মাঘ শুরু হতেই বাড়ছে শীতের দাপট

13

তুষার দেব

ক্যালেন্ডারের পাতায় পৌষ পেরিয়ে মাঘ ঢুকতেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির রেশ কেটে গিয়ে বৈশ্বিক অতিমারী করোনার সংক্রমণের সাথে শীতের দাপটও বাড়তে শুরু করেছে। আজ শনিবার থেকে তাপমাত্রার পারদ ফের নি¤œমুখী হয়ে আরেক দফা শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার আভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। মাঘ মাসের শুরু থেকেই দেশের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে শীত জেঁকে বসার অনুক‚ল পরিবেশ রয়েছে।
এদিকে মৌসুমের সবচেয়ে শীতলতম মাস জানুয়ারিতে শীতের বদলে এবার বিরল শিলাবৃষ্টির দেখা মিলেছে। গত ১২ জানুয়ারি রাতে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের বেশিরভাগ স্থানসহ ময়মনসিংহ, সিলেট, ঢাকা ও খুলনা বিভাগের কিছু স্থানে বজ্রসহ বৃষ্টি হতে দেখা গেছে। সেই সাথে চাপাইনবাবগঞ্জ, জামালপুর ও বগুড়ার কিছু স্থানে ব্যাপক শিলাবৃষ্টির খবর পাওয়া গেছে। জানুয়ারি মাসের এই সময়ে এমন শিলাবৃষ্টির ঘটনা বিরল বলছেন আবহাওয়াবিদরা। অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন স্থানে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির আগেই কয়েকদিন ধরে দিনের তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করেছিল। রাতেও কমে এসেছিল শীতের অনুভূতি। অনেকেই বলছিলেন, পৌষ মাসে দিনের বেলায় এমন গরম তারা আগে দেখেননি।
এ বিষয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তরের মো. আরিফ হোসেন বলেন, এবার হিমালয় থেকে আসা উত্তুরে ঠান্ডা হাওয়ার প্রবাহটা কম থাকায় শীতটাও কম। তবে আজ শনিবার থেকে ফের তাপমাত্রা কমতে থাকবে। খ্রীস্টাব্দের বছরের শুরুতে শৈত্যপ্রবাহ ছিল। কয়েকদিন আগে তা কেটে গেছে। এর মধ্যে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হলো। মেঘ কেটে যাওয়ার সাথে সাথে তাপমাত্রার পারদ নামতে থাকবে। আর তাতে শীতের অনুভ‚তিও বাড়তে থাকবে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণ বলছে, এবারের শীতকাল যথাসময়ে পথচলা শুরু করলেও গোড়া থেকেই ব্যতিক্রমী আচরণ করছে। সদ্যবিদায়ী বছরের নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে হিমেল হাওয়া আর কুয়াশার চাদরে ভর করে শীতকালের যাত্রা শুরু হয়। এ মাসে দেশে অন্যান্য বছরের তুলনায় প্রায় ৮০ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত হয়েছে। ফলে আবহাওয়া ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে শুষ্ক। ডিসেম্বরে ঠিক তার উল্টো চক্র ধরা দিয়েছে। ওই মাসে সারা দেশে গড়পড়তায় ১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। কিন্তু এবার হয়েছে তার চেয়ে পাঁচ গুণেরও বেশি। এই সময়ের মধ্যে শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার কথা ছিল দুই থেকে চারটি। বয়ে গেছে মাত্র একটি। তবে চলতি জানুয়ারি মাসে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ছয় জেলায় শৈত্যপ্রবাহকে সঙ্গী করেই খ্রীস্টাব্দের নতুন বছরের পথচলা শুরু হয়েছে।
হাঁড়কাপানো শীত নামার আসার আভাস দিয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ শাহিনুর ইসলাম বলেন, মূলত সাগরে বেশি নিম্নচাপ তৈরি হওয়ায় সদ্যবিগত ডিসেম্বরে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে। সে কারণে শৈত্যপ্রবাহ ও শীত কম পড়েছে। তবে চলতি জানুয়ারি মাসে নিকট অতীতের মৌসুমগুলোর চেয়ে বেশি শীত পড়তে পারে। চলতি মাসের আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, মাসের মাঝামাঝি সময়ে আরেকটিসহ চলতি মাসে সবমিলিয়ে তিনটি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। এর মধ্যে তীব্র আকারও ধারণ করতে পারে। দেশের বেশির ভাগ এলাকায় কুয়াশার দাপটের সাথে বাতাসে জলীয়বাষ্পের উপস্থিতিও বেড়ে গেছে। যে কারণে বায়ুতে বেশি মাত্রায় অতিক্ষুদ্র বস্তুকণা ভেসে বেড়াতে পারছে। দূষিত ওই বস্তুকণার কারণে বায়ুর মানও দ্রুত খারাপ হচ্ছে।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, সাধারণত ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারিকে (পৌষ ও মাঘ) শীতকাল হিসেবে গণনা করা হয়। এই পুরো সময় দেশের উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্ব দিক থেকে বায়ু প্রবাহিত হয়। অক্টোবর থেকে নভেম্বর মাস বর্ষার শেষ ও শীত শুরুর অন্তর্বর্তীকাল। এ সময় আকাশ বেশি মেঘলা থাকে বলে বাতাসে আর্দ্রতাও বেশি থাকে। সে হিসাবে কিছুটা ঠান্ডা অনুভূত হলেও একে ঠিক শীতকাল বলা যাবে না। এ সময় পুরোপুরি শীত না পড়ার আরেকটি কারণ হলো বায়ুপ্রবাহ স্থির না থাকা। অর্থাৎ এ সময়ে উত্তর-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু আসে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তরফে দেশে এবারের শীত মৌসুমের স্থায়িত্ব ও তীব্রতা নিকট অতীতের কয়েক বছরের তুলনায় তীব্র হতে পারে; যা ডিসেম্বরের শেষার্ধ্ব থেকে শুরু হয়ে মার্চ পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে বলে ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, বিগত ২০১৮ সালের ৮ জানুয়ারি পূর্ববর্তী পঞ্চাশ বছরের ইতিহাসের পাতা পাল্টে দিয়ে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় দেশের সর্বনিম্ন দুই দশমিক ছয় ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করে আবহাওয়া অধিদপ্তর। এখন পর্যন্ত সেটাই দেশের শীত মৌসুমের ইতিহাসে রেকর্ডকৃত সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। এর আগে ১৯৬৮ সালের ৪ ফেব্রæয়ারি সিলেট বিভাগের শ্রীমঙ্গলে দুই দশমিক আট ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল। আবহাওয়াবিদরা সর্বনি¤œ তাপমাত্রা ছয় থেকে আট ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে হলে সেটাকে ‘মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ’ এবং আট ডিগ্রি থেকে ১০ ডিগ্রির মধ্যে হলে তাকে ‘মৃদু শৈত্যপ্রবাহ’ বলেন। আর সর্বনি¤œ তাপমাত্রার পারদ যদি ছয় ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘর পেরিয়ে নিচের দিকে নামলে তাকে ‘তীব্র শৈত্যপ্রবাহ’ বলে বিবেচনা করা হয়ে থাকে।