মহান সাধক হযরত আমিরুজ্জমান শাহ্ (র.)

7

 

এদেশে ইসলামের পবিত্র ঈমানী দায়িত্ব নিয়ে ধর্ম প্রচারে উদ্দেশ্যে যে সকল অলি আউলিয়া, সুফী দরবেশ জন্ম গ্রহণ করেছেন তার মধ্যে হযরত আমিরুল আউলিয়া শাহ্ আমিরুজ্জমান (র:) বার আউলিয়ার মধ্যে অন্যতম। একজন অনন্য সফল সমাজ সংস্কারের আদর্শ হবার উজ্জ্বল বৈশিষ্ট সমৃদ্ধ মহান এ অলি আধ্যাত্মিক সাধক ছিলেন। যিনি কঠোর ত্যাগ-তিতিক্কা রেয়াজত ও সাধনার মাধ্যমে ¯্রষ্টার সান্নিধ্য লাভ এবং হযরত গাউছুল আজম সৈয়দ মাওলানা আহমদ উল্লাহ মাইজভাÐারী (ক.) এর অন্যতম প্রধান খলিফার মর্যাদা লাভ করেছিলেন। কথিত আছে যে, তিনি কোন দিন মাইজভাÐার শরীফ থেকে তাঁর মুর্শেদকে পেছনে রেখে বাড়ি ফিরতেন না। ফিরতেন তাঁকে সামনে রেখে পিছু হেঁটে। তাছাড়া জনশ্রæতি আছে যে, তিনিই সর্বপ্রথম মাইজভাÐার শরীফে দপ বাজিয়ে জিকির মাহফিলের সূত্রপাত করেন। সাপ্তাহিক ইশতেহারের বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত এ মহান সাধক সম্পর্কে এক মন্তব্যে তিনি তাঁর কার্যাবলীর মাধ্যমে খোদা প্রেমের যে অনন্য নজিরাদি স্থাপন করেছেন তাঁকে মাইজভাÐারী ত্বরিকতপন্থীদের নিকট তিনি এ তরীকায় বু-আলী কলন্দরের আমলে সমাসীন বলে মন্তব্য করা হয়েছে। হযরত মওলানা আজিজুল হক শেরে বাংলাও (র.) দীওয়ানে আজিজ গ্রন্থে তাঁর মহিমা কীর্তন করেছেন। তাঁর একটি কালাম আছে, সেটি হচ্ছে “হাবিবে রহমান মেরে বাবাজান ছাহেবে সোলতান আমিরুজ্জমান” তা তাঁর শিষ্য ও ভক্ত অনুরক্তরা আজো অত্যন্ত আদরের সাথে পাঠ করেন যা জীবদ্দশায় তিনি নিজেও জপতেন। মওলানা সৈয়দ ফৌজুল আজিম শাহ্ আমিরী কর্তৃক গ্রন্থকারে এবং অধ্যাপক মুহাম্মদ আবু তালেব বেলাল কর্তৃক সম্পাদিত “আদরের কালা সোনা” গ্রন্থে তাঁর অসংখ্যা কারামতের কাহিনী বর্ণনা রয়েছে তার মধ্যে।
১. পটিয়া থেকে আমিরুল আউলিয়া মাইজভাÐার শরীফে তথা পীরের খেদমতে পায়ে হেঁটে আসা-যাওয়া করতেন, হযরত গাউছুল আজম সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাÐারী (ক.) সেদিন হযরত আমিরুল আউলিয়া (ক.) কে বেলায়ত ওজমা প্রদান করে নিজ এলাকায় ত্বরিকত প্রচারের নির্দেশ দেন। সেদিনও তিনি স্বীয় মুর্শীদকে সামনে রেখে পিছু হেঁটে মাইজভাÐার থেকে পটিয়া আসেন।
২. অদৃশ্য থেকে বর্শা নিক্ষেপে ভল্লুকের আক্রমণ থেকে শিষ্যকে রক্ষা জবে হওয়া পশু পূণরায় জীবিত করা।
৩. পুরুষ নারীতে রূপান্তরিত হওয়ার ঘটনা। ৪. পায়খানা হতে আন্টি উত্তোলনের ঘটনা। ৪. বেলায়েত ওজমার প্রভাবে মৌলানা আবদুর রশিদ এর জীবনের গতি পরিবর্তন। ৫. হযরত আমিরুল আউলিয়া (ক.) কে পটিয়া থানায় নিয়ে বুজুর্গীর পরীক্ষা। ৬. হযরত আমিরুল আউলিয়া (ক.)’র ব্যতিক্রম চলা ভক্তগণ (পাগলা দল) ৭. লাঠি দিয়ে মাটিতে আঘাত পূর্বক মৃত শিশুকে জীবন দান। আমিরুল আউলিয়া (ক.)’র ভবিষ্যত বাণীর মধ্যে আরো একটি বা রয়েছে- “অবিরত যাইও পীরের দরবারে সই অন্তরে, প্রেমের তালা খোলা রাখব সপ্তায় একদিন বুধবারে”।
আমিউল আউলিয়া (ক.)’ কে কোন পর্যায়ে বা কি হিসেবে হযরত কেবলা (ক.) জানতেন তা ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। কারণ আমিরুল আউলিয়া (ক.)’ একটি স্ব-লিখিত কালাম উল্লেখ করার উত্তম হবে কালামটি হচ্ছে-
