মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলাম

3

রোকন উদ্দীন আহমদ

মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলাম পশ্চিম বাংলার বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার জামুরিয়া থানার চুরুলিয়া গ্রামে ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ মে তারিখে জন্ম গ্রহণ করেন। বাংলা তারিখ ১৩০৬ সনের ১১ জ্যৈষ্ঠ। তাঁর পিতার নাম কাজী ফকির আহমদ ও মায়ের নাম জাহেদা খাতুন। নজরুল ইসলাম শৈশবেই পিতৃহীন হন। পরিবারের অভাব অনটনের মধ্য দিয়ে তিনি মানুষ হন এবং কবি প্রতিভার ক্রমবিকাশ ঘটান। তাঁর ডাক নাম দুখু মিয়া। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহী কবি নামে পরিচিত। তাঁর কাব্য সাধনায় আদর্শের পরিচয় ফুটে উঠেছে তাঁর রচিত বিখ্যাত “বিদ্রোহী” নামক কবিতায়। প্রধানত এই কারণেই তিনি বিদ্রোহী কবি নামে পরিচিত। তিনি বাংলাদেশের জাতীয় কবি।
বাল্যকাল থেকেই তিনি ধর্মের প্রতি অনুরাগী ছিলেন। বাড়ির নিকটস্থ মসজিদে কিছুদিন এমামতি করেছিলেন। দশ বছর বয়সে গ্রামের মক্তব হতে নি¤œ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরে এই মক্তবে এক বৎসর শিক্ষকতা করেন। এগারো বৎসর বয়সে নজরুল ইসলাম অর্থ রোজগারের জন্য লেটোর দলে প্রবেশ করেন। সময়োপযোগী গান, যাত্রা, নাটক, রচনা করে গ্রামে-গ্রামে গিয়ে অভিনয় করতে থাকেন। সংসারে অভাব তীব্র হয়ে উঠায় কবি কিছুদিন আসানসোলের এক রুটির দোকানে চাকরি করেছিলেন। বেতন ছিল আট টাকা। এরপর আসানসোল থানার দারোগা হাফিজ উদ্দিনের সহযোগিতায় ময়মনসিংহের ত্রিশাল থানার দরিরামপুর হাইস্কুলে ভর্তি হন। এই স্কুলে এক বছর পড়ালেখা করেন। এরপর রানীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজস্কুলে ভর্তি হন। এই স্কুলে তিনি তিন বৎসর পড়ালেখা করেন। ছাত্রাবস্থায় কথাসাহিত্যিক শৈলজানন্দের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব হয়।
কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন ভারতবর্ষের স্বাধীনতাকামী । স্বাধীনতার স্বপ্নে অস্ত্র চালনা শিক্ষার জন্য তিনি ১৭ বৎসর বয়সে ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে ৪৯নং বাঙালি পল্টনে যোগ দেন। সৈন্যদলে থেকেও তিনি সাহিত্য সাধনা অব্যাহত রাখেন। বাঙালী পল্টনে ফার্সি ভাষার অভিজ্ঞ একজন পাঞ্জাবি মৌলভীর কাছে ফার্সি ভাষা শিক্ষা গ্রহণ করেন। এরপর তিনি ফার্সি ভাষার কবিদের প্রায় সব বই পড়ে নেন। এসময় তিনি ইরানের মরমী কবি হাফিজের কবিতার অনুবাদ “রুবাইয়াৎ-ই- হাফিজ” অনুবাদের অনুপ্রেরণা লাভ করেন। করাচীর সৈনিক জীবনে তাঁর প্রতিভার বিকাশ ঘটে। করাচী ব্যরাকে “রিক্তের বেদন” গ্রন্থ সহ অসংখ্য গান, কবিতা, গল্প তিনি রচনা করেন। কিন্তু বাংলাদেশের পত্রিকাগুলোতে নজরুল ইসলামের কবি প্রতিভা প্রথমদিকে প্রকাশের সুযোগ হয় নাই। তৎকালীন বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির সম্পাদক মোজাফফর আহমদ এবং “সবুজপত্রের” সহ সম্পাদক পবিত্র গঙ্গোপাধ্যয় নজরুলকে সাধারণ্যে পরিচয় করিয়ে দেন। নজরুল ইসলামের প্রথম রচনা “বাউন্ডেলের আত্মকাহিনী” কলকাতার সওগাত পত্রিকায় ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর প্রথম কবিতা “মুক্তি” ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য পত্রিকায় সর্বপ্রথম ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হয়। এই সময় পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের চেষ্টায় হাফিজের একটি গানের অনুবাদ প্রবাসী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। করাচিতে তিন বৎসর সৈন্যদলে থেকে নজরুল ইসলাম ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায় আসেন। কলকাতায় এসে পুরোপুরিভাবে সাহিত্য রচনায় মনোনিবেশ করেন। একই বৎসর বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির সম্পাদক মোজাফফর আহমদের বাসায় তাঁর বিখ্যাত “বিদ্রোহী” কবিতা লেখা হয়। কবিতাটি ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে “মোসলেম ভারত” পত্রিকায় প্রকাশিত হলে কবি চারিদিকে প্রশংসিত হন। দেশব্যাপী তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। কবিতাটির প্রথম ১০ চরণ পাঠ করি,
বল বীর-
বল উন্নত মম শির।
শির নেহারী আমারি, নত শির ওই শিখর হিমাদ্রির!
বল বীর-
বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি
চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি
ভূলোক দ্যুলোক গোলক, ভেদিয়া,
খোদার আসন “আরশ” ছেদিয়া
উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ব বিধাত্রীর!
মম ললাটে রুদ্র ভগবান জ্বলে রাজ- রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর!
১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে বৃটিশের বিরুদ্ধে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। এরপর হয় খেলাফত আন্দোলন। এসব আন্দোলনের সময় গান ও কবিতার মাধ্যমে প্রাণ সঞ্চার করেন নজরুল ইসলাম। ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে নজরুল ইসলাম “ধুমকেতু” নামে একটি অর্ধ সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। এই সময় সা¤্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন তরঙ্গ বৃটিশ শাসকের স্তম্ভকে কেঁপে তুলেছিল। নজরুল ইসলাম দেশের আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার প্রাণে দেশপ্রেম জাগিয়ে আন্দোলন সফল করে তোলার উদ্দীপ্ত আহব্বান জানান। বাংলার বিপ্লবীদের অভিনন্দন জানান। তাই তাঁর “ধুমকেতু” প্রকাশের সময় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাকে আশীর্বাদ পাঠিয়েছিলেন। “ধুমকেতুর” উপর ব্রিটিশ সরকার প্রথম থেকেই খরগ হস্ত ছিল। ফলে বেশিদিন তিনি “ধুমকেতু” চালাতে পারেন নাই। সরকার তাঁকে কারাবন্দী করে। কারাগার নজরুল ইসলামের বিপ্লবী কবি প্রতিভার স্রোতকে স্তব্দ করতে পারে নাই।। কারাগারে বসেও তিনি অসংখ্য গান রচনা করেছেন।“ডাঙার গান” শিরোনামের একটি গান নিম্নরুপ: “কারার ঐ লৌহ কবাট/ ভেঙে ফেল, কররে লোপাট/রক্ত-জমাট/শিকল-পুজোর পাষান-বেদী।” এই কারাগারেই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর “বসন্ত” নাটক নজরুল ইসলামের প্রতি উৎসর্গ করে পাঠান।
প্রচলিত সংস্কার ও রাজনীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষনা নজরুলের কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। চিন্তায় ও কর্মে, স্বাধীনতা এবং আত্মচেতনার স্পষ্ট প্রকাশ ছিল নজরুলের। তিনি বাঙালির রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারায় এবং বাঙলা সাহিত্যের ইতিহাসে বিদ্রোহী কবি বলে পরিচিত। কবি নজরুল ইসলাম নিজের দেশকে, দেশের মানুষকে ভালবেসেছেন। মানবতার জন্য আকুতি, বেদনা ও বিচিত্র অনুভূতি তার গদ্যে-কবিতায় কোমল ও কঠোরভাবে প্রকাশ পেয়েছে। দাসত্ব ও পরাধীনতার বিরুদ্ধে, কুসংস্কার ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে এই কবির উচ্চারণ ছিল বজ্রকণ্ঠ। অন্যায়-বৈষম্যের বিরুদ্ধে অত্যাচার- নিপীড়নের বিরুদ্ধে গণমানুষের পক্ষে লেখার মাধ্যমে তিনি সোচ্চার ছিলেন। তিনি ছিলেন মানবতার কবি। মানবতার পুজারী কবি নজরুল ইসলাম তার সাম্যবাদী কবিতাগুলোতে মানুষকে মহান করে তুলে ধরেছেন। তাঁর “মানুষ” কবিতায় লিখেছেন, “গাহি সাম্যের গান/মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান!/ নাই দেশ-কাল পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম জাতি,/ সব দেশে সব কালে, ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।”
দেশের স্বাধীনতা ও জাতীয় আন্দোলনে যুব সমাজ অগ্রগামী ভূমিকা রাখতে পারে। সকল সত্য ও কল্যাণ কামনার সাথে যুব সমাজের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। তাই কাজী নজরুল ইসলাম দেশের যুব শক্তিকে বার বার আহবান জানিয়েছেন। নিপীড়িত ও অধপতিত মানুষকে জীর্ণ সমাজ ও বিপন্ন পরিবেশ থেকে মুক্তি দিবার লক্ষ্যে নজরুল অসংখ্য গান ও কবিতায় যৌবনের জয়গান করেছেন। এজন্য বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি “যৌবনের কবি” ও “মানবতার কবি” বলে সুপরিচিত। তবে কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র ও নারী শক্তিও তার কাব্য সাধনায় প্রেরণা যুগিয়েছে।
