মহিমান্বিত রজনী শবে বরাত

6

মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মাসুম

শবে বরাত কথাটি ফারসি থেকে এসেছে। শব মানে রাত, বরাত মানে মুক্তি; শবে বরাত অর্থ মুক্তির রজনী। ‘শবে বরাত’-এর আরবি হলো ‘লাইলাতুল বারাত’, যা কুরআনুল করীমে বিদ্যমান। হাদীসের ভাষায় যাকে ‘লাইলাতুন নিসফ মিন শাবান’ বা শাবান মাসের মধ্য রজনী বলা হয়। তবে বিশ্ব মুসলমানের কাছে এ রাত ‘শবে বরাত’ নামেই বেশি পরিচিত। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনুল করিমের সূরা দুখানে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘হা-মিম! শপথ! উজ্জ্বল কিতাবের। নিশ্চয়ই আমি তা নাজিল করেছি এক বরকতময় রাতে। নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বরেণ্য মুফাসসির আল্লামা শেখ আহমদ ছাভী, আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ুতি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বর্ণনা করেন, বিশিষ্ট তাবেয়ী হযরত ইকরামা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এবং অন্যান্য তাফসিরকারকদের মতে- ‘আর বরকতময় রাত হল লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান বা শাবানের মধ্য রাত তথা শবে বরাত।’
ইমাম আবু জাফর আত-তাবারি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ‘প্রখ্যাত তাবেয়ি হযরত ইকরামা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু আরো বলেন, মধ্য শাবানের রাত্রিতে বছরের সকল ব্যাপার চূড়ান্ত করা হয়, জীবিত ও মৃতদের তালিকা লেখা হয় এবং হাজিদের তালিকা তৈরি করা হয়। এ তালিকা থেকে পরবর্তীতে একজনও কমবেশি হয় না।’ ইমাম কুরতুবী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ‘এ রাতের ৪টি নাম আছে- লাইলাতুম মুবারাকা, লাইলাতুল বারাআত, লাইলাতুছ্ ছাক, লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান।’ ইমাম বাগাভি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি লিখেন, ‘নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ শবে বরাতের রাতে সকল বিষয়ের চূড়ান্ত ফয়সালা করেন এবং শবে ক্বদরের রাতে তা সংশ্লিষ্ট দায়িত্ববান ফেরেশতাদের কাছে ন্যস্ত করেন।’ (তাফসিরে বাগাভি, খন্ড-৭, পৃ. ২২৮; তাফসিরে জালালাইন, পৃ. ৪১০; তাফসিরে কুরতুবী, খ-১৬, পৃ. ১২৬)
শবে বরাতের ফজিলত ও আমল সম্পর্কে সহিহ হাদিস শরীফেও অনেক বর্ণনা এসেছে। যেমন শুআবুল ঈমানে বর্ণিত হাদীসে উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়শা সিদ্দিকা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাযে দাঁড়ালেন এবং এত দীর্ঘ সিজদা করলেন যে আমার ধারণা হলো, তিনি ইন্তেকাল করেছেন। আমি তাঁর পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি নাড়া দিলাম, তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলি নড়ল; তিনি সিজদা থেকে উঠলেন এবং নামায শেষ করে আমাকে লক্ষ করে বললেন, হে আয়শা! তোমার কী এ আশঙ্কা হয়েছে যে, আল্লাহর রাসূল তোমার হক নষ্ট করবেন? আমি উত্তরে বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনার দীর্ঘ সিজদা দেখে আমার আশঙ্কা হয়েছিল, না জানি আপনি ইন্তেকাল করেছেন? নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কি জানো এটা কোন রাত? আমি বললাম, আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলই ভালো জানেন। তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এটা হলো অর্ধশাবানের রাত; এ রাতে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের প্রতি মনোযোগ দেন; ক্ষমাপ্রার্থীদের ক্ষমা করেন, অনুগ্রহ প্রার্থীদের অনুগ্রহ করেন। আর বিদ্বেষ পোষণকারীদের তাদের অবস্থাতেই ছেড়ে দেন। জামে তিরমিযির বর্ণিত হাদীসে আরো রয়েছে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ রাতে মদিনার কবরস্থান ‘জান্নাতুল বাকি’তে এসে মৃতদের জন্য দোয়া ও ইস্তিগফার করতেন। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বলেছেন, এ রাতে বনী কালবের ভেড়া-বকরির পশমের সংখ্যার পরিমাণের চেয়েও বেশিসংখ্যক গুণাহগারকে আল্লাহ ক্ষমা করে দেন। একদিন প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আম্মাজান আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহাকে জিজ্ঞেস করলেন- হে আয়েশা! শাবান মাসের মধ্য রাতের মর্যাদা ও ফজিলত সম্পর্কে তুমি কি জান? তিনি আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শাবান মাসের মধ্য রাতের মর্যাদা কী?
আল্লাহর হাবিব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তরে বললেন- আগামী এক বছরে কতজন আদম সন্তান ভূমিষ্ঠ হবে এবং কতজন আদম সন্তান মৃত্যুবরণ করবে তা এ রাতে লিপিবদ্ধ করা হয়। আর এ রাতে তাদের আমল মহান আল্লাহ দরবারে উপস্থাপন করা হয় এবং তাদের রিযিক অবতীর্ণ কিংবা নির্ধারণ করা হয়। এ প্রসঙ্গে ইমাম ইবনে মাজাহ রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হযরত আবূ মূসা আশয়ারী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসূলে আরবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- মধ্য শাবানের রাত্রিতে আল্লাহ তায়ালা রহমত নিয়ে আবির্ভূত হন এবং তাঁর সমস্ত বান্দাকে ক্ষমা করে দেন। কিন্তু মুশরিক বা শত্রæতাপোষণকারী ব্যক্তিকে ক্ষমা করেন না। হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘১৪ শাবান দিবাগত রাত যখন আসে, তখন তোমরা এ রাতটি ইবাদত-বন্দেগিতে কাটাও এবং দিনের বেলায় রোযা রাখো; কেননা, এদিন সূর্যাস্তের পর আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার আসমানে রহমত নিয়ে অবতরণ করেন এবং আহবান করেন; কোনো ক্ষমাপ্রার্থী আছ কি? আমি ক্ষমা করব; কোন রিজিকপ্রার্থী আছ কি? আমি রিজিক দেব; আছ কি কোনো বিপদগ্রস্ত? আমি উদ্ধার করব। এভাবে ভোর পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা মানুষের বিভিন্ন প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করে আহবান করতে থাকেন। তবে মুশরিক, হিংসা পোষণকারী, সর্বদা ব্যভিচারকারী, পিতামাতার অবাধ্য, মদপানকারী, হারাম মাল ভক্ষণকারী, ইয়াতিমের সম্পদ আত্মসাৎকারী ক্ষমা পাবে না।’ উক্ত অপরাধীদের উচিত মহিমান্বিত রজনী আসার পূর্বে মহান প্রভূর নিকট বিশুদ্ধ অন্তরে তাওবা করা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের নিকট কায়মনোবাক্যে ক্ষমা চাওয়া।
পবিত্র এই রাতে তাই প্রত্যেক মুমিনের উচিত পরম করুণাময় আল্লাহর অনুগ্রহ লাভের আশায় নফল নামায পড়া, কেরাত ও রুকু-সিজদা দীর্ঘ করা; কোরআন তেলাওয়াত করা; দরুদ শরিফ বেশি পাঠ করা, ইস্তিগফার অধিক পরিমাণে করা; ফজিলতপূর্ণ বিভিন্ন দোয়া, তাসবিহ-তাহলিল ও জিকির-আজকার ইত্যাদি করা। সম্ভব হলে কবর জিয়ারত করা, নিজের জন্য, পিতা-মাতার জন্য, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও সব মুমিন-মুসলমানের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং পরদিন নফল রোজা রাখা। এ রাতে দেশ ও জাতির কল্যাণ ও সমৃদ্ধি কামনা করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। সম্ভব হলে দুস্থ-অভাবগ্রস্তদের মাঝে নানা রকমের খাদ্য বিতরণ করে শ্রেষ্ঠতম আমলকারীর তালিকায় নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করে মহান প্রতিপালকের সন্তুষ্টি কামনা করা।
সম্মানিত অভিভাবকদের উচিত আতশবাজি, পটকা ফোটানো, ইবাদত-বন্দেগি বাদ দিয়ে খামাখা ঘোরাঘুরি করা, অযাচিত আনন্দ-উল্লাস করা, বেহুদা কথাবার্তা ও বেপরোয়া আচরণ করা, অন্য কারও ইবাদতের বা ঘুমের ব্যাঘাত ঘটানোর মত জঘন্য অপরাধ থেকে আপন সন্তানদের বিরত রেখে সুনাগরিকের দায়িত্ব পালন করা।
লেখক: আরবি প্রভাষক, তাজুশ শরীআহ দরসে নিযামী মাদরাসা
খতিব, রাজানগর রাণীরহাট ডিগ্রি কলেজ জামে মসজিদ, রাঙ্গুনিয়া, চট্টগ্রাম