ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের বড় বাজার গ্রাম

61

জীবন রক্ষাকারী ওষুধ সম্পর্কে শহর থেকে গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষের ধারণা কম ও আইন-শৃংঙ্খলা বাহিনীর পর্যাপ্ত অভিযান না থাকায় ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের বড় বাজারে পরিণত হয়েছে গ্রাম। এসব কারণে গ্রামের ফার্মেসিগুলোতে দেদারসে বিক্রি হচ্ছে ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ। এর সাথে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী এসব অঞ্চলকে ভেজাল ওষুধ বিক্রির মূল টার্গেট হিসেবে বেছে নিয়েছে।
এছাড়া গ্রামের অলিগলির ফার্মেসিগুলোতে অভিযান চালালেই মিলছে ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ। ভোক্তারা এসব ওষুধ কিনে একদিকে প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন অন্যদিকে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, ওষুধ যেমন জীবন রক্ষা করতে পারে, তেমনি একই ওষুধ নকল, মেয়াদোত্তীর্ণ কিংবা নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণ না করলে কার্যকারিতা হারিয়ে জীবনহানিও ঘটাতে পারে। এছাড়া মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ খেলে চামড়ার ওপর মারাত্মক এলার্জি সৃষ্টিসহ কিডনি ও লিভার নষ্ট হতে পারে। মস্তিষ্কের প্রদাহে অজ্ঞান হয়ে মারাও যেতে পারে।
এদিকে দেশে ওষুধের উৎপাদন থেকে বিপণন কোনো স্তরেই সরকারি পরীক্ষাগারে মাননিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হয় না। বিপণনের পর অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বাজার থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পাঠান। তখন ওষুধের মান জানা যায়। এর আগ পর্যন্ত পরীক্ষাহীন, মান না জানা ওষুধই ব্যবহার করেন ভোক্তারা। অনেক সময় অসাধু ব্যবসায়ী ও বিক্রেতারা মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের গায়ে নতুন করে মেয়াদসম্বলিত স্টিকার লাগিয়ে তা বিক্রি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সেই সাথে ওষুধ বিপণনের সঙ্গে জড়িত অসৎ ব্যবসায়ীরা বিদেশ থেকে ওষুধ আমদানি করে নিজেরাই ইচ্ছেমতো মেয়াদ বাড়িয়ে লেবেল লাগান এবং মূল্য বাড়িয়ে থাকেন। এসব বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ওষুধ প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টরা অবগত হয়ে সাময়িকভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। অভিযানে ওষুধ কোম্পানির লাইসেন্স বাতিল করা হয়। অপরাধীদের জরিমানা ও আইনানুগ দন্ড দেয়া হয়। কিছুদিন পর একই বিপজ্জনক পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটে। বাজারে থেকে যায় ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ।
মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ব্যবসার সিন্ডিকেটের সঙ্গে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে ।
গত দুইমাসে চট্টগ্রামের ৮টি উপজেলায় ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনা করেছে চট্টগ্রাম ওষুধ প্রশাসন কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে অনুমোদনহীন ও ভেজাল ওষুধ বিক্রি এবং লাইসেন্স ছাড়া ব্যবসা পরিচালনার অপরাধে গত ১৭ জুন রাঙ্গুনিয়ায় ১৪টি প্রতিষ্ঠানকে এক লাখ ৪৮ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এসময় প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে অনুমোদনহীন ও নকল ওষুধ জব্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি নকল ওষুধ বিক্রি ও লাইসেন্স ছাড়া ব্যবসা পরিচালনা করার অপরাধে মনি ফার্মেসিকে দুই হাজার, চন্দ্রঘোনা মেডিকেল হলকে ২০ হাজার, বিশ্বাস মেডিকেল হলকে দুই হাজার, ইকবাল ফার্মেসিকে দুই হাজার, রাঙ্গুনিয়া ফার্মেসিকে দুই হাজার, কেয়ার মেডিকেল হলকে পাঁচ হাজার, নুরজাহান ফার্মেসিকে ১০ হাজার, নিউ বাহার ফার্মেসিকে ৫০ হাজার, জেনারেল মেডিকেল হলকে পাঁচ হাজার, ফিরোজা ফার্মেসিকে পাঁচ হাজার ও মায়া ফার্মেসিকে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
একইভাবে ১৭ জুন মেয়াদোত্তীর্ণ, অবৈধ ও ফিজিশিয়ান স্যাম্পল ওষুধ বিক্রির অপরাধে রাউজানে ৪টি প্রতিষ্ঠানকে ৭০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ সময় জব্দকৃত মেয়াদোত্তীর্ণ, অবৈধ ও ফিজিশিয়ান স্যাম্পল ওষুধ ধ্বংস করা হয়েছে। এসব অপরাধে সাধনা মেডিসিনকে ৪০ হাজার, আমানত মেডিকেল হলকে ২০ হাজার, জমজম মেডিকেল হলকে ৫ হাজার ও অন্য একটি ফার্মেসিকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। ষ পৃষ্ঠা ১১, কলাম .
