ভয়াবহ শব্দদূষণে স্বাস্থ্যঝুঁকি

25

নগরজুড়েই শব্দদূষণের মাত্রা দিন দিন বেড়ে চলছে। পুরো শহরের এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে শব্দের মাত্রা স্বাভাবিক আছে। শহরের প্রায় সব এলাকাতেই শব্দ গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে প্রায় দেড়গুণ বেশি। মাত্রাতিরিক্ত শব্দদূষণের কারণে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন নগরবাসী।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানান, শব্দদূষণের কারণে কানে কম শোনা, বধিরতা, হৃৎকম্প, হৃদরোগ, শিশুদের লেখাপড়ায় মনোযোগ কমে যাওয়া, মানসিক বিকাশ বিঘ্নিত হওয়া, খিটখিটে মেজাজ, পেটের আলসার, অনিদ্রা, মানসিক উত্তেজনা ও উদ্বিগ্নতা বা অ্যাংজাইটি, স্ট্রোক ইত্যাদি। কর্মজীবীদের ভেতরে কাজের দক্ষতা, মনোযোগ কমে যাওয়া ও সহজেই মেজাজ হারিয়ে ফেলার প্রবণতা দেখা যায়।
আমেরিকান হার্ট এসোসিয়েশনের মতে, শব্দের মাত্রা প্রতি ১০ ডেসিবেল বৃদ্ধি পেলে যেকোন বয়সে স্ট্রোকের ঝুঁকি ১৪ ভাগ করে বাড়তে থাকে। আর যদি তা হয় ৬৫ বছরের বেশি বয়সে তাহলে প্রতি ১০ ডেসিবেল বাড়লে স্ট্রোকের ঝুঁকি ২৭ ভাগ করে বাড়তে থাকে। এমনকি শব্দদূষণ মায়ের গর্ভের শিশুর শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধিকেও প্রভাবিত করে।
এদিকে চট্টগ্রাম নগরীর বেশকিছু এলাকায় অতিমাত্রায় শব্দদূষণের ঘটনা ঘটছে এমন কিছু স্পট চিহ্নিত করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। মুজিববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে পরিবেশ অধিদপ্তর শব্দদূষণমুক্ত দেশ গড়ার প্রত্যয়ে উল্লিখিত বিধিমালা অনুযায়ী শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও অংশীদারিত্বমূলক প্রকল্পের আওতায় প্রথমবারের মত নগরীর দুটি এলাকাকে ‘নো হর্ন জোন’ হিসেবে ঘোষিত করতে যাচ্ছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকা ও জামালখানের ডা. খাস্তগীর স্কুল এলাকা। অধিদপ্তরের এক জরিপে দেখা যায়, এ দুই এলাকার শব্দদূষণের পরিমাপ হলো ৭৫ দশমিক ৫ ডেসিবল। যদিও এসব এলাকায় শব্দের মাত্রা থাকার কথা ছিল দিনে ৫০ ডেসিবেল এবং রাতে ৪০ ডেসিবেল।
জানা যায়, শব্দদূষণ প্রতিরোধের লক্ষ্যে ২০০৬ সালের শব্দদূষণ বিধিমালা প্রণয়ন করা হলেও সেটা রয়েছে শুধু কাগজে কলমে। বিধি অনুযায়ী হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, উপাসনালয়ের সামনে এবং আবাসিক এলাকায় হর্ন বাজানো, মাইকিং করা সেই সঙ্গে সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের নামে জোরে শব্দ সৃষ্টি করা আইনত দন্ডনীয়। তবে সেই আইনের কোন প্রয়োগ নেই। শব্দদূষণের মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার পেছনে একেই প্রধান কারণ হিসেবে দায়ি করা হচ্ছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের গত ডিসেম্বরে সংগৃহীত নমুনা অনুযায়ী- পাহাড়তলী গার্লস হাইস্কুলের সামনে ৭৬.৬ ডেসিবল, ইস্পাহানি পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজের সামনে ৭৪.৫ ডেসিবল, ইউএসটিসির সামনে ৭৮.৫ ডেসিবল, চিটাগাং গভর্নমেন্ট গার্লস হাইস্কুলের সামনে ৬৮.৬ ডেসিবল, বাংলাদেশ মহিলা সমিতি স্কুলের (বাওয়া) সামনে ৭৮.৫ ডেসিবল, ডা. খাস্তগীর গভর্নমেন্ট গার্লস হাইস্কুলের সামনে ৭৫.৫ ডেসিবল, চট্টগ্রাম কলেজের সামনে ৭৮.৫ ডেসিবল, সিটি কলেজের সামনে ৬৭.৬ ডেসিবল, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে ৭৫.৫ ডেসিবল, চট্টগ্রাম মা ও শিশু মেডিকেল কলেজের সামনে ৬৭.৬ ডেসিবল, আন্দরকিল্লা জেমিসন রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতালের সামনে ৭১.৫ ডেসিবল, লালখান বাজার মমতা ক্লিনিকের সামনে ৭৭.৫ ডেসিবল, এ কে খান আল আমিন হসপিটালের সামনে ৭৬.৫ ডেসিবল, পাঁচলাইশ সার্জিস্কোপ হসপিটালের সামনে ৭৩.৫ ডেসিবল। পূর্ব নাসিরাবাদের সাদার্ন হসপিটালের সামনে ৬৯ ডেসিবল মাত্রায় শব্দের তীব্রতা পাওয়া যায়।
আর আবাসিক এলাকায় শব্দের মানমাত্রা ৫০ ডেসিবল হওয়ার কথা থাকলেও হলেও নগরীর চান্দগাঁও আবাসিক এলাকায় ৬৫ ডেসিবল, আমিরবাগ আবাসিকে ৬৭.২ ডেসিবল, হালিশহর কে-ব্লক আবাসিকে ৬৯ ডেসিবল, কল্পলোক আবাসিকে ৬৬.৫ ডেসিবল, হিলভিউ আবাসিকে ৬৭ ডেসিবল, কসমোপলিটন আবাসিকে ৬৭.৫ ডেসিবল ও খুলশী (দক্ষিণ) আবাসিকে ৭৬.৫ ডেসিবল শব্দের তীব্রতা পাওয়া যায়।
এছাড়া শিল্প এলাকা হিসেবে মানমাত্রা ৬০ ডেসিবল থাকার কথা হলেও মুরাদপুর একুশে হাসপাতালের সামনে ৬৯.৫ ডেসিবল ও মেহেদীবাগ ম্যাক্স হাসপাতালের সামনে ৭৬.৫ ডেসিবল মাত্রায় শব্দদূষণ পাওয়া যায়। একইভাবে বাণিজ্যিক এলাকায় ৭০ ডেসিবল শব্দের মাত্রা থাকলেও নগরীর এ কে খান মোড়ে ৮৪.৫ ডেসিবল, জিইসি মোড়ে সর্বোচ্চ ৯৭.৫ ডেসিবল, বহদ্দারহাট মোড়ে ৮৪.৫ ডেসিবল, আগ্রাবাদ মোড়ে ৮৮ ডেসিবল, সিইপিজেড মোড়ে ৮৭.৫ ডেসিবল ও অক্সিজেন মোড়ে ৭৭.৫ ডেসিবল মাত্রায় শব্দের তীব্রতা নির্ণয় করে পরিবেশ অধিদপ্তর।
পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মহানগরের উপ-পরিচালক নুরুল্লাহ নুরী বলেন, নগরীর বেশ কিছু স্থানে ভয়াবহ শব্দ দূষণের মাত্রা আমরা দেখেছি। প্রাথমিকভাবে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকা ও খাস্তগীর স্কুল এলাকায় ‘নো হর্ন জোন’ ঘোষণায় পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছি। ঘোষণা আসার পর ‘নো হর্ন জোন’ বাস্তাবায়নে জনসাধারণকে অবগত করার জন্য সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। প্রয়োজনে এসব এলাকায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে। তারপর পর্যায়ক্রমে শব্দ দূষণের মাত্রাভেদে অন্য এলাকাগুলোকে ‘নো হর্ন জোন’ হিসেবে ঘোষণা করা হবে।