ভূমি অফিসগুলোতে মন্ত্রী ও বদলি আতঙ্ক

171

অনিয়ম ও দুর্নীতির ‘হাট’ ভূমি অফিস। জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন ভূমি অফিসগুলোতে কাজে গেলেই বাড়তি টাকার হিসেব কষতে হয় সেবাগ্রহীতাদের। অফিসগুলোতে স্পিড মানির নামে ঘুষ লেনদেন যেন ‘ওপেন সিক্রেট’। চট্টগ্রামে বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্প চলমান থাকায় ভূমি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কপাল খুলেছে। যেখানেই বড় প্রকল্প সেখান থেকে বদলি হলেও সরতে চান না দুর্নীতিবাজরা। মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে দুর্নীতিবাজ কর্মচারীদের অন্যত্র বদলি করা হলেও সেখান থেকেও আধিপত্য বজায় রাখছেন তারা।
ভূমি অফিসের কতিপয় দুর্নীতিবাজ তহসিলদার, অতিরিক্ত ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা, সার্ভেয়ার, কানুনগো, অফিস সহকারী, জারীকারক, চেইনম্যান, পিয়ন ও গার্ড দুর্নীতিতে ডুবে আছেন। এরা এলএ শাখায়, উপজেলা ও ইউনিয়ন ভূমি অফিসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কোটিপতি বনে গেছেন। গড়ে তুলেছেন অট্টালিকা।
এসব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে আবারো একহাত নিয়েছেন ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ। অতীতের মতো আবারো সারপ্রাইজ ভিজিট করার ঘোষণা দিয়েছেন। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব চেয়ে সময়সীমাও বেঁধে দিয়েছেন। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ভালো না হলে রেহাই দেয়া হবে না বলেও সাফ জানিয়েছেন ভূমিমন্ত্রী।
চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. দেলোয়ার হোসেন পূর্বদেশকে বলেন, ‘মন্ত্রীর চিঠির অপেক্ষায় আছি। চিঠি পেলেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিব।’
চট্টগ্রাম ভূমি অধিগ্রহণ শাখা (এলএ) ও উপজেলা ভূমি অফিসের দুইজন কর্মকর্তা জানান, ‘ভূমিমন্ত্রীর ঘোষণার পরেই সবাই আতঙ্কে আছেন। ভূমি অফিসগুলোতে এখন মন্ত্রী ও বদলি আতঙ্ক দুটোই বিরাজ করছে। যে কারণে গত একসপ্তাহে ভূমি অফিসে কিছুটা শৃঙ্খলা ফিরেছে। যে কোনো সময় মন্ত্রী এসে পড়তে পারেন এমন আশঙ্কা থেকে ফাইল ও দৈনন্দিন কাজে গতি এসেছে। সঠিক সময়ে অফিসে এসেই ব্যস্ত সময় পার করছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তবে কয়েক বছরে বিস্তর সম্পদের মালিক বনে যাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেই আতঙ্কটা একটু বেশি।’
চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এলএ) মো. মুমীনুর রশীদ পূর্বদেশকে বলেন, ‘ভূমি অফিসগুলোতে শৃঙ্খলা ফেরাতে নতুন ডিসি স্যার এসেই কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন। আমাদের চেষ্টার কোনো শেষ নেই। এরপরেও অফিসিয়ালি আমরা যেমন নির্দেশনা পাব সেভাবেই উপজেলা, ইউনিয়ন ভূমি অফিসগুলোতে নির্দেশনা প্রদান করবো। মন্ত্রী মহোদয় যে সিদ্ধান্তগুলো দিয়েছেন সেগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে অবশ্যই ভূমি অফিসগুলোর সেবার সুফল পাবে সাধারণ মানুষ।’
পদক্ষেপেও টনক নড়েনি : ২০১৫ সালের ৩১ জানুয়ারি আকস্মিক সারপ্রাইজ ভিজিটে বের হন তৎকালীন ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ। পটিয়া ভূমি অফিসে গিয়েই দুই তহসিলদার সাজ্জাদ শাওন ও কোরবান আলীর টেবিলের ডেস্কে টাকা পাওয়ায় দুইজনকেই তাৎক্ষণিক বদলি নির্দেশ দেন মন্ত্রী।
২০১৭ সালের ১৯ ফেব্রæয়ারি আবারো সারপ্রাইজ ভিজিট করেন ভূমি অধিগ্রহণ শাখা (এলএ) ও হাটহাজারীর চিকনদন্ডী ভূমি অফিসে। সেখানে উপস্থিত সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অভিযোগ শুনে করিম, নজরুল ও হানিফ নামে তিনজন চেইনম্যানকে স্ট্যান্ডরিলিজ করেন। একইদিনে চিকনদন্ডী ভূমি অফিসে একজন দালালকে সতর্ক করেন মন্ত্রী।
