মাতৃরূপে ঈশ্বরের আরাধনা

6

নিজস্ব প্রতিবেদক

শারদীয় দুর্গোৎসবের তৃতীয় দিনে গতকাল সোমবার সাত-সকালে মহাষ্টমীর পূজা প্রশস্তা ও ব্রতোবাস, পুষ্পাঞ্জলি নিবেদন এবং বিকালে সন্ধিপূজা সম্পন্ন হয়েছে। এদিন ষোড়শ উপাচারে দেবীর পূজা অনুষ্ঠিত হয়। একশ’ আটটি পদ্ম এবং প্রদীপ দিয়ে দেবী দুর্গার আরাধনা করেন ভক্তরা। উপবাস থেকে মহামায়ার শ্রীচরণে পুষ্পাঞ্জলি নিবেদন করেন ভক্ত-পূজার্থীরা। এরপর আয়োজন ছিল কুমারী পূজার। সন্ধ্যারতি থেকে প্রতিমা দর্শনে নগরীর মন্ডপগুলোতে ভিড় করেন আবাল-বৃদ্ধ-বণিতারা। টানা পাঁচদিনব্যাপী দুর্গোৎসবের আজ মহানবমী।
শারদীয় দুর্গোৎসবের মহাষ্টমীতে কুমারী পূজা অন্যতম আকর্ষণ। অষ্টমীতে নগরীর পাথরঘাটায় শ্রী শ্রী রাধাগোবিন্দ ও শান্তনেশ্বরী মাতৃমন্দিরে প্রতিবছরের মতো এবারও অনুষ্ঠিত হয়েছে কুমারী পূজা। কুমারী পূজার জন্য মাতৃভাবের পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে এবছর কুমারী মায়ের আসনে বসানো হয়েছে সাত বছর বয়সী প্রীত ধরকে। কুমারীর বয়স সাত বছর হওয়ায় ‘মালিনী’ নামে পূজিত হয়েছে। শাস্ত্রমতে মালিনী নামে কুমারী পূজিত হলে ধনশ্বৈর্য লাভ হয়। প্রীত ধর সেন্ট স্কলাস্টিকাস স্কুলের প্রথম শ্রেণীর শিক্ষার্থী। মহাষ্টমীর পূজা শেষে সকাল সাড়ে দশটায় মাতৃরূপে ফুল, চন্দন, বেলপাতা, তুলসী দিয়ে শুরু হয় কুমারী পূজার আচার। পূজা কার্যক্রম পরিচালনা করেন শান্তনেশ্বরী মাতৃমন্দিরের পুরোহিত শ্রীমৎ শ্যামানন্দ দাস মোহন্ত মহারাজ।
কুমারী পূজা শেষে মন্দিরের পুরোহিত শ্রীমৎ শ্যামল সাধু মোহন্ত মহারাজ সাংবাদিকদের বলেন, কুমারী আদ্যাশক্তি মহামায়ার প্রতীক। কুমারীরা শুদ্ধতার প্রতীক হওয়ায় মাতৃরূপে ঈশ্বরের আরাধনার জন্য কুমারী কন্যাকে নির্বাচিত করা হয়। মূলত নারীর মর্যাদাকে যথাস্থানে অধিষ্ঠিত করতেই কুমারী পূজা করা হয়। মাটির প্রতিমায় যে দেবীর আরাধনা করা হয়, তারই জীবন্তরূপ কুমারী পূজা। কুমারীতে সমগ্রজাতির শ্রেষ্ঠ শক্তি, পবিত্রতা, সৃজনী ও পালনী শক্তিসহ সকল কল্যাণী শক্তি সু²রূপে বিরাজিতা। দুর্গাপূজার অষ্টমীতে কুমারী পূজা হলো অশুভ, অন্যায়, পাপ-পঙ্কিলতার বিরুদ্ধে ন্যায়পূর্ণ, সত্য ও সুন্দরের যুদ্ধ।
বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকানুযায়ী, আজ মঙ্গলবার সকাল সাড়ে সাতটায় শুরু হবে দশভ‚জা দুর্গাদেবীর মহানবমী কল্পারম্ভ ও বিহিত পূজা প্রশস্তা। অনেকের বিশ্বাস, মহানবমীর দিনই হচ্ছে দেবী দুর্গাকে মন-প্রাণ ভরে দেখে নেয়ার ক্ষণ। এই দিন অগ্নিকে প্রতীক করে সব দেব-দেবীকে আহুতি দেয়া হয়। অগ্নি সব দেবতার যজ্ঞ-ভাগ বহন করে যথাস্থানে পৌঁছে দিয়ে থাকেন। এই দিনই দুর্গাপূজার অন্তিম দিন। পরের দিন বিজয়া দশমীতে দর্পণ বিসর্জন ও পুস্পাঞ্জলী নিবেদন শেষে প্রতিমা নিরঞ্জনের আয়োজন। নবমী-নিশিতে উৎসবের রাত শেষ হয়। নবমী রাত তাই বিদায়ের করুণ-রাগিনী নিয়ে হাজির হয়। এ সব বিবেচনা করে অনেকেই মনে করেন নবমীর দিন আধ্যাত্মিকতার চেয়েও অনেক বেশি লোকায়ত ভাবনায় ভাবিত থাকে মন।
হিন্দু ধর্মীয় শাস্ত্রমতে, তিন অবতারের আবির্ভাবকাল ত্রেতাযুগে যুগাবতার রামচন্দ্র তার স্ত্রী সীতাকে উদ্ধার করতে দেবী দুর্গার অকালবোধন করেন। ব্রহ্মার নির্দেশ অনুযায়ী দুর্গার সাহায্যে লঙ্কার শিরোমণি রাবণকে বধ করে সীতাকে উদ্ধার করেন তিনি। দেবীর সেই আগমনের সময়ই দুর্গোৎসব। আর রামচন্দ্র শরৎকালে দেবীকে আবাহন করেছিলেন বলে এটা শারদীয় দুর্গাপূজা নামেও পরিচিত। আর মর্ত্যলোকে আসতে পঞ্চমীতে দেবীর সেই ঘুম ভাঙানোকে বলা হয় অকালবোধন। গত পয়লা অক্টোবর মহাষষ্ঠী পূজার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া পাঁচ দিনব্যাপী শারদীয় দুর্গোৎসবের পর্দা নামবে আগামীকাল বুধবার বিজয়া দশমীতে প্রতিমা নিরঞ্জনে। একটি বছরের জন্য ‘দুর্গতিনাশিনী’ দেবী ফিরে যাবেন কৈলাসের দেবালয়ে। দেবী দুর্গার এবার মর্ত্যলোকে আগমন হয়েছে গজে অর্থাৎ হাতিতে চড়ে। এর ফল শস্যপূর্ণ বসুন্ধরা। আর গমন করবেন নৌকায় চেপে। যার ফলশ্রুতিতে শস্য ও জল বৃদ্ধির যোগ রয়েছে বলে মনে করা হয়।