মহানবী (দ.)’র অসাধারণ জানাজা

23

 

মহানবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর শ্রেষ্ঠ ও সুন্দরতম সৃষ্টি। তাঁর অনুসরণ আল্লাহরই অনুসরণ। তাঁর জীবন মোজেজায় ভরপুর। তাঁর দুনিয়াতে আগমনের সময় যেমন অনেক অলৌকিক ঘটনা সংগঠিত হয়েছে তেমনি বিদায় বেলায়ও ঘটেছে।
হায়াতুন্নবী সাধারণ মানুষের মত মানুষ ছিলেন না। তিনি মহাকালের মহাবিশ্বের শ্রেষ্ঠ নবী (দ.)। তিনি যেমন বর্তমানের কথা বর্ণনা করেছেন তেমিন ভবিষ্যতের কথাও কল্যাণ স্বরূপ বর্ণনা করেছেন।
ইন্তেকালের পরবর্তীতে প্রিয় নবী (দ.)’র গোসল, কাফনের কাপড়, নামাজে জানাজা, দাফন-কাফন ইত্যাদি সম্পর্কে তিনি স্পষ্ট বর্ণনা করে গেছেন।
ইন্তেকালের পূর্বমুহূর্তে বিখ্যাত সাহাবী ইবনে মাসউদ (রা.) রাসুল (দ.)’র নিকট জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসুল্লাহ আপনার ইন্তেকাল কখন হবে ? তিনি বললেন, অতি সন্নিকট। এরপর তাঁর নিকট জানতে চাইলেন, আপনাকে গোসল দেবে কে ? উত্তরে তিনি বললেন, আমার আহলে বাইতের (পরিবার) পুরুষগণ, অতিনিকটবর্তীগণ এবং সাথে থাকবেন অনেক ফেরেস্তা। আবার জানতে চাইলেন, কি ধরনের কাফনের কাপড় দ্বারা আপনাকে আবৃত করা হবে ? তিনি বললেন, আমার ব্যবহৃত কাপড় বা ইয়ামনী কাপড় অথবা মিসরীয় সাদা কাপড় দ্বারা। পুনরায় জানতে চাইলেন কে আপনার জানাজার নামাজ পড়াবেন ? এমন প্রশ্ন শুনে তিনি এবং উপস্থিত সাহাবীরা কাঁদলেন। অতঃপর নবীজী বললেন, বিষয়টি বাদ দাও। তোমরা আমাকে গোসল দিয়ে সুগন্ধি লাগিয়ে কাফন পরাবে অতঃপর রওজার কাছে রেখে অল্পসময়ের জন্য দূরে দাঁড়াবে। এ সময় হযরত জিব্রাইল, মিকাইলন, ইসরাফিল ও আজরাইল একে একে আমার উপর দরুদ পড়বে। এরপর পরিবারের পুরুষ, তারপর মহিলা এবং অন্যান্যরা একে একে দরুদ পাঠ করবে। কান্নাকারী কোন মহিলা যেন আমাকে কষ্ট না দেয়। তোমরা অনুপস্থিত সাহাবীদের কাছে আমার সালাম পৌঁছিয়ে দিও। তোমরা সাক্ষী থেক কেয়ামত পর্যন্ত যারা ইসলামে প্রবেশ করবে এবং আমাকে অনুসরণ করবে আমি তাদেরকে সালাম দিয়ে গেলাম।
প্রিয় নবী (দ.) এর নিকট জানতে চাইলেন, কে রওজা মোবারকে আপনাকে রাখবে ? তিনি বললেন, আমার আহলে বাইত (পরিবার) তারপর আমার কাছের মানুষ এবং সাথে থাকবেন অগণিত ফেরেস্তা। (আল বেয়াদা ওয়ান নেহায়াহ ও বায়হাকী শরীফ)
মহানবী হযরত মোহাম্মদ (দ.) এর নামাজে জানাজা সম্পর্কে অনেক আলোচনা মতভেদ দেখতে পাই। কেউ বলেন তাঁর জানাজা হয়নি, কেউ বলেন আমাদের মত জানাজা হয়েছে। দুটি মতই সঠিক নয়। দোয়া ও ক্ষমার উদ্দেশ্যে জানাজার নামাজ পড়া হয়। নবী পাক (দ.) নিস্পাপ। আমাদের মত পাপ মোছনের জন্য নামাজা পড়লে তাঁর মর্যাদা হয় না। আমাদের নবী মহাবিশ্বের সর্বশেষ্ট নবী (দ.)। তিনি দোজানের ঈমাম। তাঁর নামাজে জানাজায় কি কেউ ঈমামতি করার অধিকার রাখে ? আর ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে অসাধারণ জানাজার নামাজে মেয়েরা অংশ গ্রহণ করতে পারে না। তাই তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে ভিন্নভাবে।
বিখ্যাত সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেছেন, সাহাবীগণ প্রিয় নবী (দ.) এর কবর মোতাবর খনন করতে এক ব্যক্তিকে আবু ওয়াবায়দা (রা.)’র নিকট পাঠারেন যিনি মক্কার বিশেষ পদ্ধতির কবর খনন করতেন। আরেক জনকে পাঠালেন, আবু ত্বালহা (রা.) কে ডেকে আনতে। তিনি মদিনার নিয়মে সিন্ধুকী কবর খনন করতেন। দু’জনকে দু’দিকে প্রেরণ করে সাহাবায়ে কেরামগণ ফরিয়াদ কররেন, ‘হে আল্লাহ তুমি তোমার রাসুলের জন্য একজনকে নির্বাচিত কর। আবু তালহার নিকট প্রেরিত ব্যক্তি তাঁকে পেয়ে গেলেন। তিনিই মদিনার পদ্ধতিতে সিন্ধুকী কবর খনন করেন।
বিখ্যাত সাহাবী হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) ইরশাদ করেছেন, মঙ্গলবার রাসুল (দ.) এর কবর শরীফ খনন সম্পন্ন হয়। তখন তাঁর শরীর মোবারক খাটের উপর রাখা হয়। অতঃপর প্রথমে পুরুষ পরে মহিলা এরপর শিশু কিশোর সাহাবীগণ সালাত আদায়ের জন্য দলে দলে প্রবেশ করে কিন্তু কারো ঈমামতিতে নামাজ হয়নি। (ইবনে মাজাহ শরীফ)
বিখ্যাত হাদিস চেত্তা আবদুল হক মোহাদ্দেস দেহলভী তাঁর রচিত মোদারেজুল নাবুওয়াত গ্রন্থে লিখেছেন, প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ (দ.)ইরশাদ করেছেন, সর্বপ্রথম আমার প্রভুই আমার নামাজে জানাজা পড়াবেন। এরপর ফেরেস্তাগণ।
মাহবুবে খোদা হযরত মোহাম্মদ (দঃ)-এর দেহ মোবারক যখন খাটের উপর রাখা হয় তখন মাওলা আলী (রাঃ) বললেন, কেউ যেন জানাজার নামাজের ঈমামতি না করেন। কারণ তিনি দুনিয়াতে ও পরকালে উভয় মকামে আমাদের ঈমাম (কানজুন উম্মাল) ফেরেস্তার পর প্রিয় নবী (দঃ)’র দলে দলে নামাজে জানাজা আদায় করেন তাঁর পরিবার এরপর সাহাবীগণ এরপর মহিলা সাহাবীগণ। তাঁর নামাজে জানাজায় কেউ ঈমামতি করেননি।
রাহমাতুল্লিল আলামিন হযরত মোহাম্মদ (দঃ) এর ইন্তেকালের পর হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ) ও হযরত ওমর (রাঃ) কিছু আনসার ও মোহাজির সাথে নিয়ে নামাজে জানাজা আদায় করতে নবীজীর ঘরে প্রবেশ করে উচ্চারণ করলেন, “আস্্সালামু আলাইকা আইয়ুহান্নবিউ ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বার ফাতুহু।” সকলে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ালেন। প্রথম সারিতে দাঁড়ালেন হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ) ও হযরত ওমর ফারুক (রাঃ)। তাদের মধ্যে ঈমাম কেউ ছিলেন না। তাঁরা সকলেই চার তাক্্বির উচ্চারণ করেছিলেন। জানাজায় দরুদ ছিল মূল অংশ।
অনেক সাহাবী আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ)’র নিকট জানতে চাইলো, আমরা কি নজীবীর জানাজার নামাজ পড়ব? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তাঁরা প্রশ্ন করলো কীভাবে পড়বো? দলে দলে ঘটে প্রবেশ করে তাকবিরসহকারে পড়।
হযরত আল্লামা ইবনে মাজিশুন (রা.)’র নিকট জানতে চাইলো, প্রিয় নবী (দঃ) এর কতবার জানাজার নামাজ পড়া হয়েছে? উত্তরে তিনি বললেন, আল্লাহ্্ পাক ও তাঁর ফেরেস্তাগণ ছাড়া হযরত হামজা (রাঃ)’র জানাজার মত সত্তরবার পড়া হয়েছে। এই বর্ণনা কোথায় পেলেন জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, হযরত ঈমাম মালেক (রাঃ)’র রচনায় যা তাঁর সিন্ধুকে ছিল। তিনি হযরত নাফে (রাঃ)’র কাছ থেকে শুনেছেন এবং বর্ণনাকারী ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ)।
এ ধরনের বিভিন্ন বর্ণনা হতে জানা গেছে যে, প্রিয় নবী (দ.)’র নামাজে জানাজা ভিন্ন প্রকৃতির ছিল কারণ নবীজীও দিল অদ্বিতীয় অতুলনীয়। (হুফ্্ফাজ মুহাম্মদ ফুরকান চৌধুরী রচিত গ্রন্থ ‘অদ্বিতীয় রাসূল (দঃ) এর অদ্বিতীয় জানাজাহ্্’)।

লেখক : কলাম লেখক, রাজনীতিক