ভেজালের ভিড়ে মান নিয়ে উদ্বিগ্ন ক্রেতা

16

এম এ হোসাইন

প্রতিনিয়ত মানহীন পণ্য কিনে ঠকছেন ক্রেতা। এসব ভেজাল আর মানহীন পণ্য থেকে কোন অবস্থাতেই যেন রেহাই মিলছে না। মানহীন পণ্য যাতে বাজারে আসতে না পারে সে নিশ্চয়তার জন্য গঠিত হয় বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড এন্ড টেস্ট্রিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই) এর। দেশীয় বাজারে পণ্যের মানের নিশ্চয়তা দেয়ার কথা প্রতিষ্ঠানটির। কিন্তু বরাবরেই পণ্যের মান রক্ষায় ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এতে করে মান সম্পন্ন পণ্যের চেয়ে মানহীন পণ্যের সয়লাব ঘটেছে বাজারে। ফলে ভেজাল আর মানহীন পণ্য কিনে ঠকছেন ক্রেতা সাধারণ।
নির্ধারিত পণ্যের উৎপাদন বা বাজারজাত করার ক্ষেত্রে মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বিএসটিআই থেকে অনুমতির প্রয়োজন পড়ে। শতভাগ মান নিশ্চিত করা গেলে তখনই প্রতিষ্ঠানটির মান সনদ পাওয়ার কথা। আবার মান সনদ পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠান উৎপাদনে গেলেও সেটা বিএসটিআইয়ের তদারকিতে থাকার কথা। বাস্তবে কোনো তদারকি নেই বিএসটিআইয়ের। মাঝে মাঝে লোক দেখানো অভিযান পরিচালনা করা ছাড়া। নির্ধারিত কোন দিবসকে টার্গেট করেই চলে এসব অভিযান। অদ্ভুতভাবে যে সকল প্রতিষ্ঠান সনদ নিয়ে ব্যবসা করছে সে সকল প্রতিষ্ঠানে অভিযান পরিচালনা করা হয় বেশি। অবৈধ প্রতিষ্ঠানে অভিযান তেমন হয় না বললেই চলে। যদিও অবৈধ প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা আছে বিএসটিআইয়ের কাছে।
অভিযোগ আছে, বিএসটিআইয়ের সনদ প্রাপ্তি থেকে শুরু করে প্রতিটি পদে পদে টাকার লেনদেন করতে হয়। তাছাড়া নিয়মিত মাসোহারা দেয়ার কারণে অবৈধ প্রতিষ্ঠান প্রীতি রয়েছে বিএসটিআইয়ের।
এ বিষয়ে কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, প্রতিষ্ঠান প্রোডাক্ট উৎপাদনে যাওয়ার আগে বিএসটিআইয়ের মান সনদ নেয়ার নিয়ম। মান সনদ নেয়ার পর সঠিক মানের পণ্য উৎপাদন করছে কিনা সেটাও তদারকিতে থাকার কথা। কিন্তু মান যাচাইয়ের কাজটি কতটুকু তারা করছে সেটার প্রশ্ন থেকে যায়। মান সম্পন্ন পণ্যের চেয়ে মানহীন পণ্য বাজারে বেশি। এসব মানহীন পণ্য কিভাবে বাজারে প্রবেশ করে? নিশ্চয় এতে বিএসটিআইয়ের গাফেলতি রয়েছে।
তিনি বলেন, নিয়মিত অভিযানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোকে তদারকিতে রাখা ভালো। তবে অবৈধ প্রতিষ্ঠান বাদ দিয়ে বৈধ প্রতিষ্ঠানগুলোকেই বেশি হয়রানি করা হয় বলে অভিযোগ এসেছে আমাদের কাছে। এটা কোন অবস্থাতেই কাম্য নয়। পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে অবৈধ প্রতিষ্ঠানের নাম তুলে ধরেছিল বিএসটিআই। তাহলে এসব অবৈধ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয় না কেনো? সর্ষের মধ্যেই হয়তো বড় ভূত রয়ে গেছে।
বিএসটিআইয়ের চরম ব্যর্থতার কারনে বাজারে ভেজাল ও নিম্নমানের বা মানহীন পণ্যে ভরে গেছে। প্রতিবছর বিশ্ব মান দিবসকে সামনে রেখে অভিযানে নামে বিএসটিআই। এবারও দিবসের কয়েকদিন আগে থেকে প্রশ্নবিদ্ধ অভিযান পরিচালনা করেছে বিএসটিআই। জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় যেমন অভিযান হয়েছে তেমনি নিজস্ব সার্ভিলেন্স অভিযানও হয়েছে। এসব অভিযান প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার মূলে রয়েছে টার্গেট প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনকে ব্যবহার করে বিএসটিআই। অবৈধ ও মানহীন প্রতিষ্ঠানের তালিকা থাকার পরও শুধু মাসোহারা না দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্য করেই অভিযান পরিচালনার অভিযোগ আছে।
বিএসটিআই সূত্র বলছে, বিএসটিআই চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয় থেকে গত অর্থবছরে ৫০৭টি সিএম লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে। তার আগের অর্থবছরেও সমপরিমান সিএম লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে। গেল অর্থবছরে লাইসেন্স নবায়ন হয়েছে ৭২২টি, তার আগের অথবছরে নবায়ন হয়েছে ৬৮৫টি লাইসেন্স। গত অর্থবছরে ৩৩৭৯টি আমদানিকৃত পণ্যের ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে। প্রত্যাখান হয়েছে ৩৫৩টি পণ্যের ছাড়পত্র। তার আগের অর্থবছরে ২৫৮৫টি ছাড়পত্র প্রদান এবং প্রত্যাখান করা হয় ১৩৪টি ছাড়পত্র। গত অর্থবছরে ৩৫৩টি সার্ভিল্যান্স টীম পরিচালনা করা হয়েছে। মামলা হয়েছে ২২০টি। তার আগের অর্থবছরে (২০১৯-২০) সার্ভিলেন্স টীম হয়েছে ৩৩৫টি, মামলা হয়েছে ২২০টি। গত অর্থবছরে ১৯৮টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। মামলা দায়ের হয় ২৭২টি, সবগুলো মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে।
বাজারে মানহীন পণ্যের ছড়াছড়ির মধ্যে আজ পালন করা হচ্ছে বিশ্ব মান দিবস। বিশ্বের ৩টি প্রধান আন্তর্জাতিক মান সংস্থার যৌথ উদ্যোগে বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর এ দিবসটি পালিত হয়। বাংলাদেশের জাতীয় মান সংস্থার পক্ষ থেকে দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ১৯৪৬ সালের ১৪ অক্টোবর তারিখে লন্ডনে বিশ্বের ২৫টি দেশের প্রতিনিধিরা বিশ্বব্যাপী পণ্য-সেবার মান বজায় রাখার জন্য একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মান নির্ধারক সংস্থার বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেন। পরের বছর থেকে তাদের কার্যক্রম শুরু করে। ঐদিনকে স্মরণীয় করে রাখতেই এ দিবস বৈশ্বিকভাবে পালন করা হয়। প্রত্যেক বছরই দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় চলমান বিষয়াদিকে ঘিরে নির্ধারণ করা হয়। এবার দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘সমন্বিত উদ্যোগে টেকসই উন্নত বিশ্ব বিনির্মাণে-মান’। ১৯৭০ সাল থেকে আইএসও এই দিনটি পালন করে আসছে। বিএসটিআই ১৯৭৪ সালে আইএসও সদস্যপদ লাভ করে। আইএসও’র সক্রিয় সদস্য হিসাবে বিএসটিআই দিবসটি পালন করে আসছে। দিবসটি উপলক্ষে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস মিলনায়তনে আলোচনা সভার আয়োজন করেছে বিএসটিআই।