মনাম এর বৈঠকখানা

31

 

ভেতরের রুমে মেহেরজানের সহিত সাংসারিক আলাপ করিতেছিলাম। সাংসারিক কথা কহিতে কহিতে আরও নানা প্রসঙ্গ আসিয়া গেল। গুলবদন একটু ধর্মীয় কথাবার্তা পছন্দ করিলেও মেহেরজান বাইস্কোপ, খেলাধুলা সাংস্কৃতিক আলাপে আগ্রহী বেশি। দুনিয়া আগে বাড়িতেছে। জ্ঞানে গুণে ইনসান তরক্কি করিতেছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উতকর্ষের ছোঁয়ায় মানুষের লাইফস্টাইলে আমূল পরিবর্তন আসিয়াছে। মেহেরজান মোবাইল টিপিতে টিপিতে কহিল, ইনসানের যতই জ্ঞান বাড়িতেছে ততই কুতর্ক আর বিভাজন সংঘাত বৃদ্ধি পাইতেছে। শতবর্ষ আগে এই মুল্লুকে তেমন বড় আকারের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিলনা। দাদা দাদীর মুখে শুনিয়াছি মাদ্রাসা শিক্ষিতদের মধ্যে যাহারা উলা পাস (দশ জমাত) করিতেন তাহারা ভারত/ রেঙ্গুন হইতে দাস্তান (পাগড়ি) বাঁধিয়া আসিতেন। সেইসব মৌলভীদের কতই কদর ছিল সমাজে। সামাজিকভাবে অনেক সম্মানিত ব্যক্তির আসনে অধিষ্ঠিত থাকিতেন। গাঁয়ে কেহ এন্ট্রান্স পাস (এস এস সি) করিলে দূর দূরান্ত হইতে মিষ্টির পাতিলা লইয়া তাহাকে দেখিতে আসিত।মা-বাবার মুখে তৃপ্তির হাসির ঝলকানি পরিলক্ষিত হইত। আদবে আখলাকে সোনার চাঁন আদরে সম্মানে সমাজে একটি জায়গা করিয়া নিয়াছেন। আর আজকাল ঘরে ঘরে মাস্টার্স, এম বি এ, বিবিএ ।জ্ঞান বাড়িয়াছে মাগার সভ্যতা, শিষ্টাচার ক্রমাবনতির তরফ ধাবিত হইতেছে। যেই সমাজে জ্ঞানীরা মতানৈক্যে পৌঁছাইতে অক্ষম হইবে সেই সমাজ সদা উত্তপ্ত থাকিবে। বিশৃঙ্খলা আর নোংরামিতে পরিবেশ দূষিত হইবে। জ্ঞানী জ্ঞানী যদি ঝগড়া ফ্যাসাদে লিপ্ত হন তখন সাধারণ মানুষ দিশাহারা হইয়া পড়েন। ইবলিস শয়তান জ্ঞানী ছিল। যুক্তিবাদী ছিল। মাগার তাহার মধ্যে আনুগত্য ছিলনা। প্রেম ছিলনা। তাহার জ্ঞানই তাহাকে ডুবাইয়াছে। সোশ্যাল মিডিয়ার বদৌলতে আজকাল অনেক জ্ঞানীর দর্শন পাই। যাহাদের মধ্যে বেশিরভাগ ইবলিসের অনুসারী। কাহারও কাহারও লেবাসই সার। চটকদার কথা, প্রতিপক্ষের প্রতি অশালীন ভাষা প্রয়োগ ইত্যাদি। এইগুলি কখনোই জ্ঞানীর পরিচয় বহন করেনা।
অস্বাভাবিক হারে জ্বালানি তেল ও এলপি গ্যাসের দাম বাড়িলে সাথে সাথে পরিবহন ভাড়া বাড়িয়া গিয়াছে। ইহার জন্য রাজনীতিবিদদের কোন উচ্চবাচ্য নাই। রাজনীতি নাকি জনকল্যাণে মাগার এখন দেখিতেছি রাজনীতিকে অনেকেই নিজ কল্যাণে ইস্তেমাল করিতেছে। যদি আমার কথা সত্য নাহয় তবে কই তেলের বর্ধিত মূল্যে, পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধির ফলে কোন দল অনশন করিতে দেখা গিয়াছে ?বাংলাদেশে দাম বৃদ্ধির কালচার রহিয়াছে লেকিন দাম কমাইবার মানসিকতা নাই।