব্যক্তি তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আমিরুল মোমেনিন! আপনি এবং আমি দু’জনেই গণিমতের কাপড় সমান পেয়েছি, কিন্তু আপনার জামা লম্বা হলো কিভাবে? খলিফা জবাব দেয়ার আগেই তাঁর পুত্র আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) দাঁড়িয়ে বললেন, আমার ভাগে যে কাপড় পেয়েছি আমি তা আমার পিতার প্রয়োজনে দান করেছি। লোকটি লজ্জিত হয়ে বসে পড়লেন। খলিফা তাকে ধমক দিলেন না বরং বললেন, যতদিন সাচ্চা ঈমানদার বেঁচে থাকবেন ততদিন ইসলাম ও মুসলমানদের কেউ ক্ষতি করতে পারবে না।

লেখক : কলাম লেখক, রাজনীতিক