মনে হচ্ছে নগরটা অভিভাবকহীন, সেবা সংস্থাগুলো যে যার মতো

25

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের আলোচনা সভায় বক্তারা বলেছেন, চট্টগ্রামে ফুটপাত আছে, কিন্তু ফুটপাতগুলো বেদখলে। ফুটওভার ব্রিজ আছে, কিন্তু সেগুলো ব্যবহার অনুপযোগী। এভাবেই নাগরিক সুবিধাগুলো হরণ হচ্ছে দিনের পর দিন। এসব নিয়ে সেবা সংস্থাগুলোর কোন মাথা ব্যথা নেই। ফলে দিনের পর দিন মানুষকে অবর্ণনীয় ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে নগরটা অভিভাবকহীন। আমরা চাই, সেবা সংস্থাগুলো আন্তরিক হয়ে সমস্যার সমাধান করবে। নির্মাণ করবে ফুটপাত। দখলমুক্ত করবে বিদ্যমান ফুটপাত। ব্যবহার উপযোগী করা হবে ফুটওভার ব্রিজ।
বক্তারা বলেন, নগরের অধিকাংশ সড়ক খানাখন্দে ভরপুর। সড়কগুলো এখন মড়কে পরিণত হয়েছে। শিশু, রোগী ও বয়োবৃদ্ধের চলাচলে নাভিশ্বাস ওঠে। অবিলম্বে সড়কগুলো মেরামত করা জরুরি।
বক্তারা আরও বলেন, সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নের সাথে সাথে নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। সড়ক দুর্ঘটনাজনিত জীবনহানি এবং শারীরিক ও আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে সড়ক নিরাপত্তায় জনসচেতনতামূলক কর্মসূচির গুরুত্ব অপরিসীম। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিতে পরিবহন মালিক, শ্রমিক, যাত্রী, পথচারী নির্বিশেষে সকলের এ সংক্রান্ত আইন ও বিধিবিধান জানা এবং তা মেনে চলা জরুরি।
বক্তারা বলেন, আইন না মানার একটি প্রবণতা আমাদের মধ্যে গড়ে উঠেছে। ফলে প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনা গড়ছে। কিন্তু আমাদের এই আইন না মানার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। আশা করি, সবার মধ্যেই একটা সচেতনতা, সতর্কতা তৈরি হবে। তখনই আমাদের আজকের দিবস পালনের সার্থকতা আসবে।
জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উদযাপন উপলক্ষে গতকাল শুক্রবার নগরীর একটি রেস্টুরেন্টে ‘গতিসীমা মেনে চলি, সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করি’ শীর্ষক প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) চট্টগ্রাম মহানগর কমিটি আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
নিরাপদ সড়ক চাই নগর কমিটির সভাপতি এস.এম আবু তৈয়ব সভাপতিত্বে ও সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ এনামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সভায় বক্তব্য রাখেন, চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক চৌধুরী ফরিদ, ডায়মন্ড সিমেন্ট লিমিটেডের পরিচালক লায়ন মো. হাকিম আলী, চট্টগ্রাম ডেকোরেশন মালিক সমিতির সভাপতি হাজী মো. শাহাবুদ্দিন, নিরাপদ সড়ক চাই নগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক শফিক আহমেদ সাজীব, সহ-সাধারণ সম্পাদক আরশাদ উর রহমান এরশাদ, সাংবাদিক আরিচ আহমেদ শাহ, মো. মোস্তফা কামাল লিটন, সনত তালুকদার, শহীদুল ইসলাম, রেজাউল করিম রিটন, লায়ন মোহাম্মদ ইব্রাহিম, লায়ন মোহাম্মদ আবদুল মান্নান প্রমুখ।
বিআরটিএ চট্টগ্রামের আয়োজিত সভায়:
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) চট্টগ্রাম বিভাগের উপ-পরিচালক (ইঞ্জি.) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় কারও মৃত্যুবরণ বা পঙ্গুত্ববরণ কখনো আমাদের কাম্য নয়। প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব ও অদক্ষ চালক দ্বারা গাড়ি চালানোর কারণে সড়কে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। নিরাপদ সড়ক উপহার দেয়া আমাদের সকলের দায়িত্ব। এজন্য সারাদেশে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চলে আসছে। আবার যান্ত্রিক ত্রুটিযুক্ত ও ফিটনেসবিহীন অসংখ্য লক্কর-ঝক্কর গাড়িও সড়কে চলাচল করছে। এগুলোর জন্য শুধু গাড়ির চালক এবং হেলপার দায়ী নয়, যিনি গাড়ির মালিক তাকেও এ ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে। গাড়ি নিয়মিত চেকআপ করতে হবে। নিজেরা সচেতন না হলে দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব নয়।
গতকাল শুক্রবার সকাল ১০টায় নগরীর ষোলশহরস্থ এলজিইডি মিলনায়তনে জেলা প্রশাসন ও বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) আয়োজিত জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস-২০২১ এর আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে- ‘গতিসীমা মেনে চলি, সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করি’।
তিনি বলেন, গাড়ি চালকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের জন্য দেশের ২৫টি জেলায় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার কাজ শুরু করেছেন। কয়েকটি জেলায় ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। আশাকরি কিছু দিনের মধ্যে চট্টগ্রামেও আমরা এর সুফল দেখতে পাবো।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সিএমপি’র ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার ছত্রধর ত্রিপুরা বলেন, মোটরযান আইন, ট্রাফিক সাইন ও ট্রাফিক পুলিশের নির্দেশ মেনে গাড়ি চালাতে হবে। মাদক সেবন বা চোখে ঘুম নিয়ে গাড়ি চালানো থেকে বিরত থাকতে হবে। শুধু বড় গাড়ি নয়, মাইক্রোবাস, সিএনজি অটোরিকশা, নছিমন, করিমন ও অন্যান্য গাড়ি চালকদেরকে নিয়োগ দেয়ার আগে তাদেরকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরী।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) আবদুল্লাহ আল-মাসুম বলেন, ছাত্র-ছাত্রী, রাস্তা ব্যবহারকারী, সড়কে দ্রুত গতিতে গাড়ি চালিয়ে কার আগে কে যাবে এ ধরনের মনোভাব পরিহার করতে হবে। গাড়ি-চালক-হেলপারসহ সকলে সচেতন হলে নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। সড়কে শৃঙ্খলা ফিরে আসলে দুর্ঘটনা অনেকটা হ্রাস পাবে। যাদের ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই তাদেরকে প্রশিক্ষণ শেষে লাইসেন্স নিয়ে গাড়ি চালাতে হবে। রাস্তায় অবহেলায় দুর্ঘটনার জন্য যাতে কেউ মারা না যায় সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সকলকে সোচ্চার থাকতে হবে।
সভায় অন্যান্য বক্তারা বলেন, নগরীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে ফুটওভার ব্রিজ থাকলেও এগুলোর তেমন ব্যবহার হয় না। মানুষ গাড়িকে হাত উঁচিয়ে সংকেত দিয়ে দৌড়ে রাস্তা পারাপার হয়। এতে মারাত্মক দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে। এ ধরনের মনমানসিকতা পরিহার করে ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারে সকলকে আন্তরিক ও সচেতন হতে হবে। যাচাই-বাছাই করে ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস প্রদানসহ গ্রাহকদের হয়রানিমুক্ত সেবা দেয়ার জন্য বিআরটিএ’র প্রতি আহব্বান জানান বক্তারা।
বিআরটিএ’র এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ শাহরিয়ার মুক্তারের সভাপতিত্বে, আবৃত্তিকার ফারুক তাহের ও দীপা দাশের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত জাতীয় নিরাপদ সড়কে দিবসের আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন, বিআরটিএ’র এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট একিমিত্র চাকমা, চট্টগ্রাম জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রূপের মহাসচিব মঞ্জুরুল আলম মঞ্জু, সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক অলি আহমদ ও চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন পরিবহন মালিক গ্রুপের সভাপতি বেলায়েত হোসেন বেলাল। স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিআরটিএ চট্টমেট্টো-২ সার্কেলের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জি.) রায়হানা আক্তার উর্থী। নিরাপদ সড়ক দিবসের তাৎপর্য্য তুলে ধরেন বিআরটিএ চট্টগ্রাম জেলা সার্কেলের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জি.) এমডি শাহ আলম। আলোচনা সভায় বিআরটিএ’র বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী, সওজ’র কর্মকর্তা ও বিভিন্ন পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দরা উপস্থিত ছিলেন।
সিএমপির ট্রাফিক বিভাগ :
‘গতি সীমা মেনে চলি, সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করি’- এ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে জাতীয় সড়ক দিবস উপলক্ষে সমগ্র মহানগরীতে সচেতনতামূলক প্রচারণা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার সকালে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
চট্টগ্রাম নগর পুলিশের (সিএমপি) চার ট্রাফিক বিভাগ একযোগে গাড়ির চালক-হেলপার ও সাধারণ পথচারী মাঝে সড়ক দুর্ঘটনারোধে সচেতনতামূলক লিফলেটসহ মাস্ক বিতরণ করে।
এ উপলক্ষে নগরীর জিইসি মোড়ে সকাল সাড়ে ১০টায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থেকে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের সচেতনতামূলক প্রচারণা কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন সিএমপি’র অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) শ্যামল কুমার নাথ। উদ্বোধন শেষে তিনি গাড়ির চালক-হেলপার ও সাধারণ পথচারীদের মাঝে লিফলেট ও মাস্ক বিতরণ করেন।
তিনি নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে ট্রাফিক আইন মেনে চলার উপর গুরুত্বারোপসহ সড়ক দুর্ঘটনার জন্য তিনটি ওভার স্পিড, ওভার লোডিং ও ওভারটেকিংকে প্রধান ঝুঁকি হিসেবে বর্ণনা করে এগুলো থেকে বিরত থাকার জন্য গাড়ি চালকদের প্রতি আহবান জানান।
সিএমপি’র উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক-উত্তর) মো. আলী হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সহকারী পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক-উত্তর) মমতাজ উদ্দিন, ট্রাফিক পরিদর্শক (পাঁচলাইশ) সুমন জাহিদ লোবেল, ট্রাফিক পরিদর্শক (চান্দগাঁও) আশীষ কুমার পাল ও ট্রাফিক পরিদর্শক (মুরাদপুর) মো. ইসরাফিলসহ সংশ্লিষ্ট জোনের সার্জেন্টগণ।
এছাড়া দিবসটি উপলক্ষে সিএমপি’র ট্রাফিক-দক্ষিণ বিভাগের পক্ষ থেকে শহীদ বশরুজ্জামান চৌধুরী চত্ত¡র (নতুন ব্রিজ মোড়), ট্রাফিক-পশ্চিম বিভাগের পক্ষ থেকে এ.কে খান মোড় ও ট্রাফিক-বন্দর বিভাগের পক্ষ থেকে ইপিজেড মোড়ে স্থাপিত প্রচারণা বুথ থেকে পরিচালিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিদর্শন করেন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার।
ইপিজেড মোড়ে স্থাপিত বুথে উপস্থিত থেকে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেন সিএমপি’র উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক-বন্দর) শাকিলা সোলতানা। এসময় ট্রাফিক-বন্দর বিভাগের সকল কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে ট্রাফিক-পশ্চিম বিভাগের এ.কে খান মোড়ে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) শ্যামল কুমার নাথের সাথে এই কার্যক্রমে অংশ নেন অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক-পশ্চিম) শামীম কবির, সহকারী পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক-পশ্চিম) আরিফ হোসেন, ট্রাফিক পরিদর্শক প্রশাসন (ট্রাফিক-পশ্চিম) বিপ্লব কুমার পাল, ট্রাফিক পরিদর্শক (আকবর শাহ্) পুলক চাকমা।
ট্রাফিক-দক্ষিণ বিভাগের নতুন ব্রিজে শহীদ বশরুজ্জামান চত্ত্বরে স্থাপিত মঞ্চ থেকে সহকারী পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক-দক্ষিণ) মু. শরিফুল ইসলাম, ট্রাফিক পরিদর্শক (বাকলিয়া) শামসুদ্দিন সচেতনতা মূলক কার্যক্রম পরিচালনা ও লিফলেট বিতরণ করেন। এছাড়া নগরীর ট্রাফিক পরিদর্শকরা নিজ নিজ অধিক্ষেত্রে সচেতনতামূলক প্রচারণা কার্যক্রম ও লিফলেট বিতরণ করেন।