মাইজভাণ্ডারী শরাফতের প্রতিষ্ঠাতা হযরত গাউছুল আজম সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাÐারী (ক.)

34

শেখ বিবি কাউছার

চট্টগ্রাম বন্দরের সূত্রধরেই আরব বণিকদের আগমন ঘটেছিল এই চট্টগ্রামে। নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সময় বিখ্যাত সাহাবী সাদ বিন আবু ওয়াক্কাস ( রাঃ) সহ আরো তিনজন সাহাবী সর্বপ্রথম চীন যাওয়ার পথে চট্টগ্রাম বন্দরে নেমে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিয়েছিলেন এই অঞ্চলের মানুষের কাছে। বার আউলিয়ার পুণ্যভূমি এবং ইতিহাস ও ঐতিহ্যে ভরপুর এই চট্টগ্রাম আজ সাহাবায়ে ক্বেরাম ও অলি আউলিয়াগণের পদধূলায় হয়েছে ধন্য। এই জন্য চট্টগ্রামকে বলা হয় মদিনাতুল আউলিয়া বা আউলিয়ার শহর। আরব বণিকগণ চট্টগ্রামকে মদিনাতুল আকসার’ তথা সবুজ শহর বলে আখ্যায়িত করতেন। আবার পাহাড়ীরা চট্টগ্রামকে চাতংগং যার অর্থ শান্তির সেরা বলে অভিহিত করে । এই জেলা পাহাড়, পর্বত, দ্বীপ, উপদ্বীপ সমতল ভূমি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। যা আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বদের সাধনার উপযুক্ত স্থানের বৈশিষ্ট্যতা পূর্ণ। সেই চট্টগ্রামের প্রকৃতির লীলা নিকেতন ফটিকছড়ি মাইজভাÐার গ্রামে হযরত মতিউল্লাহর (রহঃ) ঔরষে এবং হযরত খায়েরুন্নিছার (রহঃ) গর্ভে ১৮২৬ সালের ১ লা মাঘ বুধবার হযরত গাউছুল আজম শ্হাসুফি মওলানা সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাÐার ( কঃ) জন্মগ্রহণ করেন।
নবুয়ত যুগের পরিসমাপ্তির পর যখন ধর্ম নিয়ে নানান তর্ক-বিবাদ দেখা দেয় ঠিক সেসময় মানুষের মূল্যবোধ, নৈতিকতা, সংযম, সাধনা,লোভ পরিহার, সহজ সরল পথের সন্ধান দেখানো জন্য এই ধরাধামে আগমন ঘটে অলি-আউলিয়াগণের। তেমনি গাউছুল আজম মাইজভাÐারীর আগমন সকলের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ।
গাউছুল আজম মাইজভাÐারীর এক কালাম পাকে তিনি বলেন “আমি কাবা মোয়াজ্জামা (মক্কা শরীফ) গিয়ে দেখলাম হুজুর রাসূলে করীম রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ছদর (বক্ষ) মোবারক এক অনন্ত দরিয়া। আমি এবং আমার ভাই পিরানে পীর ছাহেব এ দরিয়াতে ডুব দিলাম। দুজনেই দুটি মহা মুকুট গ্রহণ করলাম।” ফটিকছড়ি থানার নানুপুর ইউনিয়নে সাধারণ একটি গ্রাম-মাইজভাÐার। যা উপমহাদেশের অন্যতম অধ্যাত্ম সাধনার মিলনকেন্দ্র “মাইজভাÐার দরবার শরীফ” নামে সুপরিচিত। এটি উপমহাদেশে সুফিবাদ চর্চার প্রধান প্রাণকেন্দ্র (আধ্যাত্মিকতার রাজধানী)। মাইজভাÐার নামক গ্রামে হযরত শাহসুফি মওলানা সৈয়দ আহমদ উল্লাহ (কঃ) নামক সুফি দার্শনিক সম্পূর্ণ নতুন, আধুনিক, সহজ-সরল কর্ম ও সাধনের দর্শন পদ্ধতি নিয়ে আগমন করেন। এই দর্শনে (কাদেরিয়া, চিশতিয়া, নকশবন্দিয়া, মোজাদ্দেদীয়া, সোহরাওয়ার্দী প্রভৃতি) পূর্বের সকল তরিকাকে সমন্বয় করা হয়েছে। এটি বেলায়তে ওজমা অর্থাৎ উন্মুক্ত আধ্যাত্মবাদ দর্শন। