মাতারবাড়ি কয়লাবিদ্যুৎ থেকে সরে দ্বিতীয় পদ্মাসেতুতে আগ্রহী জাপান

31

পূর্বদেশ ডেস্ক

মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় পর্যায়ে অর্থায়ন করবে না বলে জানালেও দ্বিতীয় পদ্মাসেতু নির্মাণে সহযোগিতা করার কথা জানিয়েছে জাপান। গতকাল বুধবার জাপানের পররাষ্ট্র সচিব হিকারিকো ওয়ান এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় পর্যায়ে অর্থায়ন করবে না জাপান। অন্যদিকে বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকো বলেছেন, জাপান দ্বিতীয় পদ্মাসেতু নির্মাণে বাংলাদেশ সরকারের চলমান প্রচেষ্টায় অংশগ্রহণের সুযোগ নিতে আগ্রহী।
জানা গেছে, গত বছর জুনে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে নতুন করে অর্থায়ন না করার ঘোষণা দেয় জাপান সরকার। বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পটির অর্থায়ন বাতিল করেছে দেশটি। হিকারিকো ওয়ান বলেন, মাতারবাড়ি আল্ট্রা ক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় পর্যায়ের জন্য নির্ধারিত ওডিএ ঋণ বাতিল করা হয়েছে। মূলত এ প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কথা ছিল। তবে আমরা বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি মাতারবাড়ি এলাকার উন্নয়নেও সহযোগিতা অব্যাহত রাখব।
গত বছর জুন মাসে ইংল্যান্ডের কার্নওয়ালে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে জাপান সরকার ঘোষণা দেয়, বিদেশি যেসব কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কার্বন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি সেগুলোর অর্থায়ন বাতিল করা হবে। তবে যেসব প্রকল্প এরই মধ্যে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে সেগুলোর কোনোটির অর্থায়ন বাতিল হলে তা ওই ঘোষণার আওতায় পড়বে না।
এর আগে গত ২০ মার্চ মহেশখালীর মাতারবাড়িতে নির্মাণাধীণ এক হাজার ২০০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি আরেকটি তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র করার যে আলোচনা রয়েছে, তাতে থাকবে বলে ঘোষণা দেয় প্রকল্পের অন্যতম ঠিকাদার সুমিতোমো করপোরেশন।
জাপানের অন্যতম বৃহৎ এই কোম্পানি ২০৫০ সালের মধ্যে ‘কার্বন নিউট্রালিটি’ অর্জনে ধাপে ধাপে কয়লানির্ভর প্রকল্প থেকে সরে আসার পরিকল্পনা নিয়েছে। এর অংশ হিসেবেই মাতারবাড়ির সম্ভাব্য দ্বিতীয় প্রকল্পে তারা না থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে ইনস্টিটিউট অব এনার্জি ইকোনমি অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ) জানিয়েছে।
তবে মাতারবাড়ি প্রকল্প সংশ্লিষ্ট এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, দ্বিতীয় প্রকল্পের কাজের কিছুই এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
অন্যদিকে দ্বিতীয় পদ্মাসেতু নির্মাণ প্রসঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকো বলেছেন, জাপান দ্বিতীয় পদ্মাসেতু নির্মাণে বাংলাদেশ সরকারের চলমান প্রচেষ্টায় অংশগ্রহণের সুযোগ নিতে আগ্রহী।
গতকাল বুধবার রাজধানীতে নিজ বাসায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে রাষ্ট্রদূত বলেন, আমি নিশ্চিত যে এক সময় দ্বিতীয় পদ্মাসেতু বাস্তবায়িত হবে। জাপান সরকার ও জাইকা এই সরকারের নির্মাণপ্রচেষ্টায় অংশগ্রহণের সম্ভাবনা বিবেচনার অবস্থানে থাকবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে জাপান সরকারের অবস্থান হচ্ছে বাংলাদেশ সরকারের দ্বিতীয় পদ্মাসেতু নির্মাণে আমাদের সহযোগিতা প্রস্তাবের সুযোগ নেব। আমি নিশ্চিত যে পদ্মাসেতু অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও সফল হবে। সুতরাং দ্বিতীয় পদ্মাসেতু হবে একটি বাস্তবতা।
ইতো বলেন, এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশে মানসম্মত অবকাঠামো নির্মাণকাজে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা থাকলে টোকিও ভালো প্রযুক্তি দিতে প্রস্তুত আছে। জাপান এ পর্যন্ত সারা বাংলাদেশে ছোট-বড় ১৩৪টি সেতু নির্মাণে সহযোগিতা করেছে।
পদ্মাসেতুর নির্মাণকাজ শেষ হওয়ায় বাংলাদেশ সরকার ও জনগণকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, এই পদ্মাসেতু বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় একটি চমৎকার মাইলফলক। এটি বাংলাদেশের নিজস্ব উদ্যোগ ও অর্থায়নে নির্মাণ শেষ হয়েছে।
পদ্মাসেতুুকে দেশের স্বপ্ন ও গর্ব হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য কী করতে পারে এটি তার বড় প্রমাণ। এটি বাংলাদেশের সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধি ও আকাক্সক্ষা পূরণ করবে।
রাষ্ট্রদূত বলেন, এ মাসে পদ্মাসেতু এবং এ বছরের শেষ নাগাদ মেট্রোরেলসহ বিভিন্ন মানসম্মত অবকাঠামো উদ্বোধনের নজির সৃষ্টির মাধ্যমে ২০২২ সাল বাংলাদেশের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে। জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) পদ্মাসেতুর প্রাথমিক সম্ভাব্যতা যাচাই এবং রূপসাসেতু নির্মাণ করেছে।
তিনি বলেন, এটি সন্তোষজনক বিষয় যে, জাপান একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় পদ্মাসেতু প্রকল্পের অংশ হতে পেরেছিল। এটা দুর্ভাগ্যজনক যে, জাইকা পদ্মাসেতুতে অর্থায়নের অংশ হতে পারেনি, যদিও এতে জাপান সরকারের আগ্রহ ছিল।
পদ্মাসেতু নির্মাণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশংসা করে তিনি বলেন, এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত, বাংলাদেশ নিজে থেকে কতটা করতে সক্ষম।
তিনি বলেন, জাপান রূপকল্প-২০৪১ এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের উন্নয়নের যাত্রায় পাশে থাকবে।
রাষ্ট্রদূত বলেন, জাপান একটি শিল্প করিডোর নির্মাণের জন্য বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট উদ্যোগের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজারে কয়েকটি মেগা প্রকল্পের ওপর দৃষ্টি দিচ্ছে।