মনাম এর বৈঠকখানা মায়ের কিল হজম করিতে হয় !

20

মনছুর নাদিম

আকাশের তরফ তাকাইয়া আরাম কেদারায় বসিয়া আছি। মনটা বড়ই নাজুক হইয়া গিয়াছে। শরীরের অবস্থা সুবিধাজনক নহে। ঠিক যেন রাজনৈতিক দলগুলির মতো। ওপরে একদল, অন্দরে কোন্দল। মেহেরজানের ভাষায় ‘উপরে ঠিকঠাক ভিতরে সদরঘাট’। একেতো এই মুল্লুকে বর্তমান জমানায় কোন সহজ সরল মানুষের বসবাস হিমালয় বিজয়ের মত কষ্ট সাধ্য ব্যাপার। রাস্তায় কালো ধুঁয়ায় জনজীবন ওষ্ঠাগত। তাহার ওপর বিরক্তিকর যানজট। রাস্তার মোড়ে মোড়ে অতিরিক্ত ট্রাফিক পুলিশ দÐায়মান। যানজট মুক্ত নগরী গড়িয়া তুলিতে ট্রাফিক বিভাগের ব্যাপক তৎপরতা থাকিলেও দক্ষতার অভাবে তৎপরতা ব্যাহত হইতেছে। সন্ধ্যা নাগাদ মশার উপদ্রব খতরনাক ছুরতে বর্ধিত হইয়া জনজীবন অতিষ্ঠ। এই অনিচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি চব্বিশ ঘণ্টা জারি থাকে। ইহার পর আছে লোডশেডিং। তাজ্জবের ব্যাপার হইল শীতকালেও লোডশেডিং দেখিতে হইল, কী আর করা ‘মায়ের কিল হজম করিতে হয়’।যাহাহোক,আমি আর ঐদিকে যাইব না।
গতকাল গিয়া দেখিলাম সকিনার বাপ দাওায়ায় বসিয়া গালে হাত দিয়া কাঁদিতেছেন। দেখিয়া মনটা খারাপ হইয়া গেল। কাছে গিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম- কী ব্যাপার কাঁদিতেছেন কেন ? সকিনার বাপ ফোফাইতে ফোফাইতে কহিলেন- অসহ্য ব্যথা, আক্কেলদাঁত গজাইতেছে। আমি তাহাকে সাহস দিয়া কহিলাম- ডাক্তারের কাছে যান। আক্কেলদাঁত উঠার সময় একটু ব্যথা হয়। আমাকে তাজ্জব করিয়া দিয়া সকিনার বাপ কহিলেন- আরে আমি ব্যথায় কাঁদিতেছি নারে ভাই। আমি কাঁদিতেছি অপমানে। তেমনি বিস্মিত কণ্ঠে কহিলাম- অপমানে ? মানে বুঝলাম না। কে আপনাকে অপমান করেছে বলুন। সকিনার বাপ বাম হাতে গালটা চাপিয়া ধরিয়া তেমনি ককিয়া ককিয়া কহিলেন- কেউ অপমান করেনি রে ভাই। আক্কেল যখন আসিবে তবে এত বিলম্বে কেন ? আওলাদ ফর্জন্দ, নাত-নাতিœ সব বেআক্কেল থাকতেই হইল ? এইটা কী কম অপমানের কথা ? সকিনার বাপের কথা শুনিয়া বরাবরের মতো হাসিয়া দিলাম। মেজাজি হইলেও জিন্দা দিল ইনসান এই সকিনার বাপ।হাজারো সমস্যার মাঝে প্রধান সমস্যা হইল, সমস্যার কথা বলাই বড় সমস্যা। তাই সহজে সমস্যার কথা কেহ ভুল করিয়াও মুখে আনেনা। বেশিরভাগ দায়িত্বশীলেরা মাথার ওপর জাতির পিতার ও দেশ রতেœর ছবি লইয়া জমা খরচের হিসাব করেন। গৃহহীনদের কেহ কেহ গৃহ পাইয়া হাত তুলিয়া দোয়া করিতেছে। কেহ আবার নিজ বাস্তুভিটা হারা হইয়া অশ্রæসিক্ত নয়নে যাযাবরের জীবন মানিয়া লইতেছে। রোহিঙ্গারা সরকারের করুণায় ভাসান চরে নতুন আবাসে সংসার সাজাইতেছে। লালদিয়ার চরের ২৩০০ পরিবার পুনর্বাসন ছাড়া ভাসিয়া গেল। সকিনার বাপ দীর্ঘশ্বাস ছাড়িয়া কহিলেন-আফসোস ! রাজনীতি জনকল্যাণে হইলেও আজকাল তাহা বিলুপ্ত। নেতা’র জায়গায় অভিনেতা। আমার দুই বিবি আমাকে লইয়া মহা টেনশনে। আমি যেন কড়া কথা না লিখি। তাহাদেরকে অকাল বৈধব্যের শ্বেত শাড়ি যেন পিন্দিতে নাহয়। লেখালেখি করাও আজকাল বিপজ্জনক। যাহা হোক, আমি আজ অন্য একটি প্রসঙ্গ বয়ান করিতে বসিয়াছি। আমার এক আত্মীয় দীর্ঘ ত্রিশ বছর পর আচানক আসিয়া হাজির হইল। বাপের সহিত রাগ করিয়া সে ত্রিশ বছর আগে লা-পাত্তা হইয়াছিল। পারিবারিক ভুল বোঝাবুঝির কারণে আমাদের সহিতও কোন যোগাযোগ রাখেনি এই দীর্ঘ ত্রিশ বছর। একই শহরে থাকিয়াও বাইস্কোপের কাহিনীর মত নিজের ভুল বুঝিতে পারিয়া সশরীরে আগমন ঘটিয়াছে। আগে নাস্তিক্যবাদের রাজনীতি করিত বলিয়াই বাবার সহিত কলহের সূত্রপাত। সেই কলহে পিতা-পুত্রের দূরত্ব ক্রমশ বাড়িতেছিল। মাতৃহারা গৃহে পিতার সহিত কলহ কালে সৎ মায়ের কোন ভূমিকা না থাকিলেও রাগারাগি করিয়া গৃহত্যাগ করিয়াছিল।মুসলিম অধ্যুষিত বাংলার জমিনে নাস্তিক্যবাদী রাজনীতি সুবিধা করিতে পারে নাই। তিনি রাজনৈতিক কারণে বার দুয়েক কারাবরণ করিলেও তাহার দল তাহার জন্য কিছুই করে নাই। প্রতিবারই তাহার বাবা কারাগার হইতে নিকালাইয়া পিতৃত্বের দায়িত্ব পালন করিয়াছে। সেই আত্মীয় ত্রিশ বছর বাদে দারিদ্রতা ও বার্ধক্যে ঝলসানো বিষণ্ণ মুখভর্তি দাঁড়ি লইয়া আচানক হাজির। তাহার কথা-বার্তায় এখন বোঝা যাইতেছে তিনি এখন ধর্ম-কর্ম লইয়া আছেন। আমাকে কথায় কথায় জিজ্ঞাসা করিলেন, আমি কোন দল করি কিনা। আমার উত্তর বরাবরের মত সোজা।
আমি দলীয় রাজনীতি করি না। তবে মুক্তিযুদ্ধ ও অসা¤প্রদায়িকতার পক্ষে লিখে থাকি। তিনি চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে মুচকি হাসিলেন। এই রহস্য পুর্ন হাসির অর্থ বোধগম্য হইলনা। তিনি আমাকে প্রেরণা দিলেন। আমার লেখা তিনি পত্রিকায় পড়েন। নানা প্রশংসা করিলেন যাহা শুনিতে আমি বিব্রতবোধ করিতেছিলাম।স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে আমার অনেক সহপাঠীকে দেখিয়াছিলাম রাজনীতি করিতে গিয়া যথাসময়ে বিবাহ পর্যন্ত করেনাই। তাহাদের যুক্তি ছিল, তাহাদের নেতাগণ সংসার করেননি। সুতরাং তাহারাও সংসার না করার শপথ লইয়াছে। পরে সেই নেতাদের অনেককেই দেখিয়াছি বিলম্বে বিবাহ করিয়া কাজা পুরাইয়াছেন । মক্কায় গিয়া হজ করিয়া তওবাও করিয়া আসিয়াছেন।
আজ শেষ বয়সে আমার আত্মীয়টিও বাবার আরাধ্য পথে ফিরিয়া আসিয়াছেন। মাগার আজ তাহার বাবা বাঁচিয়া নাই। বাঁচিয়া থাকিলে কিছুটা শান্তি পাইতেন। আজ সে বিবাহিত। এই বার্ধক্যে নাতির বয়সী ছেলেদের মানুষ করা কত কষ্ট সাধ্য ব্যাপার তাহা বলিবার অবকাশ রাখেনা। যৌবনে মানুষ অনেক ভুল করিয়া থাকে। বার্ধক্যে আসিয়া সেই ভুলের মাশুল দিতে দিতে আখেরি ঠিকানায় পৌছিয়া যায়। ইনসান তাহার জীবনকাল অতিক্রম করিবার সময় ভাবিবার ফুরসৎ পায় কম। যাহাদের কিয়দংশ ভাবিয়া থাকে তাহারা নিঃসন্দেহে কামিয়াব হইয়াছে। আস্তিক নাস্তিক লইয়া বিস্তর ছাওয়াল জবাব। আমি বিশদে না গিয়া স্রেফ কহিব, আল্লাহ্ বা স্রষ্টা একজন আছেন বলিয়াই উট নামক পশুটির জন্ম। যাহাকে শিপ অফ ডেসার্ট বা মরুভূমির জাহাজ বলা হয়। যাহা লাগাতার পনেরদিন পানি না খাইয়া চলিতে পারে। স্রষ্টা একজন আছেন বলিয়াই গাছের ওপর নারিকেলের ভেতর সুস্বাদু পানি হয়। স্রষ্টা আছেন বলিয়াই প্রতিদিন সূর্যের উদয়-অস্তের কোন ব্যতিক্রম হয়না। মরার পরে কী ঘটিবে তাহা কেহ জানে না। না আস্তিকেরা, না নাস্তিকেরা। সকলের নিকট এটা নতুন অদৃষ্টপূর্ব হইলেও অশ্রæতিপূর্ব নয়। এখন কথা হইল, যদি কবরের যাহা যাহা কোরানে বর্ণিত হইয়াছে তাহা বিশ্বাস করিয়া কেহ যদি তাহার জীবৎকালে আমল করিয়া থাকেন তিনি তো পার হইয়া যাইবেন। আর যিনি কিছুই বিশ্বাস না করিয়া মরিয়াছেন তাহার কী হইবে ? তিনি তো পুনরায় দুনিয়ায় আসিবার কোন মওকা পাইবেন না।
সুতরাং তিনিই বুদ্ধিমান যিনি প্রস্তুতি লইয়াই মরেন। না থাকিলে নাই, থাকিলেও ভয় নাই। এই বিশ্বাসই থাকা জরুরি।একবারও না মরিয়া দৃঢতার সহিত স্রষ্টাকে অস্বীকার করা নিতান্ত হটকারিতা বলিয়াই আমি মনে করিয়া থাকি।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামলেখক