ভূ-রাজনৈতিক কৌশলগত কারণে বাংলাদেশ যেন পরে না যায়

208

’৭০-এর দশকের গোড়ার দিকে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে যখন অভ্যুদয় ঘটে, তখন বিশ্বরাজনীতি ছিল স্নায়ুযুদ্ধে বিবদমান দুই পক্ষে বিভক্ত। বাংলাদেশ সৃষ্টির সাথে সে সময়কার ভূকৌশলগত বাস্তবতার ছিল বিশেষ সম্পর্ক। আন্তর্জাতিক রাজনীতির অবস্থা মোটাদাগে পরের দুই দশক প্রায় অপরিবর্তিত থাকলেও ’৯০-এর দশকের গোড়ার দিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মধ্যদিয়ে স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটে। আর বিশ্বে আমেরিকার একক প্রভাব বলয় সৃষ্টি হয়। ২০১০ দশকের শুরু থেকে এ অবস্থার ধীর গতিতে পরিবর্তন শুরু হয়। এখন বৈশ্বিক পরিস্থিতি আর আগের দশকের মতো একই নয়। মধ্যপ্রাচ্যে আরব জাগরণের পথ ধরে একের পর এক সরকারের পতন ঘটার পর সিরিয়ায় সূচিত গৃহযুদ্ধ এই পরিবর্তনের সূচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। স্নায়ুযুদ্ধকালে কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলোর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি রাজতন্ত্র বাদ দেয়া হলেও তারা সোভিয়েত বলয়ের মধ্যেই ছিল। সিরিয়ার অবস্থানও ছিল তদানীন্তন সোভিয়েত প্রভাব বলয়ে।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর দেশটি আমেরিকার প্রভাব বলয়ের সাথে একাত্ম হওয়ার পরিবর্তে স্থানিক ও আঞ্চলিক মেরুকরণ তৈরি করে নিজস্বভাবে হিসাব নিকাশ তৈরির চেষ্টা করে। আরব জাগরণের সময় সিরিয়ায় গণবিদ্রোহ শুরু হলে প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে কিছুটা ভিন্ন অবস্থান নেয় দেশটি। কৌশলগত কারণে ইরান সর্বাত্মকভাবে তার পাশে এসে দাঁড়ায়। বিভিন্ন কারণে এই যুদ্ধে বাশার আল আসাদ পরাজয়ের কাছাকাছি এসে দাঁড়ানোর পর ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়া এর সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ে। রাশিয়ার সর্বাত্মক সামরিক সহযোগিতা সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতিকে আমুল পাল্টে দেয়। বাশার আবার চালকের আসনে চলে গিয়ে দেশটির বেশির ভাগ অঞ্চলের ওপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন। সর্বশেষ খবর অনুসারে যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়া থেকে নিজের সৈন্যদের সামরিকভাবে একেবারে প্রত্যাহার করে নিচ্ছে।
রাজনীতিতে সব সময়ের জন্য এক থাকে না শত্রু বা মিত্র। সময়ের পরিস্থিতিতে তা বদলে যায় এবং কথায় বলে রাজনীতিতে শেষ কথা বলতে কিছু নেই। ট্রাম্পের পূর্বসূরি প্রেসিডেন্ট ওবামার সময় থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নিজেকে সংকুচিত করার প্রবণতা দেখা যায়। এই প্রবণতার শুরু মধ্যপ্রাচ্য দিয়ে শুরু হলেও তখনো ওবামা এশিয়াকে আমেরিকার নতুন ফোকাস পয়েন্ট হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। ওবামা তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির জের ধরে আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহারের একটি সাল উল্লেখ করেছিলেন সত্য; কিন্তু তিনি সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে ২০১৪ সালে গুটিয়ে নেননি; বরং ভারতের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক তৈরি করে এশিয়ায় নতুনভাবে প্রভাব বিস্তারের একটি ছক তৈরি করেন। এই ছকে দক্ষিণ এশিয়ার নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয় ভারতকে। একই সাথে, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশকে ভারতীয় চশমায় প্রত্যক্ষ করার এক ব্যতিক্রমী নীি নেয় ওয়াশিংটন। সেই নীতিরই অংশ হিসেবে এক দশক আগে বাংলাদেশে ভারতপন্থী হিসেবে পরিচিতি দলটি শাসন ক্ষমতায় আরোহন করে। বাংলাদেশে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর শেখ হাসিনার সরকার এখানকার শাসন কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন আনার কাজ শুরু করে। এই সময় থেকে সরকারের কর্মকাÐে কিছুটা কৌশলগত ভারসাম্য আনার টানাপোড়েন দেখা দেয় চীন ও ভারতের ক্ষেত্রে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ৭১ মুখীনীতির অংশ হিসেবে অন্তরালে রাশিয়ার সাথে বিশেষ সম্পর্ক নির্মাণে সক্রিয় হয় এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ভোটাভুটিতে রাশিয়াকে সমর্থন জানানোর একাধিক দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়। প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহ এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্লান্টের মতো প্রকল্পে রাশিয়াকে সম্পৃক্ত করেছে এই সরকার। কিন্তু এর মধ্যে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ভারতের নীতি বাস্তবায়ন ও দৃষ্টিভঙ্গিতে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বড় ধরনের কৌশলগত প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বের সমঝোতার পরও একটা পর্যায়ে এসে দিল্লি-রাশিয়ার