মনাম এর বৈঠকখানা দৃষ্টিভ্রমে সমাজে ভুল বার্তা ছড়ায়

42

মনসুর নাদিম

দেখিতে দেখিতে ঈদ আসিয়া গেল। গুলবদন আর মেহেরজানের মন খারাপ শপিং এ যাইতে পারিতেছেনা। গত বছরও তাহারা ঈদের কেনাকাটা করিতে পারে নাই। দলে দলে মানুষ মরিতেছে সেই চিন্তায় মন খারাপ ছিল। ভাবিয়াছিল বাঁচিয়া থাকিলে আগামী বছর মানে এই বছর আমাকে বকরা বানাইয়া জবরদস্ত ঈদ করিবে, মাগার তাহারা ভাবিলে তো হইবেনা। ভাবনা চিন্তা পরিকল্পনা তামাম কিছু একজনই করিয়া থাকেন। তিনি ইনসানকে বড়ই ভালবাসিয়া থাকেন। কখন হাঁচিতে হইবে, কখন কাশিতে হইবে, কখন কাঁদিতে হইবে কখন হাসিতে হইবে তামাম কিছু সিস্টেমে ঢালিয়া দিয়াছেন। তাই সিস্টেম অনুযায়ী তামাম কাম চলিতে থাকে। ইনসান জল্পনা-কল্পনা করিয়াও স্রষ্টার পরিকল্পনার লেজ মাথা খুঁজিয়া পাইবেনা। দুনিয়াতে মানুষ এতই বেপরোয়া হইয়াছে যে, স্রষ্টার সহিত টেক্কা দিতে আরম্ভ করিয়াছে। সিরিয়ার সমুদ্র সৈকতের সেই শিশুটির কথা এখন সবাই বলাবলি করিতেছে। সে ঈশ্বরকে তামাম কিছু বলিয়া দিয়াছে। আসলে ঈশ্বরকে বলিতে হয়না। ঈশ্বর তামাম কিছু অবগত আছেন। ঈশ্বর মানুষকে ছাড় দেয় মাগার ছাড়িয়া দেয়না। এক করোনা’য় মানুষ নয় স্রেফ বড় বড় বিজ্ঞানীদের কাপড় বরবাদ করিয়া দিশাহারা করিয়া ছাড়িয়াছে। এইবার আরও খতরনাক ছুরতে ভারতীয় করোনা’র লক্ষণ কয়েকজনের দেহে ধরা পড়িবার পর সচেতন মহলে ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করিতেছে। ১২ মে হইতে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলংকা ও নেপালের লোকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করিয়াছে সেই মুল্লুকের জাতীয় জরুরি সংকট ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ।আমাদের বেশিরভাগ মানুষ অসচেতন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী কহিয়াছেন-‘ঈদ যাত্রা সুইসাইড সিদ্ধান্তের শামিল’। এই কথাটা ইনসানদের কর্ণ কুহরে প্রবিষ্ট করাইতে আরও কত হাজার মানুষের আত্মঘাতি দিতে হইবে এখন তাহাই দেখিবার বিষয়।
যাহা হোক, এইবারও আমার দুই বিবির ঈদ হইল না। লেকিন তাহারা আফসোসও করিতেছে বলিয়া মনে হইতেছেনা। শপিংমল খুলিয়া দেওয়ায় নাতিন গুলতানি খুশিতে নাচিতেছে। বাচ্চা মানুষ ভালো করিয়া দুনিয়া দেখে নাই। বোধ বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষেরাই আবালের মতো আচরণ করিতেছে আর ইহারা তো বাচ্চা মানুষ। ফেরিঘাটে,বাস স্টপে মানুষের কান্ড দর্শনে মনে হইতেছে ইনসান করোনা’য় মরিতে রাজি আছে মাগার না খাইয়া, ঈদ নাকরিয়া মরিতে বিলকুল রাজি নাই। দুনিয়া কবরস্থান আর শ্মশান হইলেও তাহাদের ঈদ করিতেই হইবে। আজব ইনসান তাজ্জব কারবার।ভারতে অক্সিজেনের আকাল। মানুষ মরিতেছে দলে দলে। সেখানে কেউ কেউ করোনা’র প্রতিষেধক হিসেবে গো-মূত্র সেবন করিতেছে দেখিয়া তাজ্জব বনিয়া গেলাম। ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোরারজী দেশাই প্রত্যুষে গাত্র উত্থান পূর্বক প্রতিদিন নিজ মূত্র পান করিতেন বলিয়া শুনিয়াছি। প্রাণীর দেহ হইতে যাহা নির্গত হয় তাহাই অপবিত্র নাপাক। এই নাপাক দূষিত পদার্থ কোন সুস্থ বিবেক সম্পন্ন ইনসান খাইতে কিংবা সেবন করিতে পারেনা। অথচ শিক্ষিত লোকেরা যখন এই কর্মটি করিয়া থাকেন তখন তাজ্জব না হইয়া পারিনা। গত জুমার দিনে সকিনার বাপের লুঙ্গিতে প্রস্রাবের ছিটা পড়িলে সন্দেহে গোসল করিতে গিয়া আমাদেরকে একঘণ্টা এন্তেজার করাইয়াছিল। মাস্টার সাহেব কহিয়াছিলেন সন্দেহজনক স্থানে পানি দিয়া ধৌত করিয়া দিলে হইবে। লেকিন সকিনার বাপ গোসল না করিয়া স্বস্তি পাইবেনা বলিয়া সাফ কহিয়া দিলেন।
বৃষ্টি হইবে হইবে করিয়াও আশাব্যাঞ্জক বৃষ্টি হইতেছেনা। মাঝে মাঝে বৃষ্টির নুপুরের ঝংকার শোনা গেলেও চিত্ত শীতল হইবার মত সুর তুলিতে পারিতেছেনা। গরমে অস্থির। রোজার সময় বেলা-অবেলায় বিদ্যুতের বেরসিক আচরণ বিলকুল পছন্দনীয় নয়। এই সময়ে ফুয়াদের গল্পের চড়ুইদের মতো ফুড়ুৎ আর ফুড়ুৎ করিতে থাকা বিদ্যুৎ এর ভানুমতির খেল বিলকুল অসহ্য। বিদ্যুৎ অফিসে কারণ জানিতে চাহিলে সন্তোষজনক কোন জবাব পাইনা। বিদ্যুতের পেরেশানির সহিত যোগ হইয়াছে মশার উপদ্রব। গত ৩ মে ২০২১ এর দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সংবাদের একটা শিরোনাম ছিল “মশা মারতে বছরে ব্যয় দেড় কোটি টাকা’। খবরটা পড়িয়া সকিনার বাপ হাসিতে হাসিতে সোফার ওপর চিত হইয়া গেল। সত্তর দশকের পর হইতে এলাকায় মশার ওষুধ ছিটাইতে নাকি তিনি দেখেন নাই। এই দেড় কোটি টাকা কোথায় খরচ হইল ভাবিয়া পাইতেছেনা। রূপপুরের বালিশকান্ড ভাইরাল হওয়ার পর আরও কত কান্ড হাটে-ঘাটে ঘটিতেছে তাহার ইয়ত্তা নাই।গোটা মুল্লুকটা চাটার দলে ভরিয়া গিয়াছে। আজকাল মিডিয়ায় মিডিয়ায় ত্রাণ, মিডিয়ায় মিডিয়ায় সমাজসেবা, মিডিয়ায় মিডিয়ায় প্রচার। বাস্তবে ঠন ঠন। কাজীর গরুর মত খাতায় আছে গোয়ালে নাই।এই অর্থ মশা মারিতে নাকি মশা প্রজননে খরচ হইয়াছে তাহা জাতি জানিতে পারিলে ধোঁয়াশা কাটিয়া যাইত। চট্টগ্রাম যেন মশার নগরীতে পরিণত হইয়াছে। দিনেদুপুরেও কোথাও মশার উৎপাতে বসা যায়না। সন্ধ্যায় মশার জুলুস নিকালে যেন। মশার আক্রমণে মানুষ মাইকেল জ্যাক্সসনের মতো হেলিয়া দুলিয়া নাচিতে থাকে।জওয়ানির সময়ে হিন্দি বাইস্কোপ মাদার অব ইন্ডিয়াতে দেখিয়াছিলাম দুর্ঘটনাজনিত কারণে রাজকুমারের হাত দুইটা অকেজো হইয়া গেলে তিনি আত্মহত্যার উদ্দেশ্যে নিরুদ্দেশ হইয়া যান। ঐ সময়ে সমাজের মানুষদের আত্মসম্মানবোধ প্রখর ছিল। কাহারো বোঝা হইয়া বাঁচিয়া থাকার চাইতে মরিয়া যাওয়ায় শ্রেয় মনে করিতেন অধিকাংশ মানুষ। এখনো এই ছুরতের কিছু মানুষ আছে। এইছুরতের একলোক দুর্ঘটনায় তাহার একটি হাত হারাইয়া হতাশ হইয়া ভাবিতে লাগিল এক হাত লইয়া বাঁচিয়া থাকিয়া কী লাভ ? বরং এই জীবন বিসর্জন দিয়া কষ্ট ও অক্ষমতা হইতে নিষ্কৃতি পাওয়ায় ভালো। ভাবিতে ভাবিতে একটা বহুতল ভবনের ছাদে উঠিয়া গেল। উদ্দেশ্য চোখ বন্ধ করিয়া লাফ দিয়া জীবনের ইতি টানিয়া দিবে। আচানক নিচের দিকে তাকাইয়া দেখিল দুইহাত নাই এইরকম এক লোক