“তুমি সেই, আমি সেই, তুমি আমি এক-
যে পাইবে জ্ঞান আঁখি সে বুঝিবেক।”
তিনি একদিন মজলিশে উপস্থিত মুরিদ ভক্ত অনুরক্তবৃন্দদের সামনে এ কথা বললেন যে, আমি দুনিয়াতে এমন একটা কাজ করে যাচ্ছি যে, যা কেউ করে নাই। আমি জীবদ্দশায় আমার মাজার তৈরি করেছি। আমাকে রাখার জন্য তাবুত (গাছের পাত্র) তৈরি করেছি। সেই তাবুতের পেছনে দিকে দরজার ন্যায় খোলা রেখেছি। যাতে করে এ দরজা দিয়ে কফিন সহজে ঢুকানো যেতে পারে। তাবুতের দক্ষিণ দিকে আয়না লাগিয়েছি যাতে করে আমার অনেক ভক্তবৃন্দ আমাকে যে কোন সময় দেখতে পারে। কোন ভক্তের বাড়ি কিংবা অন্য কোথাও যদি কেউ নিতে চাই, কফিন সহ আমাকে নিতে পারবে। সেই জন্য তাবুতে চাকা লাগানো হয়েছে যা টানলে গাড়ির মত করে চলবে। পথে যদি খাল বা জলাশয় থাকে তাহলে উক্ত তাবুতে দু’পাশের দু’চারটি হুক লাগানো হয়েছে। যাতে কাঁদে করে পার করা যায়। কাজ শেষে পুন:রায় তাবু যথাস্থানে রেখে দিতে পারে। আমার দেহ থেকে যেদিন প্রাণ বের হয়ে যাবে ঐ দিন তাবুতে আমার দেহখানি রাখা হবে। জানাযা শেষে আমাকে আমার ঘরের ছাদের উপর কফিনসহ ছয় মাস রেখে দেবে। যদি তা সম্ভব না হয় তিন মাস রাখবে। অন্যথায় এক মাস। তাও যদি সম্ভব না হয় ছয় দিন রাখবে। এই ঘটনাটি মাইজভাÐারী ত্বরীকতের বিশিষ্ট শিষ্যরা অবশ্যই জানেন এবং না জানার কথা নয়।
আমিরুল আউলিয়া (ক.)’র কষ্ট, সাধনা ও ত্যাগ ছিল বর্ণনা অতীত। তাই তো তিনি তাঁর কালামে নিজকে প্রথমে প্রশ্ন করেন- হীন আমিরুজ্জমান তুমি ওলি (আউলিয়া) হইলা কেন? আবার নিজেই জবাব দিচ্ছেন- এত কঠিনতা তোর পরীক্ষার করণে।
হযরত কেবলা আমিরুল আউলিয়া (ক.)কে বিশেষ ছবক দ্বারা খেলাফত প্রদান করে বিদায় দেওয়ার পর বীনাজুরি খাল দিয়ে মাইজভান্ডারে যাওয়ার জন্য হযরত কেবলা (ক.) সেখানে বাহক সহকারে পালকি প্রেরণ করতেন কেবল (তাঁর) আদরের কালা সোনাকে তাঁর সান্নিধ্যে আনার জন্য। কালা সোনাও এটা ব্যবহার করতেন অতি আদরের সাথে। তিনি কোনদিন ঐ পালকিতে পা তুলে বসেনি। কেবল মুর্শিদের হুকুম পালনার্থে তার দেহের উপরিভাগ পালকিতে রাখতেন এবং নিম্নাঙ্গ পা দু’খানা ঝুলিয়ে রেখে হযরত কেবলার দরবারে যেতেন। ১৯২৭ সালে এই মহান অলি পরলোক গমন করেন। তার জানাজায় নামাজের নির্ধারিত সময়ে লোকজন আমির ভান্ডার হুমাড়িয়া বিলে জমায়েত হল এবং জানাজায় নামাজে ইমামতির প্রস্তুতি সন্ধিক্ষণে বড় মিয়া অর্থাৎ হযরত সৈয়দ সোলাইমান শাহ্ (ক.) স্বীয় আব্বাজানের প্রতি অতি ভক্তির কারণে কাঁপতে কাঁপতে হঠাৎ বেহুশ হয়ে পড়ে গেলেন। অত:পর নামাজের ইমামতি করেন চন্দনাইশের সাতকানিয়া নিবাসী হযরত আমিরুল আউলিয়ার প্রধান খলিফা হযরত মৌলানা আবদুর রশিদ শাহ্ (র.)। আমিরভান্ডার শরীফের নামে প্রতিষ্ঠিত তার স্মৃতিগাহ এদেশের আধ্যত্ম-সাংস্কৃতিক জগতের দ্বিতীয় বৃহত্তম দরবার হিসেবে পরিগণিত লাভ করেছে। প্রতি বৎসর ১লা মাঘ তাঁর এ দরবারে পবিত্র বার্ষিকী ওরশ শরীফ অনুষ্ঠিত হয়। আল্লাহ্তায়ালা আমদেরকে এই আউলিয়া রুহানী ফয়েজ লাভ করার সুযোগ দিন। আমিন।

লেখক : কার্যকরি সভাপতি, পটিয়া প্রেস ক্লাব