মহানবী (দ.)’র প্রেমে অসাধারণ ঘটনা

9

ড. মুহম্মদ মাসুম চৌধুরী

এক.
ফারসি ভাষা সুমিষ্ট। সাহিত্য চর্চার জন্য উপযোগী ভাষা। রাসুল (দ.)এর প্রেমিক মোল্লা আবদুর রহমান জামী মহানবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভালবাসার টানে রচনা করেন একটি অসাধারণ কবিতা। কবিতাটি শব্দ, ভাষা, বিষয়বস্তুর দিক হতে অপূর্ব। ফারসি ভাষা রচিত আল্লাহর প্রিয় হাবীবের মহত্ত¡ সৌন্দর্য উদারতা এবং সকল চারিত্রিক গুণাবলী কাব্যময়তায় আকর্ষণীয় করে তুলেছিলেন।
৮৭৭ হিজরী সনে মোল্লা জামী কবিতাটি নিয়ে পবিত্র মক্কা নগরী হাজির হয়ে হজে¦র সকল কর্ম সম্পাদন করেন। অতঃপর মদিনা শরীফে হুজুরে আকরমের রওজা পাকের সামনে দাঁড়িয়ে কবিতাটি প্রাণের ভালোবাসায় আবৃত্তির করতে সিদ্ধান্ত নিলেন। তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে তিনি মদিনার দিকে যখন যাত্রা শুরু করলেন তখনই তৎকালীন মক্কা শরীফের শাসক স্বপ্ন দেখেন প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে। তাঁকে নবীজী বললেন, যে কোন উপায়ে আবদুর রহমান জামীকে মদিনা শরীফে প্রবেশ করতে দিও না।
মক্কার শাসক লোক নিয়োগ করলেন আল্লাহ জামী (রহ.)কে খুঁজে বের করতে এবং বলা হলো তাঁকে খুঁজে পেলে মদিনায় যেতে বাধা দাও। শাসকের নির্দেশে তাঁকে খোঁজতে থাকলো। অনেক খোঁজার পর তাঁরা আল্লাহ জামী (রহ.)কে পেয়েগেল। মক্কার শাসনকর্তার নির্দেশের কথা তাঁকে অবহিত করা হলো। এ নির্দেশ শুনে তিনি গভীর চিন্তামগ্ন হলো। ভাবতে লাগলো তাহলে কি আমার জীবনের পরম ইচ্ছা কি পূরণ হবে না ? আমার স্বপ্ন কি স্বাপ্নিক হয়ে উঠে যাবে। এমন কী অপরাধ আমি করেছি যার কারণে মক্কায় শাসক আমাকে মদিনা শরীফে যেতে বারণ করবে। কোন অপরাধের কথা মনে না পড়ায় তিনি লোকদের কাছে জানতে চাইলো কেন আমার উপর এমন নিষেধাজ্ঞা।
তারা বললো, আমার উপর নির্দেশ প্রদান করা হয়ে কিন্তু এর কারণ বলা হয়নি। আমরা শাসকের নির্দেশ পালন করছি মাত্র।
আল্লামা জামী (রহ.) বললেন, আমি আপনাদের শাসকের নির্দেশ পালন করতে চেষ্টা করব। আপনারা চলে যেতে পারেন।
প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রেমে দেওয়ানা আল্লামা জামী (রহ.) গভীর চিন্তার সাগরে পড়ে গেলেন, কী করা যায়। কোন কিছুই যেন মাথায় আসছে না। তিনি অস্থির হয়ে গেলেন। মনে বড় দুঃখ বহন করতে থাকেন।, নবীজীর দেশে এসে তাঁর জিয়ারত না করে ফিরে যাবেন ? অনেক চিন্তা-দুঃখের কারণে তাঁর মন খারাপ হতে খারাপতর হতে থাকে।
নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশে ফিরে যেতে চাইলেও মন মানে না। কারণ তাঁর সমগ্র অন্তরজুড়ে নবী (দ.) এর ভালোবাসা টইটুম্বর। যে হযরত জামী (রহ.) নবীজীর প্রেমে জীবন উৎসর্গ করতে পারেন তিনি কী ভাবে মদিনায় গিয়ে রাসুল (দ.)কে সালাম পেশ করতে পারবেন না ? তিনি মত পরিবর্তন করেন। যত কঠোর কঠিন বাধা আসুক সব উপেক্ষা করে তিনি মদিনায় যাবেন। সকল জেল নির্যাতন নিপীড়ন অত্যাচার তিনি ভোগ করবেন কিন্তু নবীজীর সাক্ষাৎ সালাম ত্যাগ করবেন না।
তিনি একাকী গোপন পথে পাহাড়-পর্বত পেরিয়ে মদিনার দিকে যাত্রা আরম্ভ করলেন।
মক্কার শাসককে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবারও স্বপ্নে বললেন, জামি তোমার নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মদিনার দিকে যাত্রা করছেন তাকে কঠোর ভাবে বাধা দাও।