২০১৭ সালে বাঁশখালীতে আয়োজিত দুর্নীতি দমন কমিশনের গণশুনানিতে হাজির হয়ে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে অভিযোগ পেয়ে উপজেলা ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার মহিউদ্দিনকে সাময়িক বরখাস্ত করেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক।
গত বছরের ১৯ জুন চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ ও চান্দগাঁও ভূমি অফিসে আকস্মিক পরিদর্শন করেন বিভাগীয় কমিশনার আব্দুল মান্নান। এসময় তিনি আগ্রাবাদ ভূমি অফিসের নিচতলার ১০১ নম্বর কক্ষে বসে থাকাবস্থায় সিরাজ উদ্দিন নামে এক দালালকে আটক করেন। সে সময় বিভাগীয় কমিশনার বলেছিলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো অভিযোগের ভিত্তিতে এই অভিযান চালানো হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব অফিসে একদল বহিরাগত দালাল সক্রিয় ছিল বলে জানান।’
২০১৮ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর জমি অধিগ্রহণে ঘুষ আদায়ের অভিযোগে চেকসহ তিনজন দালালকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ। লালদিঘির পাড় থেকে গ্রেপ্তার হওয়া তিন দালাল হলেন আবদুল খালেক, আইয়ুব আলী ও তপন নন্দী।
২০১৪ সালে এলএ শাখায় দুর্নীতির বিষয়টি দেশব্যাপী আলোচিত হয়েছিল। সেবার প্রায় ৫৮ লক্ষ টাকাসহ ধরা পড়েছিল ইলিয়াছ নামে এক ব্যক্তি। ইলিয়াছ স্বীকার করেছিল, আউটার রিং রোড়ে ভূমি অধিগ্রহণে কমিশনের টাকা হিসেবেই এসব টাকা সার্ভেয়ার শহিদুল ইসলাম মুরাদের মাধ্যমে এলএ শাখায় যাচ্ছিল। এ ঘটনার পরপরই নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। এলএ শাখায় বড় ধরনের রদবদল করতে বাধ্য হয়েছিল প্রশাসন। বদলি হন ১০ সার্ভেয়ার ও তিন কানুনগো।
জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে গেড়ে বসা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বদলি হলেও নানা কৌশলে তা আটকে দেন। বিশেষ করে যেখানেই বড় প্রকল্পের কাজ চলমান সেখানের ভূমি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সরতে চান না। সরতে বাধ্য হলেও ঘুরেফিরে আবারো ফিরে আসেন। গত পাঁচ বছরে অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীই ঘুরেফিরে একই জায়গায় ফিরে এসেছেন। এতে এগিয়ে আছেন দুর্নীতিবাজ হিসেবে খ্যাতরাই।
এলএ শাখার দুর্নীতি কমেনি : চট্টগ্রামে আউটার রিং রোড, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন, টানেল নির্মাণ, এপ্রোচ সড়ক নির্মাণ, খাল খনন, গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন স্থাপন, বে-টার্মিনাল নির্মাণসহ সরকারি অফিসের জন্য ব্যাপক জায়গা অধিগ্রহণ করা হয়েছে। যে কারণে এসব প্রকল্পে জায়গা ছাড়তে বাধ্য হওয়া জমি মালিকরা প্রতিদিনই ভিড় করেন এলএ শাখায়। সম্প্রতি এলএ শাখার সাবেক ও বর্তমান ১৫ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে দেড় কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদক মামলাও করেছে।
গত বুধবার এলএ শাখায় গেলে কথা হয় হালিশহর থেকে জায়গা অধিগ্রহণের টাকার জন্য আসা এক ব্যক্তির সাথে। তিনি বলেন, ফাইল প্রস্তুত করতে এবং ফাইল ছাড়িয়ে নিতে টাকা দিতে হয়। অধিগ্রহণের চেক আসলেই নাকি কমিশনের চেক কর্তন করে রাখেন। এলএ শাখার একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে বহিরাগত দালালরাই জমির মালিকদের কাছ থেকে এসব টাকা হাতিয়ে নেন। নগরের নিউ মার্কেট ও লালদিঘি পাড় কেন্দ্রিক সৌনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক ও রূপালী ব্যাংকে আগেইভাগেই একাউন্ট করতে হয়। একাউন্ট হলেই জমির চেক বিতরণের আগেই সেই একাউন্ট থেকে ১০-১৫ শতাংশ টাকার চেক নিয়ে নেয় কতিপয় কর্মচারী ও দালালরা। ব্যাংক ম্যানেজারের যোগসাজশে টাকা জমার পরপরই কমিশনের টাকা তুলে নেয়া হয়।