মনাম এর বৈঠকখানা সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ

17

 

সকালে গোলাম আলিকে লইয়া বাজারে যাওয়া আমার প্রাত্যহিক কর্ম তালিকার একটি। বাবার আমলে কোনোদিন বাজারে যাইতে হয় নাই। আব্বা নিজেই বাজার করিতেন। কাহারো বাজার তাঁহার পছন্দ হইত না। আব্বার এই অপছন্দ আমরা সকল ভাইদের বেজায় পছন্দ। সুতরাং সওদা-পাতি কিনিবার ঝামেলা হইতে মুক্ত হইয়া বিন্দাস ফুটবল, হাডুডু, ডাংগুলি খেলিয়া হাড্ডিগুড্ডির মেরামত করিয়া বাড়িতে ফিরিতাম। মাগার আব্বা জানের ইন্তেকালের পর বাজারের থলি যেই হাতে তুলিয়াছি, আজতক নামাইবার ফুরসৎ পাই নাই। দিনের পর দিন বাজার করিতে করিতে বেজার হইয়া পড়িয়াছি। বাজার দর দিন বদিন লাফাইয়া লাফাইয়া সামনের তরফ চলিতেছে। সাধারণ মানুষের দুর্গতি বাড়িতেছে। করোনা কালীন বৈশ্বিক প্রতিকুল পরিস্থিতে মুল্লুকে মানুষের অর্থনৈতিক ধ্বস নামিয়াছে। ব্যবসাপাতি মন্দা ও বেরোজগারী বাড়িয়া গিয়াছে। নতুন কর্মসংস্থান নাই। আমার মতো লোকেরা চোখে সর্ষেফুল দেখিতেছে। কুদ্দুছ সওদাগরের চাউলের আড়তে বসিয়া সকিনার বাপ হুক্কা টানিতেছে। বাজারে আসিলেই এই আড়তে খানিক্ষণ বসিয়া হুক্কা-গল্প সারিয়া সওদা-পাতি লইয়া ফিরিয়া যায়। ইদানিং আমারও একটু আধটু আদত হইয়া গিয়াছে এই চাউলের আড়তে ঢুঁ মারিবার। কুদ্দুছ সওদাগর বড়ই মিশুক মানুষ। দিলটাও তাহার চায়ের কেটলির মতো প্রকান্ড। মজার মজার কথা বসিয়া বসিয়া রসিয়া রসিয়া কহিতে ওস্তাদ। দোকানের সামনে আসিতেই সকিনার বাপ দিল খোলা হাসিতে সম্ভাষণ জানাইলেন। কুদ্দুছ সওদাগর হাসিতে হাসিতে দেওয়াল ঘেঁষিয়া চকিতে জায়গা করিয়া দিলেন। কুদ্দুছ সওদাগরের পাশে বসিতে বসিতে সকিনার বাপকে কহিলাম- সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণঃ হুক্কা আড্ডার জন্য ক্ষতিকর । গোলাম আলি হাসিতে হাসিতে একটা চাউলের বস্তার ওপর বসিল। সকিনার বাপ হাসিয়া এক গাল ধুঁয়া ছাড়িয়া কহিলেন-গতরাতে এক আজব স্বপ্ন দেখিয়াছিলাম। সকিনার বাপের এই আজব স্বপ্নের কথা শুনিতেই কয়েকজন উৎসুক ক্রেতা খাড়াইয়া গেল। বঙ্গবাসী চিরকালই একটু কৌতূহলী। স্বপ্নেতো ইনসান নানান ছুরতের কান্ডকারখানা দেখিয়া থাকে। নিজের ব্যক্তিগত স্বপ্নের কথা আরজু করিয়া না হয় কেহ তাহার ইয়ার দোস্তদের কহিতে পারে। মাগার বিন বোলাইয়া মেহমান বনিয়া অপরিচিত কেহ তাহা শ্রবণ করা নেহায়েত সভ্যতা বিবর্জিত। অথচ এই মুল্লুকে তাহা অহরহ ঘটিতেছে। যাহা হোক, সকিনার বাপ স্বপ্নের কথা বয়ান করিবেন বলিয়া ফডর ফডর শব্দে হুঁকার টান দিয়া আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের পরিবেশকে ধুম্রকুন্ডলীর মধ্যে আচ্ছন্ন করিয়া দিয়াছেন। শৈশবে দাদার লাঠির ঘা’ এর কথা এখনো মনে পড়িয়া যায়। কোন কাজে গলতি হইলেই টক করিয়া লাঠির এক ঘা লাগাইয়া কহিতেন-‘ভাবিয়া চিন্তিয়া করিও কাজ, কাজ করিয়া ভাবিওনা’। সুতরাং বাছপান কালের আদতের সহিত বাড়িয়া উঠা এই আমি এখনো কোশিশ করিয়া থাকি কোন পদক্ষেপ লইবার পূর্বে একাগ্রচিত্তে ঐ পদক্ষেপের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের আন্দরে ঢুকিয়া যাই। শৈশবে দাদার এই শিক্ষা আজ আমার জিন্দেগীতে একটি আনমুল মুক্তো দানার মতো। সকিনার বাপের ধুঁয়ার উৎপাতে কহিলাম আপনার এই ওয়ান স্ট্রোকের ধুঁয়ার চাইতে তো টু স্ট্রোকের ধুঁয়া বেহেতর ছিল। বিশ বছর আগে বন ও পরিবেশ মন্ত্রী টু স্ট্রোক বন্ধ করিতে যাইয়া আবারও এক হাজার পুরাতন ট্যাক্সি রাস্তায় নামাইতে বাধ্য হইয়াছিলেন। আমি তখন লেখিয়াছিলাম, পলিথিন আর ট্যাক্সি এককথা নয়। এই ছুরতের ব্যবস্থা পর্যায়ক্রমে পুনর্বাসন ও বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমেই একমাত্র সম্ভব। আমার কথা শুনিয়া সকিনার বাপ হুক্কাটা এক পাশে ঠেলিয়া রাখিয়া অভ্যাস মোতাবেক একটা হাসি দিয়া কহিলেন- সত্যি কহিয়াছেন। তাহা হইলে তো ধূমপায়ী অধূমপায়ী সহ তামাম পরিবেশের উন্নতি হইত। লেকিন মানুষ যাহা খায় তাহা তো হারাম করা যাইবেনা। পঁচাত্তর পরবর্তী সরকার তামাক সিগারেট ছাড়াও কিছু হারাম দ্রব্যাদির বাতিল কৃত লাইসেন্সও পুনঃ অনুমোদনের মাধ্যমে জায়েজ করিয়াছিলেন। সকিনার বাপের কথা শুনিয়া দাঁড়াইয়া থাকা কয়েকজন গ্রাহক হাসিয়া উঠিল। আমি কহিলাম, সময় নাই। স্বপ্নের কথাটা শুনাইয়া দেন। আজ বাজারের ফর্দটা বড়। বাজার করিতে হইবে। সাথে ছোট মাছের ফরমায়েশও রহিয়াছে। সন্ধ্যায় ছোট মাছ বাসায় লইয়া গেলে দুই বেগম সাহেবার শেকলে লো-ভোল্টেজ নামিয়া আসে। এই সময় বিদ্যুৎ আমাদের দরিদ্র মহল্লা ছাড়িয়া খাস খাস মহল্লায় সফর করিয়া থাকে। সুতরাং বেগম ছাহেবাদ্বয়ের মেহেরবানিতে কিছু কিম্মতি গøাস প্লেটও ভাংচুর হইবার সমূহ সম্ভাবনাকে উড়াইয়া দেওয়া যায়না। এমনিতেই সংসারে তাহাদের এক নায়কতন্ত্র। আমরা পুরুষেরা যেন তাহাদের হুকুমের গোলাম। কোন এক বিদগ্ধ লেখকের লেখায় পড়িয়াছিলাম, লেখক সংসারের সংজ্ঞা দিয়াছিলেন এই ছুরতে-সংসারে পুরুষেরাই সং আর নারীরাই সার। আর যাহাই হোক এই লেখকের সংসারের সংজ্ঞাটা বাস্তবে মিলাইয়া দেখিলে ঘর, সংসার, সমাজ, রাষ্ট্র এমনকি তামাম দুনিয়াতেও পুরুষেরা সং আর রমনীণই সার। সুতরাং সং পুরুষ আর সার নারীর একত্রে বসবাসের নাম ‘সংসার’।
কুদ্দুছ সওদাগর চা, সিঙ্গারা আনাইয়া সহাস্যে পরিবেশন করিলেন। চা-সিংগারা খাইতে খাইতে সকিনার বাপ কহিলেন-রাতে স্বপ্নে দেখিলাম, একদল যুবক আসিয়া আমাকে সালাম করিল। তাহাদের সবার বুকে একটি করিয়া পোস্টার সাঁটানো আছে। পোস্টারে লেখা আছে ‘সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণঃ চাঁদাবাজি জাতির জন্য ক্ষতিকর’। আমি যুবকদেরকে খাতির করিয়া বারান্দায় বসাইলাম। মনে মনে বড়ই খোশ হইলাম যে ইহা ভাবিয়া যুবসমাজ চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে রুখিয়া দাঁড়াইয়াছে। এখন কাহার বাপের সাধ্য এই তল্লাটে চাঁদাবাজি করে ?