ভেজাল ওষুধের মজুদ ও বিক্রি বন্ধে প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে

9

মেয়াদোত্তীর্ণ, নকল-ভেজাল ওষুধের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষ। চট্টগ্রামের হাজারী গলি থেকে শুরু দেশের সব পাইকারি ও খুচরা বাজারে অবাধে মজুদ ও বিক্রি হচ্ছে ভেজাল ওষুধ। একটি অসাধু ব্যবসায়ী চক্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে পুরো জনস্বাস্থ্য। গতকাল বুধবার দৈনিক পূর্বদেশে প্রকাশিত সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, চট্টগ্রামে ওষুধের বৃহৎ পাইকারি বাজার হাজারী গলিতে সস্তা ও ভালো মানের ওষুধ মিলে, এটি সাধারণ মানুষের বিশ্বাস। সেই বিশ্বাসকে পুঁজি করে একটি ভেজাল বিরোধী সিন্ডিকেট হাজারী গলিকে ‘ভেজাল ওষুধের ডিপো’ বানিয়ে রেখেছে। প্রশাসনের ভেজাল বিরোধী অভিযানে এটি এরইমধ্যে প্রমাণিত। এর আগেও যতবার ভেজাল বিরোধী অভিযান চালানো হয়, তাতে লাখ লাখ টাকার নকল, ভেজাল, অনুমোদনহীন বিদেশি ও সরকারি ওষুধ জব্দ করেছে প্রশাসন। তবুও ভেজাল ওষুধের মজুদ ও সরবরাহ বন্ধ হয় না। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, হাজারী গলিতে নকল-ভেজাল ও ক্রয়-বিক্রয় নিষিদ্ধ সরকারি ওষুধ বেচাকেনার সাথে জড়িত বেশকিছু ফার্মেসির গোডাউন চিহ্নিত। এসব দোকানের ব্যবসায়ীদের সাথে ভেজাল বিরোধী সিন্ডিকেটের রয়েছে দহরম মহরম সম্পর্ক। এদের যেকোনো সমস্যায় সিন্ডিকেটের হস্তক্ষেপে রক্ষা পায় তারা। তাদের হাজারী গলির বিভিন্ন মার্কেটের অলিগলিতে রয়েছে ভেজাল ও নকল ওষুধের গোডাউন। বুধবার জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট গোপন তথ্যের ভিত্তিতে ভেজাল বিরোধী জটিকা অভিযানে গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবসায়ীরা তাদের দোকান ও গোডাউন বন্ধ করে পালিয়ে যায় ব্যবসায়ীরা। পূর্বদেশ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অভিযানের খবর পেয়ে গলিটির ২০টি মার্কেটের ৯৮ শতাংশ দোকান এসময় বন্ধ করে দেয় নিজেরা। এ ধরণের ঘটনা শুধু এবারই প্রথম নয়, যখনই ম্যাজিস্ট্রেট বা ওষুধ প্রশাসনের কেউ অভিযানে আসছেন-এমন খবর পাওয়ার সাথে সাথে দোকানপাট বন্ধ করে লাপাত্তা হয়ে যান ব্যবসায়ীরা। অথচ এ ব্যবসায়িরা গলা চিৎকারে বলে থাকেন তারা ভেজাল ওষুধ বিক্রি করেন না। তাহলে ম্যাজিস্ট্রেট অভিযানে আসলে তাদের ভয় পাওয়ার কারণ কি? আমরা মনে করি, ব্যবসায়ীদের সততা প্রমাণ করার সুযোগ রয়েছে ম্যাজিস্ট্রেটকে সহযোগিতা করার মধ্যে। তারা তা না করে দোকান বন্ধ করে পালিয়ে যাওয়ার মধ্যে সন্দেহ ও সংশয় আরো বেশি বেড়ে যাবে। সাধারণ রোগী বা তাদের প্রতিনিধি যারা ওষুধ কেনার জন্য হাজারী গলিতে আসেন তাদের মধ্যে বিশ্বাস ও আস্থার সংকট দেখা দিবে। এখানে ব্যবসায়ীরা যতই হাকডাক করুক বাস্তবতা হচ্ছে চট্টগ্রামের পাইকারি ওষুধের বাজার মানে মনে করা হবে ভেজার ওষুধের বাজার। এ ভেজাল ওষুধের মজুদ ও বিক্রি বন্ধে প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে। আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওষুধ যেমন জীবন রক্ষা করতে পারে, তেমনি একই ওষুধ নকল, মেয়াদোত্তীর্ণ কিংবা নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণ না করলে কার্যকারিতা হারিয়ে জীবনহানিও ঘটাতে পারে। এছাড়া এসব ওষুধ খেলে চামড়ার ওপর মারাত্মক এলার্জি সৃষ্টিসহ কিডনি ও লিভার নষ্ট হতে পারে। মস্তিষ্কের প্রদাহে অজ্ঞান হয়ে মারাও যেতে পারে। সর্বোপরি এ ধরনের ওষুধ সেবনে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারে। মানসম্পন্ন ওষুধ যেমন মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে, তেমনি মানহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ স্বাস্থ্যহানি এমনকি জীবননাশের কারণও হতে পারে। কাজেই ওষুধের মান সংরক্ষণ অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অন্য খাদ্যপণ্যের মতো ওষুধের গুণমান ভোক্তাদের নিজেদের পক্ষে যাচাই করা সম্ভব হয় না। এ কাজটির জন্য অপরিহার্য হলো প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি। উদ্বেগজনক ব্যাপার হলো- মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ রোধে আমাদের দেশে প্রাতিষ্ঠানিক তৎপরতা অপর্যাপ্ত। চট্টগ্রামের হাজারী গলি ছাড়া ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ তৈরির অন্যতম আখড়া হচ্ছে মিটফোর্ড এলাকা এবং এখান থেকেই দেশের বিভিন্ন জায়গায় ভেজাল ওষুধ ছড়াচ্ছে। মিটফোর্ডে গিয়ে মোবাইল কোর্টেরও হেনস্তা হওয়ার দৃষ্টান্ত রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষমতাঘনিষ্ঠ লোকজন এই নকল-ভেজাল ওষুধ বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত। এ খাতে দুর্নীতি, আইন প্রয়োগের শৈথিল্য, প্রশাসনের নজরদারির অভাব, দুর্বল বিচার ব্যবস্থা, প্রযুক্তিগত অসমর্থতা, দক্ষ প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব ভেজাল ওষুধ বাজারজাত রোধ করতে না পারার প্রধান কারণ। অন্যদিকে আইনে এ-সংক্রান্ত অপরাধের শাস্তি কম হওয়াও বড় কারণ। ওষুধের বাজার ভেজালমুক্ত করা খুবই জরুরি। এর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিশেষভাবে তৎপর হওয়া দরকার।