ষ প্রথম পৃষ্ঠার পর
গত ৯ জুলাই মেয়াদোত্তীর্ণ, অবৈধ, নকল ও সরকারি ওষুধ বিক্রির অপরাধে বাঁশখালীর একটি ফার্মেসি সিলগালা ও ২টি ফার্মেসিকে ২২ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ সময় জব্দকৃত মেয়াদোত্তীর্ণ, অবৈধ ও নকল ওষুধ ধ্বংস করা হয়।
অপরদিকে আনোয়ারায় ভেজালবিরোধী অভিযান চালিয়ে ৭টি ফার্মেসিকে প্রায় এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, আনোয়ারা, সীতাকুন্ড এবং চন্দনাইশ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ওষুধের দোকানে ভেজালবিরোধী অভিযান চালিয়ে জরিমানাসহ মেয়াদোত্তীর্ণ, অবৈধ ও নকল ওষুধ ধ্বংস করে চট্টগ্রাম ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর।
চট্টগ্রাম ওষুধ প্রশাসনের তত্ত¡াবধায়ক হোসাইন মোহাম্মদ ইমরান বলেন, প্রতি সপ্তাহে দুইটি উপজেলায় অভিযান চালানো হয়। গত দুইমাসে সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, আনোয়ারা, বাঁশখালী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, সীতাকুÐ এবং চন্দনাইশ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ওষুধের দোকানে মোবাইল কোট পরিচালনা এবং সচেতনতামূলক প্রোগ্রাম করা হয়েছে।
অভিযান পরিচালনাকালে দেখা যায়, অনেক ওষুধের দোকানে ড্রাগ লাইসেন্স নেই। নেই কোনো ফার্মসিস্ট। আবার অনেক দোকানে মেয়াদোত্তীর্ণ, আন-রেজিস্ট্রার্ড ওষুধ মিলেছে। পাওয়া গেছে সরকারি ওষুধ, যেগুলো সরকারি হাসপাতালে রোগীদের সেবায় ফ্রিতে দেওয়া হয়। এধরনের অভিযান চলমান থাকবে বলে জানান তিনি।
প্রতিসপ্তাহে মাত্র দুইটি উপজেলায় ভোজালবিরোধী অভিযান পর্যাপ্ত কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের পর্যাপ্ত জনবল নেই। মাত্র তিনজন অফিসার ও ছয়জন কর্মচারি দিয়ে কাজ চলছে। তবুও যতটুকু আছে ততটুকু নিয়ে সকাল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা বসে নেই।
প্রত্যেকটা উপজেলায় সচেতনতামূলক প্রোগ্রাম করার কথা উল্লেখ করে ইমরান বলেন, ‘নক-ভেজাল ওষুধ প্রতিরোধ, এন্টিবায়োটিক ওষুধের যত্রতত্র ব্যবহার,’ এই ব্যানারে আমরা প্রত্যেকটা উপজেলায় প্রোগ্রাম করে যাচ্ছি। এই আয়োজনে আমরা সমাজের প্রত্যেক শ্রেণির মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করছি।
ভজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সেবনে মানুষের শরীরে কি ধরনের প্রভাব ফেলে জানতে চাইলে সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, এগুলো একধরনের বিষ। এসব ওষুধ খেলে চামড়ার ওপর মারাত্মক এলার্জি সৃষ্টি হতে পারে। মস্তিষ্কে প্রদাহ হয়ে অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে, এমনকি মারাও যেতে পারে। আর নষ্ট হতে পারে কিডনি ও লিভার। এছাড়া মারাত্মক পরিণতির দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে। দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার মধ্যে পড়তে পারে। মোটকথা ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সেবনের কারণে ভোক্তারা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
কনজুমার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এর চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, দেশব্যাপী ছড়িয়ে যাওয়া এ জঘন্য অপরাধ নির্মূলের জন্য দুই জায়গায় নজরদারি বাড়াতে হবে। একটি হলো ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর আর অন্যটি হলো ওষুধ কোম্পানি, যারা ওষুধ উৎপাদন করে থাকে।
তিনি বলেন, ওষুধ প্রশাসন তদারকি করে না বলেই এ অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়া ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ নির্মূলের জন্য এসব ওষুধ যারা উৎপাদন ও বিপণন করে তাদের বিষয়ে প্রশাসনকে তথ্য দেওয়া ওষুধ কোম্পানিগুলোর নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করি। এব্যাপারে সবাইকে সচেতন হতে হবে।