মহান বিজয় দিবস আজ

25

তুষার দেব

যে বিজয়ের চেতনা-আবেগ-অনুভূতি তুলনাহীন, বাঙালি জাতির সেই অবিস্মরণীয় ও শ্রেষ্ঠতম বিজয়ের দিন আজ। দীর্ঘ সাড়ে নয় মাসের রক্তস্নাত মুক্তিযুদ্ধ শেষে একাত্তরের ষোলই ডিসেম্বর বিশ্ব মানচিত্রে আজকের এই দিনে স্বাধীন বাঙালি জাতির অভ্যুদয় ঘটেছিল। বীর বাঙালির রক্তে রঞ্জিত সবুজ জমিনে লাল সূর্যখচিত পতাকা উড়েছিল আপন পরিচয়ে-স্বমহিমায়। সেই চিরগৌরব ও অহংকারের দিন আজ। বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম দিনও মহান বিজয় দিবস।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৪৮ সাল থেকে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ‚্যত্থান, একাত্তরের সাতই মার্চে রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণ, ২৫ মার্চে গণহত্যা শুরু হলে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা, ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠন এবং রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ৩০ লাখ শহীদ ও দু’লাখ মা-বোনের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয় মহান স্বাধীনতা। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর পাক সেনাদের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। সেই হিসাবে আজ বিজয়ের ৫১ বছর পূর্তির দিন।
বিজয়ের ৫১ বছর পূর্তিতে তাই বাঙালি জাতি আজ সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করছে মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী লাখো শহীদকে। স্মরণ করছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক নেতাদের। চট্টগ্রামসহ সারা দেশের মানুষ শামিল হচ্ছে বিজয়ের উল্লাসে। বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠের ভাষণ আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসঞ্চারী গানে মুখরিত আকাশ-বাতাস। সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে নামছে জনতার ঢল। সর্বস্তরের জনতা শ্রদ্ধার সঙ্গে শহীদের উদ্দেশ্যে নিবেদন করছে ফুলের অর্ঘ্য। গতকাল বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতের প্রথম প্রহর ১২টা এক মিনিটে চট্টগ্রাম নগরের মিউনিসিপ্যাল মডেল হাই স্কুল চত্বরে বিকল্প শহীদ মিনারে পুস্পার্ঘ্য নিবেদনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে বিজয় দিবসের কর্মসূচি।
অঘ্রানের ঘন কুয়াশার চাদর ভেদ করে পূর্ব দিগন্ত রাঙিয়ে আজকের সূর্যোদয়টি অন্য সব দিনের মত নয়। এ সূর্যোদয় গোটা বাঙালি জাতিকে মনে করিয়ে দিয়েছে অর্ধশতাব্দী আগের দিনটিকে। আজ কোটি প্রাণে জেগেছে আনন্দ-উল্লাস। ঘরে ঘরে আজ উড়ছে বিজয় কেতন। হৃদয়ে স্ফ‚রিত আনন্দ। কোটি প্রাণ আজ উদ্বেলিত। বর্বর পাকিস্তানি বাহিনী একাত্তরের ২৫ মার্চ কালরাতে মারণাস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল নিরস্ত্র বাঙালির ওপর। ‘অপারেশন সার্চলাইট’ দিয়ে শুরু করে নয় মাসে পাকিস্তানি হানাদাররা হত্যা করে ৩০ লাখ বাঙালিকে। লাখ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম কেড়ে নেয়। একই বছরের ১৬ ডিসেম্বর সেই অস্ত্রই পায়ের কাছে নামিয়ে রেখে অপমানের গøানি মাথায় নিয়ে লড়াকু বাঙালির কাছে আত্মসমর্পণ করে পাকিস্তানের ৯৩ হাজারের বিশাল সৈন্য বাহিনী। সেই থেকে ১৬ ডিসেম্বর বাঙালির বিজয় দিবস। দখলদার পাকিস্তানের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বিজয় লাভের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের জন্ম।
স্বাধীনতার ৫১ বছরে এসে আজ পাকিস্তানের তুলনায় অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিকসহ নানা ক্ষেত্রেই অনেকটা এগিয়ে বাংলাদেশ। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে বাংলাদেশের অগ্রগতির স্বীকৃতি আর প্রশংসা আসছে প্রতিনিয়ত। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এমডিজি’র কোনো কোনো এজেন্ডা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ঈর্ষণীয় সাফল্য প্রতিবেশি ভারতসহ অনেক রাষ্ট্রের কাছে অনূকরণীয় হয়েছে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে এমডিজি অর্জন করেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়মিত ছয় শতাংশের ওপরে থাকায় দারিদ্র্যের হার কমাতে ইতিবাচক ভ‚মিকা রেখেছে। ২০১৫ সালে ২৪ দশমিক আট শতাংশে নেমেছে দারিদ্র্যের হার। দারিদ্র্যের হার কমানোর লক্ষ্যমাত্রা ২০১৫ সালে আট শতাংশ ছিল। সেখানে ছয় দশমিক পাঁচ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। যেখানে সহস্রাব্দ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রতিবছর দারিদ্র্যের হার এক দশমিক ২০ শতাংশ হারে কমানোর কথা। সেখানে বাংলাদেশে তা এক দশমিক ৭৪ শতাংশ হারে কমেছে। যে কারণে ২০১৫ সালের আগে ২০১৩ সালেই দারিদ্র্য বিমোচন বা কমানোর লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে।
সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য (এমডিজি) অর্জনের পর একই গতিতে শুরু হয়েছে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অর্জনের কার্যক্রম। আগামি ২০৩০ সালের মধ্যে পৃথিবীকে দারিদ্র্যমুক্ত করার ঘোষণার মধ্য দিয়ে এর যাত্রা শুরু হয়েছে। এসডিজিতে রাখা হয়েছে ১৭টি এজেন্ডা। বিশ্বের দেড়শ’ রাষ্ট্রপ্রধান নিজ নিজ দেশে এসডিজি বাস্তবায়নে অঙ্গীকার করেছেন। এসডিজির প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে আগামি ১৫ বছরের মধ্যে দারিদ্র্যের হার শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনা। এই কর্মপরিকল্পনার সঙ্গে ১৯৩টি দেশ একমত হয়ে কাজ করছে। এসডিজির ১৭টি এজেন্ডা আগামি ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়ন করতে আন্তর্জাতিক কমিউনিটি ও জাতীয় সরকার নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। এসব এজেন্ডা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে বিশ্ব একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তনের দিকে ধাবিত হবে।
বাংলাদেশের অগ্রগতিকে ‘উড়ন্ত সূচনা’র সঙ্গে তুলনা করে আট শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনও যে অসম্ভব নয়, সেই আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু। স্বাধীনতার ৫১ বছরে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে বাঙালি জাতি অসীম সাহসিকতার সাথে পদ্মা সেতুর মত বিশাল অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে নিজস্ব অর্থায়নে। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু রাশিয়া দু’হাত প্রসারিত করেছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত এই ভ‚খন্ড পুনর্গঠনে। আজ সেই রাশিয়াই বাংলাদেশে গড়ে তুলছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট নির্মাণের কাজ পেতে প্রতিযোগিতায় নামে বিশ্ব পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও কানাডার মতো দেশগুলো। গভীর সমুদ্রে বন্দর নির্মাণের কাজ পেতে মরিয়া হয়ে ওঠে বিশ্বের দ্বিতীয় ও তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীন, জাপানসহ নানা দেশ। শূন্য তহবিলে যাত্রা শুরু করা বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ এখন ৩৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে। বিশ্ব দরবারে স্বাধীন জাতি হিসেবে সম্মান বেড়েছে বহুগুণ। অগ্রযাত্রার এই সময়ে এসে ৫১ বছর আগে দেশের জন্য আত্ম উৎসর্গ করা শহীদদের স্মরণ করছে পুরো জাতি।
স্বাধীনতা অর্জনের পথে বন্ধুর পথ পাড়ি দেয়া বাঙালি জাতি বেশ কয়েক বছর ধরে খানিকটা হলেও কলঙ্কমুক্ত পরিবেশে বিজয় দিবস উদ্যাপন করছে। শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও বিচারের রায় কার্যকরের মধ্য দিয়েই জাতি ভিন্ন মেজাজে দিবসটি উদ্যাপনে মেতেছে। বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশি ভারতের সাথে বিলুপ্ত ছিটমহলগুলোতেও সাড়ম্বরে বিজয় দিবস উদ্যাপিত হচ্ছে। সার্বিকভাবে এবারের বিজয়ের আনন্দ বিগত বছরগুলোর তুলনায় আরও গভীর এবং তরতাজা হবে- এটাই স্বাভাবিক।
আজ দেশব্যাপী বিভিন্ন ভবনের ছাদে পতপত করে উড়বে বাংলার লাল-সবুজ জাতীয় পতাকা। বিজয়ের দিনে হাসপাতাল, কারাগার, এতিমখানা, ভবঘুরে কেন্দ্রগুলোতে সকাল থেকে পরিবেশন করা হবে উন্নতমানের খাবার।
আজ শুক্রবার সকাল থেকেই রাজপথে নামবে উল্লসিত মানুষের ঢল। মানুষের এই স্রোত মিলিত হবে শহীদদের স্মৃতিসৌধে। বিনম্র শ্রদ্ধায় দেশের সব শহীদ মিনার ভরিয়ে দেবে ফুলে ফুলে। লাল-সবুজ পতাকা উড়বে আজ বাড়িতে ও গাড়িতে- সব প্রতিষ্ঠানে। মাথায় শোভা পাবে পতাকার রঙে রাঙানো ফিতা। পতাকার রঙের পোশাকও থাকবে বিজয় উৎসবে শামিল হওয়া অনেকের পরনে।
আজ সরকারি ছুটি। গত বুধবার রাত থেকেই সরকারি-আধা সরকারি ও স্বায়ত্বশাসিত সব গুরুত্বপূর্ণ ভবনে করা হয়েছে আলোকসজ্জা। দেশের অব্যাহত শান্তিÍ, সমৃদ্ধি ও অগ্রগতি কামনা করে মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডায় বিশেষ দোয়া-মোনাজাত ও প্রার্থনা করা হবে।

বিজয় দিবসে বিভিন্ন সংস্থার কর্মসূচি
মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলা পরিষদ : মুক্তিযুদ্ধের বিজয়মেলা পরিষদ বিজয় দিবসে বিজয় র‌্যালি, আলোচনা সভা ও মুক্তিযোদ্ধা সংবর্ধনার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এম এ আজিজ স্টেডিয়াম সংলগ্ন জিমনেসিয়াম চত্বরের বিজয়মঞ্চ থেকে আজ শুক্রবার সকাল দশটায় বের করা হবে বিজয় র‌্যালি। শিক্ষা উপমন্ত্রী ও বিজয়মেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বিজয় র‌্যালির নেতৃত্ব দেবেন। বিকালে বিজয়মঞ্চে বিজয় দিবসের আলোচনা সভা ও মুক্তিযোদ্ধা সংবর্ধনায় প্রধান অতিথি থাকবেন সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এমপি। বিশেষ অতিথি থাকবেন ভারতীয় সহকারী হাই কমিশনার ড. রাজীব রঞ্জন এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মাহফুজুর রহমান।
জেলা প্রশাসন : জেলা প্রশাসনের বিজয় দিবসের মূল কর্মসূচি শুরু হবে আজ শুক্রবার সূর্যোদয়ের সাথে সাথে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে ৫০ বার তোপধ্বনির মধ্যদিয়ে। একই সময়ে মিউনিসিপ্যাল মডেল হাই স্কুল চত্বরে বিকল্প শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হবে। সকল সরকারি, আধা-সরকারি, বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। সকাল আটটায় নগরীর এমএ আাজিজ স্টেডিয়ামে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। এসময় বাংলাদেশ পুলিশ, আনসার-ভিডিপি, বিএনসিসি, ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স, কারারক্ষী, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ স্কাউট, গার্লস গাইড এবং শিশু-কিশোর সংগঠন কর্তৃক বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ প্রদর্শন করা হবে। বিভাগীয় কমিশনার মো. আশরাফ উদ্দিন আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও কুচকাওয়াজে অভিবাদন গ্রহণ করবেন। একই দিনে বেলা সাড়ে ১১ টায় জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনা দেয়া হবে। সিনেমা হলসমূহে বিনা টিকিটে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র প্রদর্শনী এবং উন্মুক্ত স্থানে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রামাণ্য চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা হবে। সন্ধ্যা ছ’টায় শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে ‘জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ ও ডিজিটাল প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার’ শীর্ষক আলোচনা ও সিম্পোজিয়াম এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এসব অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার কথা রয়েছে।