মক্কার শাসক কঠোর হলেন। দুই জন লোক পাঠিয়ে তাঁকে বন্দী করে কারাগারে নিক্ষেপ করেন।
আবারও প্রিয় নবী (দ.) মক্কার শাসককে স্বপ্নে দেখা দিয়ে বললেন, হে মক্কা নগরীর শাসক ! এ কি কাজ করলে ? তোমাকে বাধা দিতে বলেছিলাম তুমি জামীকে জেলে বন্দী করলে কেন ? সে তো অপরাধী নন। তাঁকে অপরাধীর মত জেলে, বন্দী করলে কেন ? মদীনায় আসার পথে তাঁকে বাধা দিলেই হতো।
আল্লাহ জামী (রহ.) আমার প্রেমিক। তাঁর হৃদয় জুড়ে অবস্থান করছে আমার ভালোবাসা। শয়নে স্বপ্ননে সে আমার চিন্তায় মগ্ন থাকে। তিনি আমার শানে এক অসাধারণ কবিতা রচনা করেছেন, যে কবিতাটি প্রতিদিন পাঠ করে কান্না করে। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছে একবিতাটি আমার রওজার পাশে এসে পাঠ করবে। তিনি যদি তা করেন তাহলে কবর হতে আমি হাত বের করে তাঁর সাথে মুসাফাহা করতে হবে। তাই বলেছিলাম, মদিনায় আসতে তাঁকে বাধা দাও। তুমি তো আমার কথা বুঝতে পারোনি বলেই তাঁকে কারাবন্দী করেছো।
নিদ্রা হতে জাগ্রত হয়ে শাসক জেলখানায় গ্রিয়ে হযরত জামী (রহ.) কে মুক্ত করেন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করে তাঁকে বিদায় করেন।
দুই কবি সাহিত্যিক আল্লামা ঈমাম বুসিরী (রহ.) ছিলেন বহু ভাষায় সুপÐিত। তিনি আশেকে রাসুল (দ.)ও কামেল ব্যক্তি হিসেবে জগতে পরিচিত ছিল। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শান মানে অনেক বিতা রচনা করে খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর প্রধান কাব্যগ্রন্থের নাম ‘কসিদায়ে বুরদাহ’। এক সময় কবি অসুস্থ হয়ে অচল অবস্থায় অনেকদিন বিছানায় শায়িত থাকেন। দুনিয়ার অনেক চিকিৎসায় তিনি যখন রেগে মুক্ত হলো না তখন নিয়ত করলেন, আল্লাহর হাবীব মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শানে একটি কবিতা (কামিদা) রচনা করে তার উসিলায় আল্লাহ জাল্লে শানহুর দরবারে রোগমুক্তি কামনা করবেন।
কবিতা রচনা হলো। জুমা রাতে তিনি পবিত্র হয়ে প্রবেশ করেন একটি নির্জন ঘরে। হৃদয়ের ভালোবাসায়, রাসুল (দ.) এর প্রেমে ভক্তি সহকারে পাঠ করলে কবিতাটি। আবৃতি করতে করতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়লেন তিনি।
রাতে তিনি স্বপ্নে দেখলেন, তাঁর পুরো ঘর নুরের আলোয় উদ্ভাসিত। তশরিফ এনেছেন মাহবুবে খোদা হযরত মোহাম্মদ (দ.)। তিনি আনন্দে বিভোর হয়ে নবীজীকে শুনালেন, তাঁর অমর কসিদাখানি। কবিতাটি পাঠ করতে করতে যখন কবিতার শেষাংশ যথা, ‘কত অসুস্থ মানুষ সুস্থ করেছেন আপনার পবিত্র হাতের স্পর্শে’ উচ্চারিত হলো তখন মহানবী হযরত মোহাম্মদ (দ.) নকশা করা নিজের পরা ইয়ামানী চাদরটি নিয়ে তাঁর শরীরটি ঢেকে দিলেন।
ঘুম হতে জাগ্রত হয়ে দেখলেন, নবীজীর পরানো চাদরখানা তাঁর শরীরে জড়িয়ে আছে এবং তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ। তিনি যখন ভোরে বাজারে যাচ্ছিলেন তখন এক কামিল বন্দা তাঁকে বললেন, রাসুল (দ.) এর শানে যে কবিতাটি রচনা করেছিলেন সেটি আমাকে শুনান। তিনি বললেন, আমি অনেক কবিতা রচনা করেছি কোনটি শুনাবো ? কামিল বান্দা বললেন, ‘কাসিদায়ে বুরদা’ নামক কবিতাটি। বিস্মিত হয়ে আল্লামা বুসিরী বললেন, এই কবিতার কথা কেউই জানা না, আপনি জানলেন কী হবে ? তিনি বললেন, গত রাতে নবীজীকে আপনি আবৃতি করো যখন শুনাছিলেন, তখন আমি সেখানে উপস্থিত হয়ে শুনছিলাম। শুধু আমি নই এই কসিদা আল্লাহ তাঁর খাস বান্দাদের নিকট পৌঁছিয়ে দিয়েছে।

লেখক : কলাম লেখক, রাজনীতিক