মাটির উর্বরতা বিনষ্টি, স্বাস্থ্যহানি এবং পরিবেশের ক্ষতি বিবেচনায় তামাক চাষে নিরুৎসাহিত করা জরুরি

25

 

আদিকাল থেকে তামাক এদেশের কৃষকদের অন্যতম ফসল হিসেবে বিবেচিত ছিল। কৃষক-শ্রমিক একসময় আমরা তামাকের চোঁড়া, (হাতে তৈরি তামাকের বিড়ি) হুক্কা, ডাবা, সিগারেট পান করতে দেখেছি। তামাককে শুকিয়ে গুঁড়া করে বিড়ি তৈরি করেও কৃষক শ্রমিক জনতা পান করতো। মানুষ ধীরে ধীরে সভ্য হওয়ার পথে যাত্রা শুরু করে। সাথে সাথে ধূমপানের জন্য বিড়ি, সিগারেট তৈরির কারখানা দেশে বৃদ্ধি পায়। ফলে চাষারা, শ্রমিকরা এবং সাধারণ মানুষেরা ধূমপানের নানা রকম নিম্ন-মধ্য ও উন্নতমানের সিগারেট, বিড়ি দোকানে, বাজারে সহজেই পেয়ে যায়। সহজলভ্য ধূমপানের নানা সংস্করণ পেয়ে মানুষ ধীরে ধীরে ধূমাপানের প্রতি অধিক পরিমাণে আসক্ত হয়ে পাড়ে। একসময় ধূমপানের কারণে দেশের অধিক সংখ্যক নারী পুরুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে ছিল। দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতির ফলে গণস্বাস্থ্য ধূমপানের কারণে মারাত্মক হুমকির মধ্যে পড়েছিল। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ধূমপায়ী মানুষকে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর অভ্যাস পরিত্যাগে সচেতনতার উদ্যোগ গ্রহণ করে।
সরকারি বেসরকারি সংস্থা ধূমপান বিরোধী নানা স্লোগানের মাধ্যমে জনগণকে সচেতন করার উদ্যোগ অনেকখানি ফলপ্রসূ হয়। ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, ‘ধূমপানে বিষপান’, ধূমপানের কারণে শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা হয়; ধূমপান ক্যান্সারের অন্যতম কারণ ইত্যাদি সেøাগান স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং ধূমপান বিরোধী স্বেচ্ছাসেবি সংগঠনগুলো ব্যাপক ভাবে প্রচার করে জনগণকে সচেতন করে । একসময় ধূমপান বিরোধী সংগঠন ‘আধুনিকের’ আবির্ভাব ঘটে। প্রত্যেক ডাক্তার এক পর্যায়ে রোগীদের ধূমপানের কুফল সম্পর্কে নসিহত করতে থাকে। এমতাবস্থায় সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস আদালতে ধূমপান নিষিদ্ধ করে। প্রকাশ্যে ধূমপান শুধু স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর তা নয়, ধূমপানের কারণে পরিবেশ দূষিত হয়। অধূমপায়ীরাও ধূমপানের কুফল থেকে রক্ষা পায় না। বর্তমানে গণপরিবহনে ধূমপান অনেক খানি বন্ধ হয়ে গেছে। ধূমপান একটি মারাত্মক নেশা; প্রথমে মানব সন্তানেরা ধূমপান দিয়েই নেশার জগতে প্রবেশ করে। এর পর গাঁজা, মদ, ইয়াবা, ফেন্সিডিল, তাড়ি, দোচোয়ানি ইত্যাদি মারাত্মক নেশায় লিপ্ত হয়, সাধারণ হতে উচ্চবিত্ত পর্যন্ত সর্বস্তরের মানুষ। দেশে প্রকাশ্যে ধূমপান কিছুটা নিয়ন্ত্রিত হলেও দেশে ধূমপায়ী মানুষের সংখ্যা নিহাত কম নয়।
সরকার ধূমপান বিরোধী আইনও প্রণয়ন করেছে জাতীয় সংসদে। এর পরও দেশ থেকে ধূমপান বিতাড়িত হয়নি। গ্রামের অধিকাংশ মানুষ এখনো ধূমপান করে। শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে ধূমপান প্রবণতা বেশি।
ধূমপান শুধু দরিদ্র খেটে খাওয়া মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ তা নয়। দেশের মন্ত্রী, সচিব, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সরকারি অফিসার, পুলিশ , আইনজীবী, শিক্ষক, মসজিদের ইমাম, প্যাগোডার ভান্তে, ব্রহ্মাণ-শুদ্র, কাউকে এ তালিকা থেকে বাদ দেয়া যায় না। ধূমপানের মতো স্বাস্থ্য হানিকর অভ্যাস থেকে দেশ কিভাবে নিস্তার পাবে ? সরকার মাদক বিরোধী, ধূমপান বিরোধী নানা কঠোর কর্মসূচি গ্রহণ করে থাকে। কিন্তু মাদক ও ধূমপানের প্রবণতা দেশ হতে উৎখাত করা এখনো সম্ভব হয়নি।
ধূমপান ও মাদক মুক্ত দেশ গঠনের পূর্বশর্ত হলো দেশের বিড়ি-সিগারেট প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলো বন্ধ করে দেয়া। সরকার সিগারেট তৈরির কারখানাগুলো বন্ধ করে দিলে দেশে তামাকের চাষ এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে। দেশের কৃষকরা বর্তমানে তামাকচাষে তেমন আগ্রহী নয়, কিন্তু কৃষকদের লোভ দেখিয়ে, সহজ শর্তে ঋণ দিয়ে, সার-বীজ এবং চাষের নানা উপকরণ সরবরাহ করে লামাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কৃষকদের তামাক চাষে এক প্রকার বাধ্য করছে টোবাকো কোম্পানিরা। তা ছাড়া সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা টোবাকো কোম্পানির নিকট হতে মোটা অংকের উপটোকন গ্রহণের কথা বাজারে চালু রয়েছে। বিদেশ হতে মদ আমদানি, মাদক উৎপাদন এবং মাদক চোরাকারবার বন্ধ না করে মদ বন্ধ করা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি টোবাকো কোম্পানি বন্ধ না করে তামাক চাষও বন্ধ করা সম্ভব নয়।
দেশে নেশা জাতীয় দ্রব্য গ্রহণের বিষয়ে সরকার এবং নেশাবিরোধী সংগঠন যতই প্রচারণা চালু রাখুকনা কেন দেশ হতে ধূমপান , তামাক চাষ, দেশিমদ, বিদেশি মদসহ নেশাজাত দ্রব্য হতে দেশর সম্পূর্ণ জনগোষ্ঠীকে বিরত রাখা যাবে না। আমরা এমনও দেখেছি যে, যারা ধূমপান ও মাদক বিরোধী সভা সমাবেশ, সেমিনার এবং উদ্বুদ্ধকরণ কার্যক্রমে লিপ্ত তারা মুখে বড় বড় বুলি ছেড়ে ক্লান্ত হয়ে নেশা জাতীয় দ্রব্য গ্রহণ করে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে।
দেশে অনৈতিক কর্মকান্ডে সয়লাব চলছে। নৈতিকশিক্ষা এবং নৈতিকতার চর্চা ছাড়া কোন জাতি সুসভ্য হতে পারে না। দুর্নীতি, অনিয়ম, ভন্ডামীর চর্চার মধ্যদিয়ে একটি ধূমপান বিরোধী কিংবা মাদক বিরোধী জাতি গঠন সম্ভব নয়।
দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার প্রতিবেদন হতে জানা যায় লামায় দেড় হাজার একর জমিতে তামাকের চাষ হচ্ছে। তামাকের এচাষের পেছনের উদ্যোক্তাদের নিয়ন্ত্রণ করা একান্ত জরুরি। বিস্তর জমিতে তামাক চাষ শুধু টোবাকো কোম্পানির কাঁচা মালের জোগান দেবে। দেশে ধূমপায়ীদের পরিবশে দূষণের সুযোগ করে দেবে। যে দেড় হাজার একর জমিতে তামাকের চাষ হচ্ছে সেখানে ধানসহ প্রয়োজনীয় ফসলের চাষ করার ব্যবস্থা করা গেলে দেশের বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যের অভাব অনেক খানি কমে যাবে। উৎপাদন হোক দেশে, দেশের মানুষের স্বাস্থ্যের উপকারে, স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর যে কোন উৎপাদন দেশ ও জাতির জন্য শুভ নয়। সুধীজনেরা তামাক চাষসহ সবধরনের অনৈতিক রোজগার বন্ধ করার পক্ষেই সরকার ও সংশ্লিষ্টদের কাছে দাবি রাখে।