মধ্য অক্টোবরে বিদায় নিচ্ছে বর্ষা মৌসুম

36

তুষার দেব

বর্ষপঞ্জিকার দিন-ক্ষণের হিসাবে শরতের ভরা যৌবন চললেও দেশের আবহাওয়া পরিস্থিতিতে মৌসুমি বায়ু এখনও মোটামুটি সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে দুর্বল অবস্থায় বিরাজ করছে। তবে চলতি অক্টোবর মাসের প্রথমার্ধের মধ্যেই দেশ থেকে ধীরে ধীরে পাততাড়ি গুটিয়ে বিদায় নেবে মৌসুমি বায়ু বা বর্ষা। এরপর চলতি মাসের শেষ দিকে এবং পরবর্তী নভেম্বরে বঙ্গোপসাগরে এক থেকে দুটি করে নিম্নচাপ সৃষ্টি হতে পারে। অনুক‚ল পরিবেশ থাকায় সাগরে সম্ভাব্য নিম্নচাপের অন্তত দুটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে বলে আভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণকারী সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তা বলছেন, প্রকৃতির চিরায়ত বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে মৌসুমি বায়ুর বিদায়ের পরপরই সাধারণত মধ্য অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সাগরে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির উপযুক্ত সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। এই সময়কালের মধ্যে সাগরে অস্থিরতা বৃৃদ্ধি পেয়ে ঘন ঘন লঘুচাপ সৃষ্টি হয়। যার কোনো কোনোটি নিম্নচাপ আকারে ঘণীভ‚ত হয়ে ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিয়ে থাকে। এবারও চলতি মাসের প্রথমার্ধের মধ্যে বর্ষাকাল আনুষ্ঠানিকভাবে দেশ থেকে বিদায় নিতে যাচ্ছে। আর বর্ষার বিদায়ের পর আবহাওয়া পরিস্থিতিতে অনুকূল পরিবেশ বিদ্যমান থাকায় মাসের শেষার্ধেই বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হতে পারে দুই থেকে তিনটি লঘুচাপ। এর মধ্যে অন্তত একটি নিম্নচাপে পরিণত হয়ে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে।
এদিকে, জলবায়ুর অবস্থায় প্রাপ্ত আবহাওয়া উপাত্ত, ঊর্ধ্বাকাশের আবহাওয়া বিন্যাস, বায়ুমন্ডলের বিভিন্ন স্তরের বিশ্লেষিত আবহাওয়া মানচিত্র, জলবায়ু মডেল, বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার অনুমোদিত গ্লোবাল প্রডিউসিং সেন্টার থেকে প্রাপ্ত মডেল পূর্বাভাস এবং এল নিনো-লা নিনা’র অবস্থা যথাযথ বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞ কমিটি তিন মেয়াদী আবহাওয়ার যে পূর্বাভাস দিয়েছে, তাতে চলতি অক্টোবরে দেশে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের পাশাপাশি এ মাসের প্রথমার্ধের মধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বা বর্ষা ক্রমান্বয়ে বিদায় নিতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া, চলতি মাসের শেষার্ধে বঙ্গোপসাগরে এক থেকে দু’টি নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়ে তার মধ্যে অন্তত একটি ঘূির্ণঝড়ে রূপ নিতে পারে বলেও আভাস দেয়া হয়েছে। পরবর্তী নভেম্বর মাসে দিন ও রাতের তাপমাত্রা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাওয়ার সাথে সাগরে একাধিক নিম্নচাপ সৃষ্টি হতে পারে। তার মধ্যেও অন্ততঃ একটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে বলে পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে।
অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশিদ পূর্বদেশকে বলেন, কাগজে-কলমে প্রকৃতিতে শরতকাল চললেও দেশের আবহাওয়ার ওপর এখনও মৌসুমি বায়ুর সক্রিয় অবস্থান রয়েছে। যদিও উত্তর বঙ্গোপসাগরে তার দুর্বল অবস্থায় বিরাজ করছে। মৌসুমি বায়ু বিদায় নেয়ার এই সময়কালে বিক্ষিপ্তভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে হালকা থেকে মাঝারি ধরণের বৃৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টিপাত হতে পারে। সাধারণত মৌসুমি বায়ুর বিদায়ের পর সাগরে গোলযোগের ঘনঘটার আলামত পরিলক্ষিত হয়। শীতের প্রাক-প্রস্তুতি পর্বে সাগরে একাধিক ঘূর্ণিঝড় তৈরি হওয়ারও প্রবণতা থাকে। আবহাওয়ার বিরাজমান পরিস্থিতিতে এখন পর্যন্ত তার ব্যতিক্রম কিছু ঘটছে না বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সংরক্ষিত রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, পূর্ববর্তী প্রায় ছয় দশকের ইতিহাস পাল্টে দিয়ে বিগত ২০১৯ সালে রেকর্ড দেরিতে শরতের শেষদিকে এসে দেশের স্থলভাগ থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে নিয়েছিল দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুপ্রবাহ। তার পরের বছর বর্ষার বিলম্বিত বিদায় সেই রেকর্ডও ছাড়িয়ে যায়। গত বছর অর্থাৎ ২০২০ সালে শরৎ পেরিয়ে হেমন্তের শুরুতে গিয়ে দেশের স্থলভাগের ওপর থেকে মৌসুমি বায়ুপ্রবাহের পুরোপুরিভাবে প্রস্থান ঘটে। তাতে ঋতু-পরিক্রমা থেকে আস্ত শরতকালই বিলম্বিত বর্ষার পেটে হাওয়া হয়ে যায়। আর চলতি মৌসুমে ‘তালপাকা’ ভাদ্র পেরিয়ে মধ্য-আশ্বিনেও মৌসুমি বায়ু দেশের ওপর মোটামুটি সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে দুর্বল অবস্থায় বিরাজ করার কথা জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা।
আবহাওয়া অধিদপ্তরে পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘকাল থেকেই খ্রীস্টাব্দের মে মাসের শেষের দিকে বঙ্গোপসাগর থেকে টেকনাফ উপকূল হয়ে দেশের স্থলভাগে প্রবেশ করে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুপ্রবাহ। কাগজে-কলমে না হলেও তখন থেকেই অনানুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ষড়ঋতুর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দৈর্ঘ্যরে বর্ষাঋতুর। বাদল ধারার এই ঋতুর বিদায় ঘটে সেপ্টেম্বরের শেষে এসে। কিন্তু গত কয়েকবছর ধরে বর্ষা শুরু হতেই জুনের মাঝামাঝি থেকে শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লেগে যাচ্ছে। আর শেষ হচ্ছে অক্টোবরে এসে। বর্ষপঞ্জিকা ও ঋতুচক্রের হিসাবে আষাঢ়-শ্রাবণ মাসকে বর্ষাকাল ধরা হলেও শরতের মাঝামাঝি পর্যন্ত বর্ষার জের থেকে যায়। স্বাভাবিক নিয়মে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুপ্রবাহের প্রস্থানেই আনুষ্ঠানিক বিদায় ঘটে বর্ষার। এরপর উত্তুরে হাওয়ায় ভর করে শীতের আগমন ঘটতে থাকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রভাবে আবহাওয়ার চিরায়ত বৈশিষ্ট্য ও আচরণগত দিক থেকে খামখেয়ালিপনা পরিলক্ষিত হচ্ছে। ক্যালেন্ডারের পাতা বা বর্ষপঞ্জিকায় যাই থাকুক না কেন- আবহাওয়াবিদরা দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু যেদিন সমুদ্র-উপকূল দিয়ে দেশের স্থলভাগে প্রবেশ করে, সেদিন থেকেই বর্ষাকাল গণনা করেন। প্রতিবেশি দেশ ভারতের কেরালা ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য হয়েই সমুদ্রকন্যা কক্সবাজারের সীমান্তবর্তী টেকনাফ উপকূল দিয়ে দেশের স্থলভাগে মৌসুমি বায়ুর প্রবেশ ঘটে। দীর্ঘ এই অঞ্চলজুড়ে কমবেশি প্রায় তিন থেকে চার মাস পর্যন্ত অবস্থান শেষে ধীরে ধীরে মৌসুমি বায়ুর বিদায় ঘটে। এ বায়ুর অবস্থানকালীন সময় পর্যন্ত বাংলাদেশ ও প্রতিবেশি ভারতের সীমান্ত অঞ্চলের রাজ্যগুলোতে বৃষ্টিপাত বেশি হয়। প্রতিবছর জুনের মাঝামাঝিতে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বা বর্ষার প্রবেশ ও বিস্তার ঘটলেও এবার ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াস’ তার পালে হাওয়া দিয়েছে। এ কারণে খানিকটা আগে-ভাগেই গত ৬ জুন দেশের স্থলভাগে বর্ষণসিক্ত মৌসুমি বায়ুর প্রবেশ ঘটে। অনুক‚ল পরিবেশে তা এক সপ্তাহের ব্যবধানে দেশজুড়ে বিস্তার লাভ করে। মৌসুমি বায়ু বিস্তার লাভ করার শুরুতেই চট্টগ্রামসহ দেশের বেশকিছু জায়গায় অতি ভারী বর্ষণ হয়।