সাথে পুরোনো সম্পর্কে আবার গতি আনতে শুরু করে। নানা ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পাদিত প্রতিরক্ষা চুক্তির বাস্তবায়নে ধীরগতি নেমে আসে। এস ৪০০ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনাসহ দিল্লি বেশকিছু তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিরক্ষা চুক্তি সম্পাদন করেছে রাশিয়ার সাথে। এর মধ্যে রোহিঙ্গা সংকট এ অঞ্চলে একটি বড় ধরনের দিক পরিবর্তন ঘটনা হিসেবে আবির্ভুত হয়। মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চলের সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। এর পেছনে চীন না যুক্তরাষ্ট্র, নাকি উভয়ের প্রভাব কাজ করেছে তা স্পষ্ট নয়। তবে প্রধানমন্ত্রী বিশেষ দক্ষতার সাথে এ ক্ষেত্রে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন। বাংলাদেশ পরিস্থিতিতে যে বিষয়টি আমেরিকার পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টির আড়ালে থেকে যায়, সেটি হলো এখানে পাশ্চাত্যের সামাজিক প্রভাবের গভীর শিকড়গুলো সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের আড়ালে ছিন্ন করে ফেলা হয়। এখানকার সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের প্রতিস্থাপন শুরু হয়। কোনো কোনো ভারত এবং কোনো ক্ষেত্রে রাশিয়ান স্বার্থ দিয়ে।
বাংলাদেশের শাসন কাঠামোর এই প্রভাব পরিবর্তনের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী যেসব ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে আসে সেগুলোকে আমেরিকা খুব একটা গুরুত্বের সাথে নেয়নি। মূলত ২০১৩ সালে একতরফা নির্বাচনকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন না করার পর থেকে হাসিনা সরকার বিকল্প আন্তর্জাতিক শক্তির দিকে বিশেষভাবে ঝুঁকে পড়ে।
এদিকে স্নায়ুযুদ্ধের পর রাশিয়ানরা আফগানিস্তান হারানোর পর বিকল্প ক্ষেত্র খুঁজতে থাকে। এ ক্ষেত্রে মিয়ানমারের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক নির্মাণের উদ্যোগ নেয় মস্কো। রাশিয়া মিয়ানমারের সমর্থনে এগিয়ে এসে বেশখানিকটা স্থান করে নেয়। মিয়ানমারের একান্ত নির্ভরযোগ্য মিত্র চীনের সাথে রাশিয়ার কৌশলগত সমঝোতা থাকায় মস্কোর মিয়ানমারে প্রভাব বিস্তারে বেগ পেতে হয়নি। এর পাশাপাশি বাংলাদেশকেও রাশিয়ার প্রভাব বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে। ভারতের সাথে রুশ প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সম্পর্ক নবায়নের ফলে ঢাকার রুশ সহায়তা লাভের ক্ষেত্রে দিল্লি বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছেনা।
ভারতের অবস্থান এখন এমন যে, নানা ব্যত্যয়ের পরও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দিল্লির রয়েছে এক ধরনের কৌলশগত সমঝোতা। এ অবস্থায় বাংলাদেশ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার নেপথ্য প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ে ভারত দুই পক্ষের সাথে সমান্তরাল সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। চীন রয়েছে অপেক্ষাকৃত দূরবর্তী অবস্থানে নীরব পর্যবেক্ষকের স্থানে। তবে ঢাকার একটি টেলিভিশন চ্যানেলে খবর প্রচার করা হয়েছে, বরিশালে বিপুল অংকের টাকাসহ চীনা নাগরিক গ্রেপ্তার। এ পর্যন্ত ১৭ জন চীনা নাগরিক গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া গিয়েছে। এসব খবরের নেপথ্যে অনেক ঘটনার দু’একটি প্রকাশ পেতে পারে।
বাংলাদেশের সেনা সদস্য ও কর্মকর্তাদের বিশেষ আয়ের বড় উৎস হলো, জাতিসংঘের শান্তি মিশন। এই মিশন কার্যক্রমের ওপর রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য কয়েকটি পাশ্চাত্য দেশের বিশেষ নিয়ন্ত্রণ। বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্যের তিন চতুর্থাংশের গন্তব্য ইউরোপ-আমেরিকা। বাংলাদেশ রেমিট্যান্স আয়ের বড় অংশ ইউরোপ-আমেরিকা থেকে পায়। মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশে বাংলাদেশের কর্মীদের কর্মসংস্থান হচ্ছে, সেসব দেশ পাশ্চাত্যের দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত। বাংলাদেশ অতীতে কোনো সময় আন্তর্জাতিক দ্ব›দ্ব সংঘাতে বলির পাঠা তথা ক্রসফায়ারের শিকার হওয়ার মতো পরিস্থিতিতে পড়েনি। পরিণামদর্শী ও সতর্ক নীতি গ্রহণ করে এই ঝুঁকি এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। তবে এই ঝুঁকির ব্যাপারে বাংলাদেশকে আরও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
অমিয়বাণীÑ যারা সমস্যা রেখেও তৃতীয় কারো সাহায্য নেয় না বা নিতে পারে না, তারা নিজেদের বিপর্যয় এড়াতে পারে না। আমরা যে মানসিক পর্যায়ে আছি, তাতে আমাদের মগজের কোষগুলো এখন উড়রহম হড়ঃযরহম পর্যায়ে রয়েছে। এই উড়রহম হড়ঃযরহম আমাদের খারাপ পরিণতি বয়ে আনতে পারে। কাজেই জাতিকে সম্ভাব্য বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে, বিবেকবান ও প্রজ্ঞাশীল অংশের এগিয়ে আসা উচিত।

লেখক : সাংবাদিকে ও কলামিস্ট