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ জাতি,ধর্ম নির্বিশেষে সকলেই এক ছায়ায় এসে মিলিত হয়ে মাইজভাÐারী দর্শন চর্চা করতে পারে। এই তরিকাটি বিশেষভাবে উদারনৈতিক ধর্মচেতনায় বিশ্বাসী এবং অসা¤প্রদায়িক চেতনাকে তুলে ধরে। এ দর্শন সকল প্রকার গোঁড়ামি, অজ্ঞতা এবং অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে কথা বলে। তরিকাটির অন্যতম শিক্ষা হলো ভালো কাজ করা, সংযমী হওয়া, ইবাদতে মনোযোগী হওয়া,ইতিবাচক মনোভাব পোষণ ইত্যাদি। যেহেতু এটি সকল তরিকার নির্যাস ও মূলতত্তে¡র উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত তাই পরবর্তী সকল তরিকাও এই মাইজভাÐারী দর্শনের ভিত্তির উপর গড়ে উঠবে। কেননা গাউছুল আজম সৈয়দ আহমদ উল্লাহ (কঃ) স্বয়ং ঘোষণা দিয়েছেন, “ পৃথিবীর যে কোনো অবস্থানে থেকে যে কোনো ব্যক্তি আমার সাহায্য প্রত্যাশা করবে, আমি তাকে উন্মুক্ত সাহায্য করব। আমার সরকারের এই নীতি হাশর পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।” এবং তিনি আরো বলেন, “ কবুতরের মতো বাছিয়া খাও। হারাম খাইও না, সন্তান সন্ততি লইয়া খোদার প্রশংসা কর ”। তিনি এই তিনটি কালাম পাকের মধ্যে দিয়ে মানুষের সঠিক ও সত্য জীবন দর্শনের সামগ্রিক রূপটি সকলের সামনে তুলে ধরেছেন। সকলে যদি সন্তুষ্টি ও কৃতজ্ঞতায় আল্লাহ পাকের প্রশংসা করতে সমর্থ হয় তবেই আমরা মূল্যবোধ অবক্ষয়ের এই সময়ে সুস্থ,সুন্দর ও পরিশীলিত সমাজ ঘটনে সমর্থ হবো। জাতি, ধর্ম, বর্ণ গোত্র নির্বিশেষে সকলেই গাউছুল আযম মাইজভাÐারীর কালামপাকের অন্তর্গত নির্দেশনা ধারণ করে নিজেদের জীবনে প্রতিফলিত করতে পারলে সমাজ পেতে পারে তার কাক্সিক্ষত শান্তির বার্তা।
মাইজভাÐার দরবার শরীফ হলো বেলায়তের ঐশ্বর্য ভাÐার, আধ্যাত্মিক পরিমন্ডলের কেন্দ্রভূমি ও উপমহাদেশের অন্যতম প্রধান এই অধ্যাত্ম মিলনকেন্দ্র। হযরত কেবলার পূর্বপুরুষ ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে চট্টগ্রামে বসতি স্থাপন করেন। তিনি কলকাতা আলেয়া মাদ্রাসায় পড়াশোনা শেষে যশোরের কাজি হিসেবে যোগ দেন। এক সময় চাকরি ছেড়ে দিয়ে পুনরায় কলকাতা চলে যান এবং সেখানে বড়পির আবদুল কাদের জিলানী (কঃ) এর বংশধর ও খলিফা সৈয়দ আবু শাহামা মুহম্মদ সালেহ আল কাদেরি লাহোরির নিকট এবং পরে সৈয়দ দেলোয়ার আলি পাকবাজ (চিরকুমার) বায়াত গ্রহণ করেন।
