ভেজাল খাদ্য ও ওষুধের অসাধু ব্যবসা কঠোর আইনি পদক্ষেপ জরুরি

21

 

একটি দক্ষ ও কর্মঠ মানবসম্পদ গঠনে সুস্বাস্থ্যের বিকল্প নেই। আর সুস্বাস্থ্যের জন্য চাই স্বাস্থ্যসম্মত নিরাপদ খাদ্য। অথচ স্বাস্থ্যসম্মত খাবার নয় শুধু, জীবন রক্ষার একমাত্র উপকরণ যে ওষুধ তাও ভেজাল ছাড়া পাওয়া এখন দুষ্কর হয়ে পড়েছে। ভেজাল খাবার আর ভেজাল ওষুধে চেয়ে গেছে দেশ। চট্টগ্রাম নগরীর ওষুধের পাইকারি বাজার হিসাবে খ্যাত হাজারি গলিতেই রয়েছে ভেজাল ওষুধের ৪৫ দোকান। গতবছর করোনা ভাইরাসের ভয়াবহ সংক্রমণকালে খুলশী এলাকায় ভেজাল ওষুধের কারখানাও আবিষ্কার করেছিল আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। এর বাইরে নগরীর নামি দামি হোটেল-রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে ফুটপাতের খোলা দোকানে দেদারছে বিক্রি হচ্ছে ভেজাল ও পচাবাসী খাবার। সম্প্রতি দেশব্যাপী ভেজালবিরোধী অভিযানের অংশ হিসাবে গত দুইদিন চট্টগ্রামে পরিচালিত ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বিভাগীয় কার্যালয়, জেলা প্রশাসন, ওষুধ প্রশাসন, র‌্যাব ও এপিবিএন-এর যৌথ অভিযানে এ চিত্র উঠে আসে। দেখা যায়, ভেজাল খাদ্যের রয়েছে নানা প্রকারভেদ। সারা দেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ধরনের ভেজাল ও মানহীন খাদ্যপণ্য উৎপাদন, মজুত ও বিক্রি করছে। খাদ্যপণ্যের স্বাদ বাড়ানোর লক্ষ্যে কিংবা পচন রোধ করতে অথবা খাদ্যপণ্যটিকে আকর্ষণীয় করার উদ্দেশ্যে মেশানো হচ্ছে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ। এছাড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিক্রি করছে মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্যপণ্য। অনেক হোটেল ও রেস্টুরেন্টে নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার তৈরি ও পরিবেশন করা হচ্ছে। আবার খাদ্য উৎপাদনকারী অনেক প্রতিষ্ঠান বা রেস্টুরেন্টের নেই কোনো ধরনের ফুড প্রসেসিং লাইসেন্স। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী রয়েছেন, যারা এমনকি শিশুখাদ্যেও মেশাচ্ছেন ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ। খাদ্যপণ্যের মানের এই যখন অবস্থা, তখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। গত বুধ ও বৃহস্পতিবার একযোগে ভেজাল, মানহীন ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্য উৎপাদন, মজুত ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেছে। অভিযানে বিপুল পরিমাণ ভেজাল, মানহীন ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যপণ্য এবং খাদ্যপণ্যে ব্যবহৃত রাসায়নিক দ্রব্যাদি, মেয়দোত্তীর্ণ ও নকল ওষুধ উদ্ধার ও ধ্বংস করা হয়েছে। অভিযানকারী দলের পক্ষে বলা হয়েছে, আগামীতেও এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
আমরা মনেকরি, শুধু অভিযানই যথেষ্ট নয়। আইনি ব্যবস্থাকে আরো কঠোর ও কার্যকর করতে হবে। ভেজাল প্রতিরোধে যে আইন রয়েছে, তাতে কিছু সীমাবদ্ধতা লক্ষ্যনীয়, কিন্তু এর চেয়েও বড় সীমাবদ্ধতা হচ্ছে আইনের যথাযথ প্রয়োগ। যদিও বিভিন্ন সময়ে ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়, তা কিন্তু নিয়মিত নয়, ফলে অভিযানের পরে অসাধু ব্যবসায়ীরা আবারও তৎপর হয়ে উঠে। এরজন্য প্রয়োজন বাজারে সার্বিক তদারকি ব্যবস্থা নিয়মিতকরণ। অস্বীকার করা যাবে না যে, খাদ্যে ভেজাল বা দূষণ একটি বৈশ্বিক সংকট। কিন্তু আমাদের দেশে পর্যাপ্ত আইনি ও কারিগরি নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় প্রায় সব ধরনের খাদ্যদ্রব্যেই অবাধে ভেজাল চলে। আমরা বিভিন্ন সময়ে দেখেছি কীভাবে মাছ, মাংস, ফলমূল ও দুধে ফরমালিন, শুঁটকিতে ডিডিটি, ভাজা খাবারে তেলের বদলে পোড়া লুব্রিকেটিং, ফুডগ্রেডের বদলে টেক্সটাইলে ব্যবহৃত রঙ ব্যবহার করা হয়। আমরা মনে করি, নিত্যনতুন কায়দায় খাবারের সঙ্গে মানবদেহে বিষ প্রয়োগের এই প্রায় সরব প্রক্রিয়া নীরব হত্যার নামান্তর। এই নীরব হত্যাকাÐকে রুখতে কেবল সরকারি সংস্থা নয়, বেসরকারি বিভিন্ন পক্ষ বা নাগরিকদেরও সরব হওয়া জরুরি। মনে রাখতে হবে, খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা কখনো সুফল বয়ে আনবেনা, যদি খাদ্যে ভেজাল নিয়ন্ত্রণ করাসহ যথার্থ খাদ্যনিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমানো না যায়। আমরা বিশ্বাস করি, মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বিএসটিআই যদি স্বতঃপ্রণোদিত হয়, তাহলেই ভেজালের মাত্রা অনেকটা কমে যাবে। এরসাথে এগিয়ে আসতে হবে নাগরিক অধিকার সংস্থাগুলোকেও। সবচেয়ে জরুরি জনসচেতনতা। সচেতন ক্রেতাই হতে পারেন ভেজাল প্রতিরোধের সর্বোত্তম হাতিয়ার।
বলা বাহুল্য, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য পাওয়া মানুষের একটি মৌলিক অধিকার। বিশেষত পশ্চিমা দেশগুলোয় স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যের বিষয়টিতে বিশেষ জোর দেওয়া হয়। ভেজাল খাদ্যের ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নিয়েছে তারা। অথচ আমাদের দেশে ভেজাল খাদ্যের ব্যবসা এক অতি সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এ ভেজাল ও মানহীন খাদ্যের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে শিশুরা। জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষার জন্য অস্বাস্থ্যকর ভেজাল খাদ্যের অসাধু ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের কোনো বিকল্প নেই। আমরা আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ ক্ষেত্রে যে ভূমিকা পালন করেছে, তা আগামীতেও চলমান থাকবে।