কাজী নজরুল ইসলাম কবি, সুরশিল্পী, সঙ্গীততজ্ঞ, সাংবাদিক ও অভিনয় শিল্পী। ফার্সী গজল গানের সার্থক প্রবর্তনায় তিনি বাংলার গানও নব নব গীতিপুষ্পে সজ্জিত করেছেন। হামদ, নাত, গজল সহ ইসলামী সংগীত রচনা করেছেন। তাঁর সাহিত্যে প্রচুর আরবি ও ফার্সি শব্দ ব্যবহার করেছেন। স্বধর্মের প্রতি তার আস্থা ছিল অবিচল। তিনি ছিলেন উদার মানবতাবাদী এবং অসাম্প্রদায়িক মানুষ। তিনি শ্যামা সংগীত, ভজন ও কীর্তনও রচনা করেছেন। তার লেখায় হিন্দুদের দেব দেবীও উপজীব্য হয়েছে। হিন্দু নারী প্রমিলা দেবীকে তিনি বিয়ে করেছিলেন। কৃষ্ণ মোহাম্মদ, অরিন্দম খালেদ, কাজী অনিরূদ্ধ ইসলাম এবং কাজী সব্যসাচী ইসলাম তার সন্তানদের নাম। তার “কান্ডারী হুঁসিয়ার” কবিতায় আছে, “হিন্দু না ওরা মুসলিম?” ওই জিজ্ঞাসে কোনজন?/ কান্ডারী! বল ডুবিছে মানুষ,সন্তান মোর মার!
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কবিকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শন স্বরুপ বঙ্গবন্ধু কবিকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেন। ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে কবিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক সম্মান সূচক ডি লিট ডিগ্রী প্রদান করা হয়। ১৯৭৬ সালে তাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পদক একুশে পদক প্রদান করা হয়। ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দ হতে তিনি দুরারোগ্য ব্যধিতে আক্রান্ত ছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি বোধশক্তি ও বাকশক্তি হারানো অবস্থায় কাল কাটিয়েছেন। এই প্রসঙ্গে তার “বাতায়ন পাশে গুবাক তরুর সারি” কবিতাটি স্মরণ করা যাকঃ তোমাদের পানে চাহিয়া বন্ধু, আর আমি জাগিবনা,/ কোলাহল করি সারা দিনমান কারো ধ্যান ভাঙিবনা।/নিশ্চল নিশ্চুপ/ আপনার মনে পুড়িব একাকী গন্ধুবিধুর ধূপ”! বোধ ও বাকশক্তিহীন অবস্থায় তিনি ৩৪ বছর ছিলেন। অবশেষে এক বৎসর এক মাস এক সপ্তাহ তিনি ঢাকার পিজি হাসপাতালের ১১৭ নম্বর কেবিনে চিকিৎসাধীন ছিলেন। চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। বাংলা তারিখ ১৩৮৩ সনের ১২ ভাদ্র। মসজিদের পাশে তাকে কবর দেওয়ার জন্য তিনি তার “গানে” বলেছেন। যেমন: “মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই/যেন গোরে থেকেও মোয়াজ্জিনের আযান শুনতে পাই।” তাই নজরুলকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের পাশে কবর দেওয়া হয়েছে। তাঁকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় কবর দেওয়া হয়েছে। মানবতার এই মহান পুজারী বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রতি লাল সালাম।
বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বেঁচে ছিলেন ৭৭ বৎসর। ১৯৪১ সাল থেকে ১৯৭৬ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি বোধ ও বাকশক্তিহীন অবস্থায় ছিলেন। তিনি ৩৪ বৎসর সেরকম ছিলেন। বাংলা সাহ্যিত্যের অন্যতম এই দিকপাল সাহিত্য রচনা করেছেন মাত্র ২২ বৎসর। এর মধ্যে তিনি রচনা করেছেন- কবিতা, গান, গল্প, নাটক, প্রবন্ধ,উপন্যাস। বাংলাদেশের রণসংগীত করা হয়েছে তার রচিত “চল্ চল্ চল্” গানটি। কাজী নজরুল ইসলামের রচিত “অগ্নিবীণা, দোলনচাঁপা, বিষের বাঁশি, বুলবুল, জিঞ্জির, সর্বহারা, সঞ্চিতা, প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থ-ব্যথার দান, রিক্তের বেদন প্রভৃতি গল্পগ্রন্থ-আলেয়া, ঝিলিমিলি প্রভৃতি নাটক এবং মৃত্যুক্ষুধা, বাঁধনহারা, কুহেলিকা প্রভৃতি উপন্যাস তাকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে চির অমর করে রাখবে। নজরুল বাঙালির পরম শ্রদ্ধার পাত্র।