আমি আনন্দে আত্মহারা হইয়া এই সাহসী যুবকদেরকে একটু চা-বিস্কুটে আপ্যায়ন করিতে চাহিলে যুবকেরা কহিল-চাচা আমাদের সময় নাই। তাড়াতাড়ি বিদায় করুন। আমি বিগলিত কণ্ঠে কহিলাম- বাবারা, তোমরা এতবড় একটা মহৎ কর্মে শামিল হইয়াছ, অন্তত একটু চা-নাস্তাও যদি খাওয়াইতে না পারি তবে দিল ঠাÐা হইবেনা। যুবকেরা তড়াক করিয়া খাড়াইয়া কহিল- আমাদের সহিত ঠাট্টা করা হইতেছে ? আপনার ছেলে কোথায় ? শুনলাম নতুন কাজ পাইছে। আমাদেরকে খুশি করবেনা ? আমার হাত হইতে চায়ের কাপ পড়িয়া শব্দ করিয়া চার টুকরা হইয়া গেল। তাহলে তোমরা চাঁদা নিতে আসিয়াছ ? তাহারা ফখরের সহিত মাথা দুলাইল। তোমাদের বুকে ঐ পোস্টার কেন ? আমার এই ছাওয়ালে এক যুবক হাসিয়া কহিল-আমরা আইনকে শ্রদ্ধা করি এবং তোমাদের উল্লু বানাই। অন্য যুবক একটা শর্টগান বাহির করিয়া কহিল- এই বুড্ডা তোর পোলারে জিন্দা দেখতে চাইলে এক সপ্তাহের মধ্যে টাকা পাঠায় দিবি। আচানক রান্না ঘরের মাচান হইতে বিড়ালটা লম্ফ দিলে সশব্দে কিছু হাঁড়ি পাতিল পতিত হইল। অমনি চোখ দুইটা খুলিয়া উতকর্ণ হইয়া হাঁপাইতেছি আর সকিনার মায়ের উদ্দেশ্যে বিড়বিড় করিয়া কহিলাম- সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণঃ রান্নাঘরে বিড়াল পোষা সকিনার বাপের নিদ্রার জন্য সাংঘাতিক ক্ষতিকর। স্বপ্ন শুনিবার পর সকলে হাসিয়া উঠিলে সকিনার বাপ কহিলেন-এইবার এই স্বপ্নের তাবীর কে কহিবেন ? কুদ্দুছ সওদাগর কাশিয়া কহিলেন, তাবীর বলিবার মতো এলেম আমার নাই। তবে স্বপ্নেতে আমার মোটা মাথায় কিছু ম্যাসেজ পাইয়াছি। তাহা আরেকদিন ফুরসতে কহিব। এখন ব্যবসার সময়। আমিও বাজারের তরফ চলিলাম। চলিতে চলিতে মনে পড়িয়া গেল কয়েকমাস আগের একটি লেখা। অর্থনীতি নামক যে শাস্ত্রটি এ যাবতকালে মানুষের স্বার্থপর চরিত্রের ওপর ভর করিয়া দাঁড়াইয়া আছে, ইদানিং তাহার তত্বও বলিতেছে মানুষ পরার্থপরও হয়। অর্থাৎ যেই কর্ম করিলে তাহার প্রত্যক্ষ কোন লাভ নাই, মানুষ তেমন কাজও করিয়া থাকে। তবে যেই কর্ম করিলে সমাজের উপকার, কিন্তু নিজের ক্ষতি অথবা হয়রানির সম্ভাবনা প্রবল আগ বাড়াইয়া তেমন কর্মও করিবার মতো লোকের সংখ্যা নিতান্ত কম।সেই কারণেই রাস্তায় দুর্ঘটনাগ্রস্ত কাহাকেও দেখিলেও নজর ফিরাইয়া থাকিবার প্রবণতা সা¤প্রতিক অতীতে সর্বজনীন হইয়াছে। যাহারা জানেন, আহত মানুষটিকে হাসপাতালে পৌঁছাইয়া দিলে অথবা দ্রæত চিকিৎসার ব্যবস্থা করিলে হয়তো বা তাহার প্রাণ বাঁচিয়া যাইবে। তাহারাও শেষ অবধি পিছাইয়া যান। কারন অপরিচিত আহতকে হাসপাতালে লইয়া যাওয়ার পর যাহা হইতে থাকে তাহা বিশুদ্ধ হয়রানি। চিকিৎসকের প্রশ্নবান হইতে থানা-পুলিশ আদালত অনন্ত হাজিরা, পরোপকারের সদিচ্ছাকে হাওয়ায় মিলাইয়া দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট।

লেখক : শিক্ষক, প্রাবন্ধিক