প্রচন্ড খুবছুরতের সহিত মাইকেল জ্যাকসনের মতো নাচিতেছে। লোকটি তাজ্জব হইয়া ভাবিতে লাগিল, আমার একটিমাত্র হাত নাই দেখিয়া আমি আত্মহত্যা করিতে বিল্ডিং এর ছদে উঠিয়াছি। আর এই লোকটার দুইটা হাত না থাকা সত্তে¡ও এত ফুর্তি কিসের সেই রহস্য না জানা পর্যন্ত আমি মরিতে পারিনা। একহাত ওয়ালা লোকটি নিচে নামিয়া আসিয়া দুই হাত হারা লোকটাকে জিজ্ঞাসা করিল-ভাই আমার একহাত নাই দেখিয়া আমি লজ্জায় আত্মহত্যা করিতে বিল্ডিং এর উপরে গিয়াছিলাম। কিন্তু তোমার দুই হাত নাই তবুও কিসের আনন্দে তোমার এত নাচানি-কুদানি তাহা জানিতে নিচে আসিয়া পড়িলাম। লোকটি রাগে গজগজ করিয়া কহিল-আমি কী সাধে নাচিতেছি ? আমার পিঠ চুলকাইতেছে কোন রকমে চুলকাইতে পারিতেছিনা সেই জ্বালায় লাফাইতেছি। অনেক সময় আমরা যাহা দেখি তাহা ঠিক নাও হইতে পারে। আর এই দৃষ্টি ভ্রমের কারণে সমাজে ভুল বার্তা ছড়াইয়া পড়ে।
যাহা হোক, পটিয়ায় এক ইফতার মাহফিলে মারামারির খবর শুনিয়া তাজ্জব বনিয়া গেলাম।আফসোস ! আমরা এখনো মানুষ বনিতে পারিনাই। মুসলমান তো দূর কি বাত। ইফতার এর গুরুত্ত্ব যাহারা অনুধাবন করিতে অক্ষম তাহারা ইফতার মাহফিলের মতো পুণ্যময় ও বরকতময় মাহফিলের এন্তেজাম করিতে যায় কেন ? ঘটনা যাহাই থাকুক একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ অনাবিল অনুষ্ঠানে এই নোংরামি না করাই উচিৎ ছিল। কিছু লোকের কারণে বারবার ইসলাম ও মুসলমান সমালোচিত হইতেছে। মানবসেবা আর সমাজসেবা করিতে গিয়াও অনেক অপ্রীতিকর ঘটনার সম্মুখীন হইতেছি। ইনসান বড় আজীব প্রাণী। একজন রাত দশটায় আসিয়া দরোজায় হাজির, করোনা আক্রান্ত তাহার বোনের শ্বাসকষ্টের জন্য মোস্তফা হাকিম ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রদত্ত ফ্রি অক্সিজেন সিলিন্ডার নেয়ার জন্য। আমার ওয়ার্ডে আমি মোস্তফা হাকিম ফাউন্ডেশনের পক্ষে গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ বৃহত্তর মাইজ পাড়া মুন্সি মিয়াজি রাহমাতুল্লাহি ইউনিটের সৌজন্যে এই সেবা দিয়া যাইতেছি। তিনি সিলিন্ডার এবং রেগুলেটর লইয়া গিয়াছেন মাগার ফেরত দিতে অতিরিক্ত বিলম্ব হওয়ায় আমি ফোন করিলে তিনি জানাইলেন রেগুলেটর পড়িয়া ভাঙিয়া গিয়াছে। তিনি তাহা কিনিয়া দিবেন। মাগার ইহার পর হইতে ফোন ও রিসিভ করিতেছেন না। তাই বলি মানুষের সেবা করিতে যাইয়া মানুষের হাতেই নাকানি চুবানি খাইতে হয়। এই ছুরতের মানুষ হইতে আল্লাহপাক সমাজকে রক্ষা করুন।যেখানে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে করোনা রোগীর চিকিৎসা, অক্সিজেন, পরিবহণ লইয়া চরম বাণিজ্য চলিতেছে সেখানে আমাদের দেশে সরকারের পাশাপাশি সমাজের ধনাঢ্য পরিবার ও বিভিন্ন মানবিক সংগঠন আগাইয়া আসিয়াছে এবং সেবা প্রদান করা হইতেছে। আমাদের উচিৎ তাহাদেরকে প্রেরণা দিয়া সহযোগিতা করিয়া সচল রাখা। মনে রাখিতে হইবে এই ছুরতের সংকট সামাল দেওয়া সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়।
লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক