মনাম এর বৈঠকখানা ধার চাওয়াও একটা আর্ট

12

 

বেকায়দায় পড়িয়া জনৈক পড়শি কয়টা টাকা ধারের জন্য আমার নিকট আসিয়াছিলেন। ধার উধার তো দুনিয়ায় চলিতে থাকে। তবে ধার-উধার দুনিয়াতে পহেলা মর্তবা কে বা কাহারা প্রচলন করিয়াছিলেন তাহা আমার জানা নাই। মাগার ইহা জরুর জানি ও শুনিয়াছি যে, রাজা-মহারাজারাও নাকি ধার-উধার করিতেন। ধার আবার নানান ছুরতের হইয়া থাকে। টাকা-পয়সা ধার ‘চাল, ডাল, লবণ তেল ধার’ শাড়ি, চুড়ি অলংকার ধার। বই খাতা ধার, কলম চাকু ধার। অস্ত্র ক্যাডার ধার ইহাতক কি এই জগৎ সংসারে কথা পর্যন্ত ধার করা হয়। লেখালেখি করিতে গিয়া বড় বড় মনিষীদের কিতাব হইতে তাহাদের কথার যেই উদ্ধৃতি দিয়া থাকি তাহাও এক কিছিমের ধার। মাগার তামাম ধারকে তাকিয়ার তলে রাখিয়া অর্থ-কড়ি সংক্রান্ত ধারের কাহিনী পহেলা বয়ান করি। আমি যখন বেরোজগার ছিলাম, তখন পকেট খরচার জন্য বাবার পকেটের তরফ তাকাইয়া থাকিতে হইত। কোন কোন সময় বাবার দেয়া হাত খরচে কুলাইয়া উঠিতে না পারিয়া বন্ধু-বান্ধব হইতে ধার করিতে হইত। মাগার সেইখানেও মুশকিল হইত। কারণ আমি সহজে কাহারও নিকট ধার চাহিতে পারিতাম না। যাহারা ধার কর্জে অভ্যস্ত হইয়া পড়িয়াছে তাহারা ভালো করিয়া জানেন ‘ধার চাওয়াও একটা আর্ট’। যাহা আমার মতো অনভ্যস্ত অভাবীর বোধগম্য হইবার কথা নহে। সুতরাং খানদানি চেহেরা, লেবাসে কেতা দুরস্ত সাহেব কি আর সহজে ধার চাইতে পারে ? বন্ধু বান্ধবেরা বেশিরভাগ মনে করিয়া থাকে তাহাদের মধ্যে আমিই একমাত্র মালদার পাবলিক। সংগত কারণে তাহারা আমার ওপরই জরুরতের চাইতে বেশি ভরসা করিয়া থাকেন।তাহাদের এই ভরসায় আমি কর্জে কর্জে ভাসিয়া গেলাম। মানে কর্জ করিয়া কর্জ শোধ করিতে লাগিয়া গেলাম। এবং নির্জন কক্ষে চোখের জল ফেলিতে লাগিলাম। বাপ-দাদার ইজ্জতের ঠেলায় বিলকুল জমিয়া গেলাম। প্রত্যেহ সকালে নিদ্রা হইতে জাগিয়া মস্তক অভ্যান্তরে খোদা প্রদত্ত কম্পিউটারটা অন করিতাম। আর একটার পর একটা প্রোগ্রাম সেট করিতাম। কাহার নিকট হইতে ধার লইয়া কাহার কর্জ শোধ করিব। আবার বন্ধুদের ভরসার অস্তিত্ব টিকাইয়া রাখিতে নিজের অস্থি মজ্জা পানি করিয়া নতুন ঋণ দাতার সন্ধান করিতাম। অনেকে আবার বড় আশা লইয়া আমার নিকট আসিতেন। তাহাদের আশার মরুবৃক্ষে জল সিঞ্চনের জন্য বেদিশা হইয়া উদভ্রান্তের মতো দিক বিদিক ছুটিয়া যাইতাম। খালা, ফুপি, আপা দুলাভাই কাহাকেও বাদ দিতাম না। পরের জন্য কর্জ করিতে যাইয়া অনেকের উপদেশ নছিহতও হজম করিতে হইত। চাকরি বাকরি একটা কিছু করো। সামনে বিবাহ করিতে হইবে। বউয়ের পাঁচখানা যোগাইতে হইবে। তারপর সন্তান-সন্ততির খরচ। সংসারে নানামুখী খরচ। এই লেখালেখিতে সংসার নামক জাহাজটা চালানো সম্ভব না। কবি মাইকেল মধুসূদন জীবন সায়াহ্নে আসিয়া মানবেতর জীবন যাপন করিয়া অত্যন্ত অবহেলিত ও অসহায় অবস্থায় মৃত্যু বরণ করিয়াছিলেন। অধিকাংশ কবি, সাহিত্যিক কলামিস্ট সাংবাদিক তামাম জিন্দেগি অর্থকষ্টে ভোগেন। তাহাদের সাংসারিক অশান্তির মূলেও থাকে অর্থ কষ্ট। কবি বলিয়াছেন-‘অভাব যখন দরোজায় আসিয়া দাঁড়ায়, ভালোবাসা জানালার ফাঁক দিয়া পালাইয়া যায়’। এই ছুরতের নছিহত শুনিতে ভালো না লাগিলেও নছিহতের পর ধারের অর্থ হাতে পাইলে ভালো লাগিতে শুরু করে। ঝিমাইয়া পড়া মনটা নাচিয়া উঠে। এই ছুরতে নিজের জন্য ও পরের জন্য ঋণ করিতে করিতে ঋণের বোঝা বেশ ভারি হইয়া গেল। বাপের হোটেলে খাওয়া শরীর ও চেহেরায় ধস নামিয়াছে। সারাক্ষণ হতাশায় ভোগী। নাওয়া-খাওয়ায় অনিয়মিত হইয়া যাইতেছি। নামাজে একাগ্রতা হারাইতেছি। পাওনাদার হইতে দূরে থাকিতেছি। ধীরে ধীরে অভাব সংক্রান্ত স্বভাব আমার জীবনে প্রভাব বিস্তার করিতে আরম্ভ করিতেছে। আমার এই অবস্থা হইবার কথা নহে। লেকিন তাহার পরও হইয়াছে। কারণ যাহারা আমার নিকট হইতে ঋণ গ্রহণ করিয়াছিলেন তাহারা অনেকেই আমার নিকট চিরঋণী রহিয়া গিয়াছিলেন। এই সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের কথাটি মনে পড়িয়া গেল, একদা তাঁহার নিকট এক ব্যক্তি কিছু ঋণের জন্য আসিলে রবীন্দ্রনাথ তাহাকে ঋণ দান করিলেন। ঋণ পাইয়া লোকটি কৃতজ্ঞে গদগদ কণ্ঠে কহিলেন-কবিগুরু আপনার এই উপকারের কথা আমি আমৃত্যু স্মরণ রাখিব । আজ হইতে আপনার কাছে চির ঋণী হইয়া রহিলাম।পরবর্তীতে ঐ লোক সম্পর্কে বলিতে গিয়া কবিগুরু কহিয়াছিলেন, লোকটার শত দোষ থাকা সত্তে¡ও সে তাহার কথা রাখিয়াছিল।অর্থাৎ সে রবীন্দ্রনাথের ঋণ শোধ না করিয়া চির ঋণী রহিয়া গিয়াছিলেন। মাগার আমিতো রবীন্দ্রনাথের মতো বিত্তশালী নই। তাহা ছাড়া আমার ঋণ গ্রহিতেরা রবীন্দ্রনাথের ঋণ গ্রহিতের মতো চির ঋণী থাকিবার কথাও ব্যক্ত করেনাই। দুয়েকজন আমার সরলতার মওকা লইয়া আমার নিকট আসিয়া ইমানদারির দলিল পেশ করিয়া গিয়াছেন। মানে সরাসরি আমার নিকট হইতে নেওয়া ঋণগুলি অনুনয় বিনয় করিয়া মাফ চাহিয়া আমাকে শরমিন্দায় ফেলিয়া দিয়াছেন। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আমি খামোশ হইয়া যাইতাম। অথচ তখনও আমার অবস্থা হইতে তাহাদের অবস্থা বহুগুণ বেহতর। আমরা জানি, যাহা ঋণ ইয়ানে উধার হিসাবে নেওয়া হয় তাহা পরিশোধ করিতে হয়। এক কথায় ঋণ মানেই প্রয়োজন শেষে ফিরাইয়া দেওয়া। সেইটা অর্থ হোক আর কোন বস্তু হোক। যাহা দান হিসেবে গৃহিত হয় তাহা পরিশোধ করিতে হয়না। মাগার যাহারা ঋণকে জবরদস্তি দান বানাইয়া দেয় ইয়ানে ঋণ গ্রহণ করিয়া সেই ঋণ পরিশোধ না করিয়া উল্টো ঋণ দাতার নিকট ঐ ঋণ মাফ করিয়া দিবার বেহায়া আবদার করিয়া ঋণকে দানে রূপান্তর করিয়া দেয়, তাহাদেরকে কী বলিব ? ইমানদার ? বেঈমান ? প্রতারক? ভদ্র চাঁদাবাজ? নাকি ধান্ধাবাজ? বোধহয় শেষের টাই বলা যুক্তিযুক্ত ! কারণ, এই ছুরতের ধান্ধাবাজেরা ঋণ লইবার সময় মা মরা চেহেরায় ইনাইয়া বিনাইয়া অরুণ বরুণ কিরণ মালার শোক গাঁথা কাহিনী শোনাইয়া ঋণদাতার অন্তরের মোমবাতিতে আগুন জ্বালাইয়া দেয়।তাহাদের ঐ বিপদের সময় যেই ব্যক্তি ধার দিয়া তাহাদের উদ্ধার করিয়াছেন, পরবর্তীতে সেই মহৎ ব্যক্তির নিকট কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা তো দূরের কথা অধিকন্তু প্রাপকের প্রাপ্য আদায় না করিয়া চির ঋণী বনিয়া ঋণ দাতার ভোগান্তি বাড়াইতে বিলকুল পিছপা হন না।
যাহা হোক, আমার পড়শি ভদ্রলোকটিও আমার নিকট পহেলা মর্তবা আসিয়াছেন। নেহায়েত তকলিফ না হইলে আমি মনে করি কোন ভদ্রলোক ধারের ধারে-কাছেও ঘেঁষেন না। অবশ্য একটা প্রবাদ আছে-‘বাঙালির ধার করিয়া ঘী খাইবার অভ্যাস’। আমি কিন্তু কথাটার সহিত একমত নই। কারণ ‘বাঙালির পেটে ঘি হজম হয়না’ এহেন প্রবাদও আছে। তাই সংগত কারণে যাহা হজম হয়না, তাহা মাগনা পাইলেও খায়না। ঋণ করিয়া ঘী খাইবার তো প্রশ্নই উঠে না। এই প্রবাদ গুলি অনেক ব্যাক ডেটেড। যেই সময় বাঙালির গোলা ভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছ ছিল ইয়ানে আমরা যখন মাছে ভাতে বাঙালি ছিলাম, তখনকার প্রবাদ এইটা। বাঙালির পুরানা দাস্তান খতম হইয়া এখন নয়া দাস্তান আরম্ভ হইয়াছে। এখন আর আমরা মাছে-ভাতে বাঙালি নাই। আমরা এখন ডালে-ভাতে বাঙালি। মাছ বিদেশে রফতানি হইয়া যাইতেছে। খাল-বিল ভরাট করিয়া বহুতল ভবন নির্মাণ হইতেছে। সেই বহুতল ভবনের বাসিন্দারাই প্রতিদিন নানান কিছিমের মাছ খাইতেছে। মূলত তাহারাই এখন মাছে-ভাতে বাঙালি । যাহা হোক, আমার পড়শি ভদ্রলোক ধার চাহিতে আসিয়াছিলেন বলিয়া এতদ সংক্রান্ত কিছু অভিজ্ঞতার কথা বয়ান করিলাম। পাঠক হয়তো ভাবিতেছেন, মনাম সাহেব ধারের ওপর এত বয়ান করিবার কারণ কী ? তিনি আবার আমাদের নিকট ধার চাহিয়া বসিবেন নাতো ! না ভাই, ভয়ের কিছু নাই। আমি নতুন করিয়া কোন ধার আপনাদের নিকট চাহিব না। আপনারা যে এই অধমের লেখা পড়িয়া ফেসবুকে প্রেরণামূলক মন্তব্যে আমাকে উৎসাহিত করিয়া থাকেন, তাহাতেই এই অধম আপনাদের নিকট চির ঋণী থাকিয়া গেলাম।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক