ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের নজরদারি বাড়াতে হবে

5

দেশের বাজার ব্যবস্থার অস্থিতিশীলতা কাটছে না। সমগ্র দেশবাসীকে যদি দু’ভাগে বিভক্ত করা হয় তা হলে সংখ্যায় কম হলেও একটি শ্রেণিতে রয়েছে বিক্রেতা তথা ব্যবসায়ী সমাজ, অন্য শ্রেণিতে রয়েছে ক্রেতাসাধারণ তথা ভোক্তারা। এদেশের ব্যবসায়ী সংঘবদ্ধ। পুঁজির দাপটে তারা দেশের ক্রেতা সাধারণকে জিম্মি করে রেখেছে। সকল বিক্রিত পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করছে ঐক্যবদ্ধ অসাধু ব্যবসায়ী সমাজ। মনে হয় সরকার তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। দেশের নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যও ভোগ্যপণ্যের মূল্য সরকার তথা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নির্ধারণ করে দিলেও তা ব্যবসায়ীরা মানছে না। এদেশের অসাধু ব্যবসায়ীরা গুদামজাত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিসহ না না অজুহাতে সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে দেশে ভোগ্যপণ্যের মূল্য স্থিতিশীল হতে দিচ্ছে না। প্রায় একদশক ধরে দেশের কাঁচা বাজার ও খাদ্যদ্রব্যের অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির লাগাম থামছে না।
প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে কিছু ব্যবস্থা নিতে চাইলে বলে নানা অজুহাতের কথা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির পেছনে বাবসায়ীদের ষড়যন্ত্র এদেশে প্রমাণিত সত্য। তারপরও সরকার ও প্রশাসনের পক্ষে কোন দ্রব্যের মূল্য নিয়ন্ত্রনেরাখা সম্ভব হতে দেখা যায়নি। দ্রব্যমূল্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণ হিসেবে অসাধু ব্যবসায়ীর অপকর্ম প্রমাণিত হলেও জনগণ তথা ভোক্তারা এর কোন আশানুরূপ সুফল এপর্যন্ত পেতে দেখা যায়নি। এদেশের ভোক্তা সাধারণ সংঘবদ্ধ নয়। এদের কোন ট্রেড ইউনিয়ন নেই। দেশের ক্রেতাসাধারণ অসংগঠিত হবার কারণে তাদের ভোগান্তির শেষ নেই। আয়ের সাথে ব্যয় ও দ্রব্যমূল্যের কোন রকম সংগতি না থাকলেও ক্রেতা সাধারণ বাধ্য হয়ে অযৌক্তিক চড়ামূল্যে দ্রব্যসামগ্রী কিনতে বাধ্য হচ্ছে। ক্রেতারা বেশি বাড়াবাড়ি করতে চাইলে ব্যবসায়ীরা বলে মালামাল সংকটের কারণে তারা বিক্রি করতে পারছে না। অতিরিক্ত মূল্য দিলে মালামাল ঠিকই তাদের কাছ হতে ক্রেতারা পেয়ে যায়। পুরোদেশ যেন ব্যবসায়ীদের হাতে জিম্মি।
প্রকৃতপক্ষে দেশের সাধারণ মানুষের আয় বাড়েনি। দিনমজুর হতে শুরু করে স্বল্প আয়ের কর্মচারী এবং মধ্যসারির বেতনধারি কর্মকর্তা কর্মচারিতা অতিকষ্টে জীবনযাপন করছে। অবৈধ ও অসাধু উপায়ে যারা রোজগার করে তাদের কথা বলাবাহুল্য। ঘুষখোর, সুদখোর, দুর্নীতিবাজ চাকরিজীবীর সংখ্যার চেয়ে সাধারণ স্বল্প আয়ের মানুষের সংখ্যা দেশে বেশি। মোদ্দা কথা নিরীহ সাধারণ মানুষ দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন অত্যাচারে অতিষ্ঠ। কিন্তু তারা তাদের সমস্যার কোন প্রকার সুরাহা করতে অক্ষম। কেননা দেশের ভোক্তা তথা ক্রেতাসাধারণের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য কোন সংগঠন তো নেই। অসংগঠিত হবার কারণে দেশের দ্রব্যমূল্যের কোন রকম স্থিতিশীলতা আসছে না। এমতাবস্থায় সবেধন নীলমনি স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারি প্রতিষ্ঠান ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করলেও তা পর্যাপ্ত নয়। ভোক্তা অধিকার বিভিন্ন স্থানে মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে ব্যবসায়ীদের জরিমানা করতে দেখা যায়। জরিমানা ব্যবসায়ীদের জন্য কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হতে পারে না, অপরাধিদের ব্যবসা করার অধিকার খর্ব করা প্রয়োজন। দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার এক প্রতিবেদন হতে জানা যায় ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের অধিনে পরিচালিত অভিযানে চট্টগ্রাম মহানগরীর পাঁচ প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করতে। তৎমধ্যে চান্দগাঁও এলাকার একটি ওষুধের দোকানে অননুমোদিত ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রির জন্য ৬ হাজার টাকা জরিমানা করেছে। চট্টগ্রাম মহানগরীর অসংখ্য ওষুধের দোকানে অননুমোদিত ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি হয়। ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর নগরীর সকল ফার্মেসিতে একসাথে অভিযান পরিচালনা করতে পারলে আরো অসংখ্য ওঘুধের দোকানের খবর আমরা পেতাম। ভোজাল ওষুধ অননুমোদিত ওষুধ এবং মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ দেশে অহরহ বিক্রি হচ্ছে। এদেশে অসাধু ব্যবসায়ীরা খাদ্যে ভেজাল মেশানো হতে শুরু করে বিএসটিআইএর অনুমোদনহীন অনেক খাদ্যদ্রব্য বাজারে বিক্রি করছে। ভেজাল কারবারি, গুদামজাত ব্যবসায়ী, মালামালের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী অসাধু ব্যবসায়ীরা দাপটে জনগণকে প্রতারণা করে তাদের অপকর্ম করে চলেছে। দেশের ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর নামেমাত্র অভিযান পরিচালনা করে বাজারদর নিয়ন্ত্রণ, ভেজাল মুক্ত বাজার প্রতিষ্ঠা, মেয়াদোত্তীর্ণ মালামাল বিক্রি বন্ধ করতে সক্ষম হবে না। কেননা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে লোকবল বাড়িয়ে সার্বিকভাবে সমৃদ্ধ করে বাজারদর নিয়ন্ত্রণ, ভেজালমুক্ত দ্রব্য বিক্রি বন্ধ এবং মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ তথা খাদ্যসামগ্রী বিক্রি বন্ধের জন্য উপযোগী করতে হবে। এই সম্পর্কে নিতে হবে আন্তরিক উদ্যোগ। পাঁচ সাতটি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করে লোক দেখানো কর্মসূচির পরিবর্তে ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তর সমগ্র দেশের বাজার ব্যবস্থাকে সাধারণ মানুষের কল্যাণে ব্যবহারের উপযোগী করলেই সার্বিকভাবে দেশের মানুষ উপকৃত হবে। আমরা চাই ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সার্বিক তত্ত¡াবধানে দেশের বাজার ভেজাল ও প্রতারণা মুক্ত হোক। দ্রব্যমূল্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় এসে বাজার ব্যবস্থা স্থিতিশীল হোক।