একবার যেই সুঁই খাড়া হইয়াছে তাহা নিচে নামে না। বিশ্ববাজারে পর পর কয়েকবার তেলের দাম কমিয়াছে মাগার এই মুল্লুকে কমিবে কিনা তাহা একমাত্র উপর ওয়ালাই জানেন। সকিনার বাপ বরাবরই কহিয়া আসিতেছেন, স্থানীয় নির্বাচন গুলি স্থানীয়দের পছন্দ/ অপছন্দের ওপর ছাড়িয়া দেওয়া উচিৎ । গ্রেফ জাতীয় নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হওয়া বাঞ্ছনীয়। কারণ তাহারাই সরকার গঠন করিবেন। এখন বিভিন্ন জায়গায় নির্বাচনী সহিংসতায় ব্যাপারটা গোটা জাতিকে ভাবাইয়া তুলিয়াছে। ভুলিয়া গেলে চলিবেনা বর্তমান সরকারের অঙ্গিকার ছিল ভোট ও ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠা। ভাতের চাউল এখন প্রতিকেজি পঞ্চাশ টাকার ঊর্ধ্বে। ভোট ও যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয় তাহা হইলে সরকারের ভাবমুর্তি কী দাঁড়াইবে তাহা ভাবিয়া শিহরিত হইতেছি। চোখ খোলা রাখিলে স্থানীয় নির্বাচনের বর্তমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করিলে অনেক কিছুর সমাধান পাওয়া যাইবে।
কান টানিলে মাথা আসে বলিয়া একটা কথা চালু আছে। তেমনি জবাবদিহিতা অপরিহার্য করিয়া দিলে, সাথে সাথে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্পদের হিসাব নিলে কিছুটা হইলেও সমাজ দুরবস্থা হইতে মুক্তি পাইবে বলিয়া অনেকের বিশ্বাস। জনপ্রতিনিধি মানে যদি জনসেবক হয়, তবে এই জনসেবার জন্য তাহারা পরস্পর সংঘাত সংঘর্ষে লিপ্ত হইবে কেন ? যাহাদের সেবা করিবে সেই জনগণই তাহাদের সেবক নির্বাচিত করুক। কারণ এলাকার মানুষই জানে তাহারা তাহাদের সেবক হিসাবে কাহাকে নির্বাচিত করিবে। পরিস্থিতিগত কারণে অনেক সেবকের নিকট হইতে মানুষ পর্যাপ্ত সেবা পাইতেছেনা। জন্মনিবন্ধন, এন আইডি সংশোধন, শিক্ষাসনদ ও কাবিননামার সত্যায়িত করিতে অনেকক্ষেত্রে হয়রানির শিকার হইতে হয়। কয়েকদিন আগে মহল্লার হাশেম মিয়া তাহার ছোট্ট নাতনিটাকে সাথে লইয়া আসিয়াছিল তাহার প্রবাসী ছেলের এন আই ডি না থাকায় পদে পদে হয়রানির শিকার হইতেছে ইহা জানানোর জন্য। তাহার জিজ্ঞাসা প্রবাসীরা দূতাবাসে পাসপোর্ট বানাইতে পারিলে, নবায়ন করিতে পারিলে এন আই ডি বানাইতে পারিবেনা কেন ? এই রেমিটেন্সযোদ্ধারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলিয়া কঠোর পরিশ্রমের অর্থে দেশীয় রিজার্ভ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখিতেছে তাহাদের অনেক পারিবারিক কাজ এন আই ডি’র জন্য করিতে না পারিয়া ক্ষতির সম্মুখীন হইতেছে। কারণ প্রায় সবক্ষেত্রে এখন এন আই ডি একটি অপরিহার্য ডকুমেন্ট।
বর্তমানে আওয়ামীলীগ দীর্ঘ সময় ধরিয়া ক্ষমতায়। তাই বেশি শংকিত হইতেছি। সবাই এখন আওয়ামীলীগ। কেহ পিঠ বাঁচাইতে কেহ পেট ভরাইতে, কেহ চুরি করিতে, কেহ ব্যবসা করিতে। ইহারা সকলেই সুবিধাবাদী মাসতুতো ভাই। আওয়ামীলীগের ত্যাগী নেতারা এখন কোণঠাসা। একটা এলাকায় বিনা প্রতিদ্বন্ধিতায় শতাধিক প্রার্থী নির্বাচিত ইহা দলের জন্য কোন সুখবর নয়। বরং গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। এই ছুরতের ঘটনাগুলিই আওয়ামীলীগকে এবং তাহার চলার পথকে পিচ্ছিল করিয়া দিবে। ছদ্মবেশী আওয়ামীলীগ চারিদিক গিজগিজ করিতেছে। রাজনীতিতে কৌশল থাকিবে মাগার মোনাফেকি নয়। সরকার উন্নয়ন করিতেছে। পাবলিক মশার যন্ত্রনায় অস্থির। দায়িত্বশীল জনপ্রতিনিধিদের কাজ কী ? ওয়ারিশ সনদ, জন্ম সনদ সহজলভ্য করিয়া দিন। যত কঠিন করা হইবে ততই দালাল/ ফড়িয়াদের পকেট ভারি হইবে সাধারণ মানুষ সরকারের ওপর বিরক্ত হইবে। এমনিতেই দলে মুস্তাকের প্রেতাত্মারা চারিদিকে কিলবিল করিতেছে। আওয়ামীলীগে ছদ্মবেশীদের সংখ্যা খতরনাক ছুরতে বাড়িয়া গিয়াছে।ইহার প্রতিকার না করিয়া মরুভূমির উটপাখির মতো মাথা গুঁজিয়া থাকিলে দলকে মাশুল দিতে হইবে।
মাস্টার সাহেব একজন নিখাঁদ ক্রিকেটপ্রেমী মানুষ। বৈঠকখানায় গয়রহাজির থাকিলে বুঝিয়া যায় কোন না কোন টিমের খেলা আরম্ভ হইয়াছে। এইবার হোয়াইট ওয়াশ হইয়া সিরিজ হইতে ছিটকাইয়া পড়া দেখিয়া মাস্টার সাহেব প্রচন্ড মনোবেদনা লইয়া কয়েকদিন ঘর হইতে বাহির হইতেছেনা। যেন তিনি লজ্জায় আর মুখ দেখাইতে পারিতেছেন না। মাস্টার সাহেব লজ্জাবতী গাছের মতো কুঁচকাইয়া গেলেও যাহারা লজ্জায় মুখ দেখাইবার লায়েক নহে তাহাদের কাহারও কিছুর পরওয়া যেন নাই। আমি ক্রিকেট দেখিনা। এতো দীর্ঘ সময় বসিয়া ক্রিকেট দেখিবার মতো ফুরসৎ আমার নাই। তাই বলিয়া আমাকে হিটলার ভাবিবার কোন অবকাশ নাই। আমি খেলা পছন্দ করি ফুটবল আর রেস্লিং ।ক্রিকেট আমাদের সময়ে ছিলনা। আর এখন ক্রিকেট আসিয়াছে সাথে ক্রিকেট জুয়াও আসিয়াছে। ক্রিকেট জুয়া খেলিয়া অনেক পরিবার নিঃস্ব হইয়া গিয়াছে। বাড়ির ছাদে প্রকাÐ সাইজের বিদেশি পতাকা উড়াইয়া জার্সি পিন্দিয়া দেশপ্রেম সাগরে বিসর্জন দিয়া হায়া-শরমের মাথা খাইয়া লাফাইতে দেখিয়াছি কত আবাল বৃদ্ধ বণিতাকে। আশায় বুক বাঁধিয়া টি ভি সেটের সামনে ঘন্টার পর ঘণ্টা বসিয়া থাকিয়া আখেরতক দিলের তামান্না অশ্রুতে ভাসিয়া যাইতে দেখিয়াছি। কেহ কেহ বাজি হারাইয়া হতাশায় বিছানা ধরিয়াছে। সুতরাং আমি ক্রিকেটকে ভালবাসিতে পারিনি, এটা আমারই ব্যর্থতা।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট