মধ্যযুগের তুঘলকি কান্ড সাম্প্রতিক বিশ্ব প্রেক্ষাপট

19

 

আমরা স্বীকার করি আর নাই করি এটি সত্য যে, ইতিহাসের কিন্তু পুনরাবৃত্তি ঘটে। ইতিহাসে সেরকম অনেক উদাহরণ আছে। আজ জানবো সেরকম একটি ঘটনা।
ইতিহাসের গতি প্রকৃতি পাল্টে দেওয়ার জন্য একজন ব্যক্তিই যথেষ্ট। ব্যক্তির কর্মগুণেই কিন্তু বংশ কিংবা দেশের নাম ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় হয়ে থাকে।
ইতিহাসে বহু রাজা, সুলতান, সম্রাট স্মরণীয় হয়ে আছেন নিজেদের কর্মগুণে। তবে এখানে’ ক্ষমতা পরিচালনার ব্যবস্থাপনা ‘একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যিনি যত পরিকল্পনামাফিক এবং জনগণের মতামতকে প্রাধান্য দিয়েছেন ইতিহাস সেই সুলতান বা সম্রাটকে ভালোভাবে স্মরণ করে রেখেছে।
তবে রাজ্য বলেন কিংবা সাম্রাজ্য বলেন ,সুলতান যখন জনগণের মতামতকে প্রাধান্য দেন এবং সাথে সুষ্ঠু পরিকল্পনা করে রাজ্যের বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করেন তখন এর সুফলও পরবর্তী বংশধর কিংবা প্রজন্মও ভোগ করেন।
ইতিহাসের কথা যখন উঠলই তাহলে চলুন একটু মধ্যযুগের দিকে ফিরে যায়।
১৩২৫ খ্রিঃ দিকে মধ্যযুগীয় ভারতের ইতিহাসে একজন উল্লেখযোগ্য সুলতানের আবির্ভাব ঘটে। তিনি হলেন তুঘলক বংশের শাসক সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলক। যথারীতি সুলতানকেও সাম্রাজ্যের বহু ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে সিংহাসন আরোহন করতে হয়। এরপর সুলতান রাজ্যের শাসনব্যবস্থার উন্নয়ন ও জনগণের সুযোগ সুবিধার কথা চিন্তা করে পাঁচটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেন। যা বর্তমানে ‘ মেগা প্রকল্প ‘ বললে ভুল হবে না।
পাঁচটির মধ্যে প্রথমটি ছিল দিল্লি থেকে দাক্ষিণাত্যের দেবগিরিতে রাজধানী স্থানান্তর। পরিকল্পনাটি নেওয়ার মূল কারণ ছিল, দিল্লি সাম্রাজ্যের একপ্রান্তে হওয়ায় সুদূর দাক্ষিণাত্যে বিদ্রোহ দমন, রাজ্য বিস্তার কিংবা সুশাসন কায়েম করা অসম্ভব ছিল। যার ফলে সিংহাসন আরোহন করেই তিনি একক সিদ্ধান্তে সাম্রাজ্যের মধ্যস্থল দেবগিরিতে রাজধানী স্থাপন করেন। সুলতান জনগণের কথা চিন্তা করে নতুন রাজধানীতে নতুন নগর, সুরম্য রাজপ্রাসাদ, দিল্লি হতে দেবগিরি পর্যন্ত সুদীর্ঘ সাতশত মাইল রাস্তা নির্মাণ করেন। এমনকি রাস্তার পার্শ্বে সরাইখানা স্থাপন, বৃক্ষরোপণ, কূপ খনন করে বিনামূল্যে খাদ্য ও পানীয়র ব্যবস্থা করেন। নতুন রাজধানীতে গমনের জন্য সুলতান কঠোর নির্দেশ জারি করেন। আবাল, বৃদ্ধ, অন্ধ, খোঁড়াদেরও তিনি নিয়ে যান। এমনকি প্রাসাদের ছাদে উঠে দেখেন কোনো ঘরে আলো দেখা যায় কিনা!
এখন মনে মনে প্রশ্ন আসতে পারে সুলতানের এই মেগা প্রকল্পটি কি সফল হয়েছিল ?
বেশ কিছু কারণে সুলতানের এই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। দিল্লি জনমানব শূন্য হয়ে পড়ায় সেখানে ঘন ঘন মোঙ্গল আক্রমণ, বিদ্রোহ ও অরাজকতা দেখা দেয়। অপরদিকে সেখানকার উষ্ণ আবহাওয়া সাধারণ জনগণ সহ্য করতে পারে নি আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো সুলতান এত বড় সিদ্ধান্তটি নিয়েছেন জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করে। যার ফলে মাত্র আট বছরের মাথায় সুলতানকে আবার দিল্লিতে ফিরে আসতে হয়।
সুলতানের এই মেগা পরিকল্পনায় ব্যয় হয় প্রচুর অর্থ ও সময়। এতে দিল্লি সালতানাতের রাজকোষ প্রায় শূন্য হয়ে পড়ে।
সুলতানের দ্বিতীয় মহাপরিকল্পনাটি ছিল খোরাসান অভিযান। যেহেতু তিনি একজন সুলতান স্বাভাবিকভাবেই সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব তাঁর থাকবেই। এই অভিযানটি পরিচালনা করতে গিয়ে সুলতানকে ৩৭০০০ সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী গঠন করতে হয়। এ বিশাল বাহিনীর ভরণ-পোষণ করতে গিয়ে রাজকোষে পূর্বে ন্যায় আর্থিক সংকট দেখা দেয়। পরবর্তীতে চুক্তির মাধ্যমে এটি বাতিল করেন। কিন্তু ততক্ষণে যা ঘটার ( রাজকোষের শূন্যতা) ঘটে গেছে।
পূর্বের দুই পরিকল্পনায় সুলতানের প্রচুর অর্থ ব্যয়ের কারণে রাজকোষে যখন শূন্যতা দেখা দেয়, ঠিক সেসময় অর্থ ঘাটতি কাটিয়ে তুলতে তিনি তৃতীয় পরিকল্পনাটি গ্রহণ করেন। সেটি হলো প্রতীকী মুদ্রা প্রচলন। তিনি চীনের সম্রাট কুবলাই খানকে অনুকরণ (এখানেও চীন) করে প্রতীকী মুদ্রা প্রবর্তন করেন। সুলতান নিজেই প্রচুর অপরিমিত অর্থ দান করতেন। যার ফলে সুলতানের এই পরিকল্পনাটিও বেশি দিন স্থায়ী হলো না।
চতুর্থ পরিকল্পনাটি ছিল কারাচিল অভিযান। বিভিন্ন কারণে তাঁর এই পরিকল্পনাটিও ব্যর্থ হয়। সুলতানের পর পর চারটি পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ায় সাম্রাজ্যে তীব্র আর্থিক সংকট দেখা দেয়। ফলে এই সংকট পুষিয়ে নিতে তিনি পঞ্চম ও শেষ মেগা পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। সেটি হলো দোয়াব অঞ্চলে কর বৃদ্ধি। কর বৃদ্ধির পরপরই সেখানে দেখা দেয় চরম দুর্ভিক্ষ, ফলে এই পরিকল্পনাটিও ব্যর্থ হয়।
সুলতান শিক্ষা, সংস্কৃতি, দর্শন, বিজ্ঞান, ভেষজবিজ্ঞান, জ্যোর্তিবিদ্যা,ভাষাতত্ত¡ ও প্রখর স্মৃতিশক্তিরসহ বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। বিচারের ব্যাপারে তিনি সর্বদা ন্যায়পরায়ণ ছিলেন। মধ্যযুগীয় ভারতের ইতিহাসে তিনিই সম্ভবত সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও বিভ্রান্তিকর সুলতান ছিলেন। যাঁর ছিল অসাধারণ প্রতিভা ও অদম্য কর্মশক্তি।
এতগুণে গুণান্বিত হওয়ার পরও সুলতানের ব্যর্থতাগুলোই বড় করে স্থান পেয়েছে ইতিহাসে। কিন্তু কেন?
সাম্রাজ্যের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের কারণেই তিনি জনগণের সমর্থন হারান। জনগণের রোষানলে পড়তে হয় সুলতানকে। তাঁর এসব খামখেয়ালিপনা পরিকল্পনাগুলো একসময় ‘তুঘলকি কান্ড’ বলে প্রকাশ পেতে থাকে জনমুখে।
তাঁর নেয়া বিভিন্ন মহা পরিকল্পনাগুলোই দিল্লি সালতানাতের পতনের জন্য অনেকটাই দায়ী ছিল বলে মনে করেন ঐতিহাসিকগণ।
প্রতিটি রাজ্য কিংবা সাম্রাজ্য পরিচালিত হয় রাজকোষকে কেন্দ্র করে। সেখানে যদি রাজকোষই শূন্য হয়ে পড়ে তাহলে সুলতানের গুণ দিয়ে কি হবে!
তবে এখানে জনগণ যে ভুলটি করেছেন সেটি হলো সুলতানকে পুরোপুরি অনুধাবন করতে না পারা। আর সুলতানের ভুল ছিল,পরিকল্পনা প্রণয়নের ব্যাপারে কারো মতামতকে প্রাধান্য না দিয়েই যখন যে পরিকল্পনা মাথায় আসে তা হুটহাট বাস্তবান করে ফেলা।
এইতো গেল মধ্যযুগের কথা, এবার আসি সা¤প্রতিক(যুগে) সময় বেশ আলোচিত ঘটনা ‘ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট’ নিয়ে।
যা অনেকটাই মধ্যযুগের সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা নিজেদের বাজেট ও বাণিজ্য ঘাটতি মেটাতে ধার করে বিপুল পরিমাণ অর্থ। তার উপর সুলতানের ন্যায় মেগা পরিকল্পনাতো আছেই।
চীনের কাজ থেকে ঋণ নিয়ে অবকাঠামো খাতে একের পর এক উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে শ্রীলঙ্কান সরকার। ফলে অর্থনীতিতে নেমে এসেছে বিপর্যয়। চীনা থেকে কোটি কোটি ডলার ঋণে তৈরি করা হয়েছে গভীর সমুদ্র বন্দর, সম্মেলন কেন্দ্র (যা অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে ছিল), বানানো হয়েছে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, রাজধানী কলম্বোর পাশে ৬৬৫ একর জায়গায় দুবাইয়ের আদলে গড়ছে বিলাসবহুল কৃত্রিম শহর। সেই প্রকল্পেরও অর্থায়ন করেছে চীন। এতগুলো অপরিকল্পিত মেগা প্রকল্প তৈরি করে, বর্তমান এমন অবস্থা হয়েছে যে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে পর্যন্ত হিমশিম খাচ্ছে শ্রীলঙ্কা। দুই দিন আগেও তারা কল্পনা করতে পারে নি তাদেরকে এমন এক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে। তাই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে না পারলে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটবেই। একটি দেশের প্রধান তিনি যেই হোন তিনি যদি ( সুলতান, সম্রাট কিংবা সরকার) পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রকল্পটি ভালোভাবে গবেষণা করে কাজ শুরু করা প্রয়োজন। না হয় মুহাম্মদ বিন তুঘলকের ন্যায় ‘তুঘলকি কান্ড’ ঘটে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকে যাবে।
যাই হোক পরিশেষে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, মধ্যযুগ বলেন আর সাম্প্রতিক সময়ে শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকটই বলেন ঘটনাটি আমাদের সবাইকে একটি বার্তা দিয়ে যাচ্ছে আর তা হলো ‘জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস’।
প্রকৃতপক্ষে ইতিহাস থেকে একটা ধারণা পেলাম তা হলো, স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু বলে কিছু নেই, একমাত্র স্বার্থই সবচেয়ে বড় বন্ধু। সেই স্বার্থ যদি হয় জনগণকে নিয়ে তাহলে তো আর কথাই নেই।

লেখক : কলেজ শিক্ষক, প্রাবন্ধিক