মনোনয়ন নিয়ে তৃণমূলে ক্ষোভ

22

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রামে দ্বিতীয় ধাপে ৯০টি ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনের জন্য আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। এতে অধিকাংশই বিতর্কিত পুরনো চেয়ারম্যান দলীয় মনোনয়ন পাওয়ায় ত্যাগী ও পরিচ্ছন্ন কর্মীদের মাঝে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে বিতর্কিত কেউ মনোনয়ন পেলে সুস্পষ্ট অভিযোগ পাওয়া মাত্রই খতিয়ে দেখে সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এদিকে স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের কারণে তৃণমূলে দুর্নীতি সন্ত্রাসের রাজত্ব বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের।
একক প্রার্থীর নাম ঘোষণার পর গত কয়েকদিন ধরে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীদের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ যাচ্ছে কেন্দ্রে। ইতিমধ্যে তিন শতাধিক অভিযোগ ধানমন্ডিস্থ আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে জমা পড়েছে। ইতোমধ্যে তিন প্রার্থীর মনোনয়ন পরিবর্তন করা হয়েছে। এ ব্যাপারে গতকাল আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধি মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য ও দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক গণমাধ্যমে বলেন, তৃণম‚লের অভিযোগ যাচাই-বাছাই করছেন মনোনয়ন বোর্ডের সদস্যরা। খোঁজ নেওয়া হচ্ছে তৃণম‚ল সংশ্লিষ্টদের। তবে সব অভিযোগের সত্যতা নেই। যারা মনোনয়নবঞ্চিত হয়েছেন তাদের অনেকে মিথ্য অভিযোগ কেন্দ্রে জমা দিচ্ছেন।
প্রসঙ্গত, তৃণম‚লের নেতারা কেন্দ্রে অভিযোগ করে বলেন, তৃণম‚লের দায়িত্বশীল এক শ্রেণির নেতারা অর্থের বিনিময়ে বিএনপি নেতা, রাজাকারের সন্তান-নাতি, বিতর্কিত বিত্তশালীর নাম গোপনে কেন্দ্রে পাঠিয়েছেন। ত্যাগীদের নাম পাঠাননি। এ কারণে বিতর্কিতরা মনোনয়ন পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
গতকাল গণমাধ্যমে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, দ্বিতীয় ধাপে বিতর্কিত কোনো ব্যক্তি মনোনয়ন পেলে সেই বিষয়ে সুস্পষ্ট অভিযোগ পাওয়ামাত্রই আওয়ামী লীগ খতিয়ে দেখছে। প্রয়োজন হলে সংশোধনের উদ্যোগ নিচ্ছি। তিনি আরও বলেন, গঠনতন্ত্র মোতাবেক দলের সব ইউনিয়ন শাখাকে ১৬ অক্টোবর থেকে সভা করে প্রার্থী ঠিক করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আমরা লক্ষ্য করছি, শেষ মুহ‚র্তে রেজল্যুশন (প্রার্থী তালিকা) প্রস্তুত করার কারণে অনেক জায়গায় সাংগঠনিক নীতি অনুসরণ করা হয় না। আবার শেষ মুহূর্তে একসঙ্গে সব রেজল্যুশন নিয়ে কাজ করা একটি দুরূহ বিষয়। এর আগে তিনিই বলেছিলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মনোনয়ন পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন একশ্রেণির মানুষ। এদের মধ্যে সন্ত্রাসী, দুর্নীতিবাজ, দখলবাজ, মাদক কারবারি কিংবা অনুপ্রবেশকারীও আছেন। যারা দলের সুসময়ে জনপ্রতিনিধি হওয়ার মিশনে নেমেছেন। আর এ মিশন বাস্তবায়ন করতে বছরের পর বছর দায়িত্বশীল নেতাদের পেছনে অর্থকড়ি ব্যয় করছেন। সভা-সমাবেশসহ আনুষঙ্গিক ব্যয় বহন করে নেতাকে খুশি করছেন। এমন ‘বিতর্কিতকর্মীর’ টাকার মোহে নেতা যখন আনন্দিত হচ্ছেন, তখনই নীরবে পিষ্ঠ হচ্ছেন দুঃসময়ের ত্যাগী নেতারা। তৃণম‚লের নেতাকর্মীদের এমন হতাশার কথা পৌঁছে গেছে কেন্দ্র পর্যন্ত। তাই আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারবার অনুপ্রবেশকারীদের ঠেকানোর বার্তা দিয়েছেন বলে মন্তব্য করেন ওবায়দুল কাদের।
অন্যদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনগুলোতে দলীয় প্রতীক বরাদ্দ দেওয়ার এই সিদ্ধান্তে দেশের সমাজ ব্যবস্থা এখন ধ্বংসের পথে। দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করার পরিণতিতে সারা দেশে তৃণম‚ল পর্যায়ে রাজনীতিতে কোনও সম্প্রীতি নেই। নিজস্ব সন্ত্রাসী বাহিনী পালনই হচ্ছে রাজনীতির ম‚লমন্ত্র। দলের জন্য, দেশের জন্য রাজনীতি একেবারেই হারিয়ে গেছে। তৃণম‚লে সন্ত্রাস বেড়েছে ২০ গুণ। জনগণের এসব নির্বাচনে কোনও আগ্রহ নেই। দলীয় সন্ত্রাসীরা নিয়ন্ত্রণ করছে স্থানীয় নির্বাচন। ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটির উপচার্য প্রফেসর ড. সিকান্দর খান প‚র্বদেশকে বলেন, ‘নেতারা যে এটা উপলব্ধি করতে পেরেছেন সেটাই ভালো খবর। এটা আরো আগে আমলে নিলে ভালো হতো। টাকা খেয়ে নাম পাঠালে খুব একটা উপকার হয়, তা নয়। তবে যাদের নাম পাঠানো হচ্ছে সেখানে যে খারাপ লোক যাচ্ছে, সেটাতো বোঝা গেলো। এখন উপরের নেতাদের এমন বক্তব্যে খারাপ লোকের নাম পাঠাতে চিন্তা করবেন তৃণম‚লের নেতারা। এক্ষেত্রে ভালো লোকের নাম পাঠালে ভালো লোক জনপ্রতিনিধি হওয়ার সুযোগ থাকবে।’
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান প‚র্বদেশকে বলেন, ‘আমাদের দলের সাধারণ সম্পাদকের মতের সাথে আমি সম্পূর্ণ একমত। আমরা কোনো বিতর্কিত প্রার্থীর নাম পাঠাবো না। গত নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন, নৌকার বিরোধিতা করেছেন- এমন কারো নাম যাবে না। মাদক, সন্ত্রাসী কর্মকান্ড, দখলবাজ, অনুপ্রবেশকারীর অভিযোগ আছে- এমন ব্যক্তিদের নাম পাঠানো হবে না। জনপ্রিয়তা ও ত্যাগের ভিত্তিতেই নাম পাঠাবো। বাকিটুকু কেন্দ্র বিবেচনা করবে।’
চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ আতাউর রহমান প‚র্বদেশকে বলেন, ‘বিভিন্ন স্থানে হয়তো টাকা খেয়ে প্রার্থীর নাম পাঠানোর অভিযোগ থেকেই দলের সাধারণ সম্পাদক এমন কথা বলেছেন। কিন্তু আমাদের নেত্রী সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, দুর্নীতি ও মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। সে দিকটা বিবেচনায় নিয়েই আমরা কোনো বিতর্কিত প্রার্থীর নাম পাঠানোর পক্ষে নই। ইউনিয়ন, উপজেলাসহ কেন্দ্রের অধীনস্থ যারা আছেন, সবারই এটি দায়িত্ব হিসেবে নেয়া উচিত।’