মাইজভাÐারী দর্শন হলো ইতিবাচক চিন্তা ও নৈতিক উৎকর্ষতার দর্শন। শুধুমাত্র আচার ধর্ম নিয়ে না থেকে নিজেকে নৈতিকভাবেও পরিশুদ্ধ করতে হবে। তাই মাইজভাÐারী দর্শন অনুসরণ করলে বিশ্বে সা¤প্রদায়িক দ্ব›দ্ব, মারামারি, হানাহানি, হিংসা, বিদ্বেষ, ঘৃণা, জঙ্গিবাদ, উগ্রবাদ থাকতো না। যার ফলে জাগ্রত হতো বিশ্ব ভ্রাতৃত্ববোধ।
আদব, বিনয় ও পবিত্রার জন্য মাইজভাÐার দরবার শরীফ একটি উৎকৃষ্ট স্থান। হযরত শেরে বাংলা ( রহঃ) বলেছেন, কেউ যদি আউলিয়া হওয়ার বাসনা পোষণ করেন তিনি যেন মাইজভাÐার দরবার শরীফে যান। এটি এমন একটি শিক্ষা পদ্ধতি ও দীক্ষা প্রতিষ্ঠান যাকে এক কথায় বলা যায় ‘ ঝঢ়রৎরঃঁধষ এষড়নধষ টহরাবৎংরঃু’। গাউছুল আজম মাইজভাÐারী হলেন ‘ বেলায়তে মোতলাকার অধিকারী যুগ প্রবর্তক অলিউল্লাহ। অসংখ্য কারামতে ভরপুর উনার জীবন এবং গাউছুল আযম মাইজভাÐারী ( কঃ) এর শীর্ষগণ এক একজন আল্লাহর মহান অলি আউলিয়া।
মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি (রঃ) বলেছেন, “শেষ জমানায় বিপদ হইতে রক্ষা পাওয়ার জন্য এই সুফিসাধক, যুগ প্রবর্তক অলিউল্লাহ,আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জিত লোকদের অনুসরণ করা একান্ত দরকার। ”
বর্তমান সময়ে ধর্মের সঠিক ও সুন্দর রূপ না বুঝার কারণে ধর্ম নিয়ে মানুষের মধ্যে গোঁড়ামি তৈরি হচ্ছে , আর তৈরি হচ্ছে মূল্যবোধের অবক্ষয়। প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বয়ং বলে গেছেন, “ ধর্মকে সহজ করার জন্যেই আমি প্রেরিত হয়েছি।” মাইজভাÐারী দর্শনও সেটাই অনুসরণ করে। এটি উদার ও সমন্বয়ধর্মী চর্চা শিক্ষা দেয়। বাংলাদেশের উদ্ভুত একমাত্র ত্বরিকা এই মাইজভাÐারী ত্বরিকা। সকল মানুষের শান্তিপূর্ণ সহঅবস্থানের শিক্ষা দেয় এই ত্বরিকা। সকলকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে ১৯০৬ সালের ১০ মাঘ সোমবার মহান রব্বুল আলামীনের সাথে যাত্রা করেন। উনার ওরশ শরীফ জাতি, ধর্ম, নির্বিশেষে সকলের মিলন কেন্দ্রে পরিণত হয়। মৌওলানা আয়ুব আলী তাঁর রচিত কবিতায় লিখেছেন-

হজ্ব ব্রত নিরাপদ নগরে যেমন।
মাঘের দশে তব দ্বারে মহাসম্মিলন।

মহান ১০ই মাঘ এই দিনে সরকারের কাছে সরকারিভাবে ছুটির ঘোষণা ও গাউছুল আজম শাহসুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ (কঃ) এর নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আবেদন জানাচ্ছি। যাতে উনার শিক্ষা ও দর্শন সকলের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। গাউছুল আজম মাইজভাÐারীর উছিলায় মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে কবুল করুক। আমিন।

লেখক : প্রভাষক, নোয়াপাড়া কলেজ, রাউজান, চট্টগ্রাম