মাঠের নেতাদের নিয়ে মাঠে দাঁড়াতে চায় বিএনপি

21

এমএ হোসাইন

মাঠে পুরোদমে সক্রিয় হয়ে ‘বৃহত্তর’ আন্দোলনের দিকে যাচ্ছে বিএনপি। জাতীয় নির্বাচনের আগে তৃণমূল নেতা-কর্মীদের সাথে নিয়ে রাজনীতির মাঠে শক্ত অবস্থান নিতে চায় দলটি। তৃণমূলের মনোভাবের ভিত্তিতেই বিএনপি ঠিক করতে চায় আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি। তাই রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং আন্দোলন জমাতে কী করণীয় সে বিষয়গুলো নিয়ে দলটির নীতি নির্ধারকরা তৃণমূলের মতামত নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। বিএনপির একাধিক দায়িত্বশীল নেতার সাথে কথা বলে জানা যায়, আপাতত নির্বাচন নয়, একটি বৃহত্তর আন্দোলনের চিন্তা করছে বিএনপি। শেখ হাসিনা সরকারের অধীনে আর কোন নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিবে না, এটা অনেকটা পরিষ্কার। এ সময়ে এসে আওয়ামী লীগ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিলেও বিএনপি সে প্রস্তুতির দিকে যাবে না। নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের দাবিতে আন্দোলনমুখি হবে বিএনপি।
আন্দোলনের আগে মাঠের নেতাকর্মীদের মনোভাব দেখতে চায় দলটি। মাঠের চিত্র বিশ্লেষণ করার পর আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি ঠিক করতে চায় বিএনপি। রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, আন্দোলনের কৌশল, তৃণমূলের মতামত এবং তৃণমূলকে সম্পৃক্ত করেই পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের তৃণমূল পর্যায়ে কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুুবের রহমান শামীম বলেন, এ সরকারের অধীনে আর কোন নির্বাচনে বিএনপি যাবে না। নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলনে যাবে। আমাদের নেতাকর্মীরা সবাই আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত আছেন। সভাগুলোতেও নেতাকর্মীরা বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলার ব্যাপারে সোচ্চার প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। মূল কথা হচ্ছে, এ ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটিয়ে নিরপেক্ষ তত্ত¡াবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের আন্দোলনে যাবে বিএনপি। তিনি বলেন, মহানগর বিএনপির থানা পর্যায়ে এখন যেটা হচ্ছে সেটা সাংগঠনিকসভা, কর্মীসভা বা মতবিনিময় সভা। সাংগঠনিক গতিশীলতা আনতে এসব সভা করা হচ্ছে। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবর স্থানান্তর নিয়ে সরকারি দলের শীর্ষ নেতাদের সমালোচনা এবং এ নিয়ে বিএনপির প্রতিবাদে রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত ছিল কয়েকটা দিন।
জিয়ার কবর নিয়ে কোন সিদ্ধান্ত না আসতেই চট্টগ্রামের পুরাতন সার্কিট হাউস (জিয়া স্মৃতি জাদুঘর) থেকে জিয়ার নাম ও স্বাধীনতার ঘোষণার বেতারযন্ত্রটি সরিয়ে নেয়া প্রসঙ্গ আসে। এর বিরুদ্ধে বিএনপি প্রতিবাদ জানালেও শক্ত কোন কর্মসূচি ছিল না।
সরকারি দলের আলোচনা-সমালোচনাকে আড়াল করে বিএনপি এ সময়ে তৃণমূলে মনোনিবেশ করে। দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর পর চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি গত ৮ সেপ্টেম্বর ১৫ থানা ও ৪৩ ওয়ার্ডের নেতৃবৃন্দের সাথে মতবিনিময় সভা করে। ওইদিনই একমাসের মধ্যে ১৫ থানা কমিটি গঠনে কর্মীসভার তারিখ নির্ধারণ করে। দ্রুত সম্মেলনের মাধ্যমে নগর কমিটি পুনর্গঠনের কথা জানানো হয়।
গত শনিবার থেকে একদিন অন্তর অন্তর থানা কমিটিগুলোর সাথে আলোচনা সভা করা হচ্ছে। সেখানে আলোচনা হচ্ছে, নেতাকর্মীদের মনোভাব বোঝার চেষ্টা হচ্ছে। একই সাথে জানিয়ে দেয়া হচ্ছে কেন্দ্রীয় নির্দেশনাও।
মহানগর বিএনপির আহব্বায়ক ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, তৃণমূলের চাওয়া নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন এবং খালেদা জিয়ার মুক্তি। ম্যাডাম জনসম্মুখে এসে কথা বলতে পারছেন না, সেটা তৃণমূলের কর্মীরা সহ্য করতে পারছেন না। সরকার নির্বাচন নির্বাচন করছে কেন, সেটা বুঝতে পারছি না। আমরা বারবারই বলে আসছি, অবৈধ সরকার। ভোটবিহীন সরকার এখন কি নির্বাচন দিতে চায়? কোন চাপে পড়ে সরকার এগুলো বলছে কিনা কি জানি। নিরপেক্ষ তত্ত¡াবধায়ক সরকার বা কমিশনের অধীনে নির্বাচন ছাড়া কোন নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিবে না। আন্দোলন বলতে ৬৪ জেলায় সমাবেশ কর্মসূচির মতো কিছু হতে পারে। গণতান্ত্রিক কর্মসূচি হবে। এগুলো কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে হবে। কেন্দ্র থেকে যে কর্মসূচি আসবে, তা বাস্তবায়ন করা হবে।
মহানগর বিএনপি ১৫ থানা কমিটি পুনর্গঠনের একমাসের সময় নির্ধারণ করে মাঠে নেমেছে। একই সময়ে তৃণমূলকে শক্তিশালী করতে মাঠে নামে যুবদল। যুবদলের কেন্দ্রীয় স্পেশাল টিমের মাধ্যমে দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রতিটি ইউনিয়নের নেতাদের তথ্য সংগ্রহ অভিযান শুরু করা হয়। চন্দনাইশ উপজেলা, দোহাজারী পৌরসভা, সাতকানিয়া উপজেলা ও লোহাগাড়া উপজেলায় করা হয় কর্মী সমাবেশ। কিছুদিনের মধ্যে দক্ষিণ চট্টগ্রামের সবগুলো উপজেলা ও পৌরসভাসহ ইউনিয়ন কমিটি গঠনের প্রস্তুতি রয়েছে যুবদলের।
সাবেক মন্ত্রী ও বিএনপি নেতা জাফরুল ইসলাম ইসলাম চৌধুরী বলেন, আমাদের কর্মসূচি চলছে। কয়েদিন আগেও মিটিং করেছি, বিপ্লব উদ্যানে ফুল দিয়েছি। দল থেকে নির্দেশনা দিলে কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে। এলাকায় যাচ্ছি, আলোচনা হচ্ছে, মানুষের সুখ-দুঃখের অংশ হিসাবে থাকছি। প্রতিদিনই আমাদের আন্দোলনের মধ্যে যাচ্ছে, সেটা তো আপনারাই দেখছেন। দলের নীতি নির্ধারণী পর্যায় আছে, আমি নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের মানুষ নই। দলের কর্যক্রম কী হবে, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলন কেমন হবে, কীভাবে মোকাবেলা করা হবে- এসব নীতি নির্ধারণী পর্যায় থেকে ঠিক করা হবে।
উল্লেখ্য, গত ৯ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে দলের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নেতা-কর্মীদের আগামী সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে বলেন। ওই সভার পর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও বিএনপিকে এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি না করে নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দেন। নির্বাচন ঘিরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় থাকতে এক লাখ অনলাইন অ্যাকটিভিস্টের সমন্বয়ে একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরির কাজ শুরু করছে আওয়ামী লীগ। ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের বিভিন্ন বক্তব্য ও কার্যক্রমে রাজনীতিতে হঠাৎ করেই নির্বাচনী আলোচনা শুরু হয়েছে। করোনা পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসায় রাজনৈতিক দলগুলোও নানা কর্মসূচি নিচ্ছে।
অন্যদিকে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক কর্মকৌশল ঠিক করার লক্ষ্যে নেতাদের মতামত জানতে ধারাবাহিক বৈঠক শুরু করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গতকাল মঙ্গলবার বিকাল ৪টায় গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে তিনদিনের এ সভা শুরু হয়। প্রথম দিনে দলের ভাইস চেয়ারম্যান এবং দলীয় চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের সাথে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি সভায় যুক্ত হন তারেক।
এতে বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপির কী করা উচিত, আন্দোলনের কর্মকৌশল কী হওয়া উচিত, মাঠ পর্য়ায়ের সংগঠনকে আরও সক্রিয় করতে কী করা প্রয়োজন ইত্যাদি বিষয়ে বৈঠকে নেতাদের মতামত নেন বলে জানানো হয় বিএনপির পক্ষ থেকে।